মঙ্গলবার, ৬ সেপ্টেম্বর, ২০১৬

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ওবামাকে ‘খা**-র ছেলে’ গালি ফিলিপিন্সের প্রেসিডেন্ট রদরিগো দুতের্তের
বারাক ওবামা ও রদরিগো দুতের্তে



মার্কিন প্রেসিডেন্টের বারাক ওবামার কোনও উপদেশ শুনতে রাজি নন। ওবামা যদি তাঁর  কোনও পদক্ষেপ নিয়ে প্রশ্ন তোলেন, তা হলে ‘‘খা**-র ছেলেকে এক হাত’’ নেবেন।

 সোমবার মার্কিন প্রেসিডেন্টের  বিরুদ্ধে এই ধরনের কটূক্তি করলেন ফিলিপিন্সের প্রেসিডেন্ট রদরিগো দুতের্তে।

৬ থেকে ৮ সেপ্টেম্বর লাওসে ‘অ্যাসোসিয়েশন অব সাউথইস্ট এশিয়ান নেশনস’ বা এএসইএএন-এর বৈঠক। সেখানেই মুখোমুখি হওয়ার কথা ওবামা ও দুতের্তের।

পরে অবশ্য বিবৃতি প্রকাশ করে মার্কিন প্রেসিডেন্টকে ‘ব্যক্তিগত আক্রমণের জন্য’ ক্ষমা চেয়ে নিয়েছেন তিনি। তবে এতে ক্ষোভ কমেনি আমেরিকার। 

হোয়াইট হাউস সূত্রের খবর, ৬ সেপ্টেম্বর ওবামা এবং দুতের্তের একটি বৈঠক হওয়ার সম্ভাবনা ছিল। তবে এই ঘটনার পরে সেই বৈঠকের আদৌ কোনও প্রয়োজন আছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন স্বয়ং ওবামা।

তবে বারাক ওবামাই প্রথম নন। এর আগে ফিলিপিন্সে মার্কিন রাষ্ট্রদূতকে ‘গা*, খা**-র ছেলে’, সাংবাদিকদের ‘বেজন্মা’ এবং পোপকেও নানা ‘অলঙ্কারে’ ভূষিত করেছেন দুতের্তে।

 ‘অ্যাসোসিয়েশন অব সাউথইস্ট এশিয়ান নেশনস’ বা এএসইএএন-এর বৈঠকের ফাঁকে আমেরিকার সঙ্গে ফিলিপিন্সের যে দ্বিপাক্ষিক কথাবার্তার সূচি নির্দিষ্ট ছিল, তা বাতিল করে দিয়েছেন ওবামা।

৩০ জুন প্রেসিডেন্টের আসনে বসার পর থেকেই মাদক ব্যবহারের বিরুদ্ধে জেহাদ ঘোষণা করেছেন দুতের্তে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের অভিযোগ, গত দু’মাসে প্রায় আড়াই হাজার জনকে মেরেছে দুতের্তের পুলিশ। মাদক পাচার ও ব্যবহারের অভিযোগে গ্রেফতার করা হয়েছে প্রায় দু’হাজার জনকে।

মাদক পাচার রুখতে রদরিগোর এই পদক্ষেপ কি সমর্থনযোগ্য? রদরিগোর সঙ্গে বৈঠকে কি এই প্রশ্ন তুলবেন না খোদ মার্কিন প্রেসিডেন্ট? সোমবার এক সাংবাদিকের এই প্রশ্ন শুনেই ক্ষেপে ওঠেন দুতের্তে। বলেন, ‘‘ও নিজেকে ভাবে টা কী! আমি আমেরিকার হাতের পুতুল নই। আমি একটি দেশের প্রেসিডেন্ট। আমি শুধু এ দেশের মানুষের কাছেই উত্তর দিতে বাধ্য। আর কারও কাছে নয়।’’ সাংবাদিকদের সামনে ওবামার বিরুদ্ধে কু-শব্দ ব্যবহার করতেও পিছপা হননি তিনি। বলেছেন, ‘‘ওবামা যদি আমার কোনও সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন তোলে, তা হলে খা**-র ছেলেকে দেখে নেব।’’

দুতের্তের যুক্তি, ফিলিপিন্সের এই পরিস্থিতির জন্য আমেরিকাই দায়ী। মার্কিন ‘ঔপনিবেশিক অত্যাচারের’ ফলেই আজ এই খারাপ সময়ের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে ফিলিপিন্স।

হোয়াইট হাউস সূত্রের খবর, কাল দুপুরেই ওবামা এবং দুতের্তের একটি বৈঠক হওয়ার সম্ভাবনা ছিল। তবে আজকের এই ঘটনার পরে সেই বৈঠকের আদৌ কোনও প্রয়োজন আছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন স্বয়ং ওবামা। তবে দুতের্তে একরোখা। বলেছেন, ‘‘আরও মরবে। অনেকে মরবে। যতক্ষণ না শেষ মাদক পাচারকারীকে বার করা সম্ভব হবে, ততক্ষণ আমরা কাজ চালিয়ে যাব।’’

তবে বারাক ওবামাই প্রথম নন। এর আগে ফিলিপিন্সে মার্কিন রাষ্ট্রদূতকে ‘গা*, খা**-র ছেলে’, সাংবাদিকদের ‘বেজন্মা’ এবং পোপকেও নানা ‘অলঙ্কারে’ ভূষিত করেছেন দুতের্তে।

৩০ জুন প্রেসিডেন্টের আসনে বসার পর থেকেই মাদক ব্যবহারের বিরুদ্ধে জেহাদ ঘোষণা করেছেন দুতের্তে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের অভিযোগ, গত দু’মাসে প্রায় আড়াই হাজার জনকে মেরেছে দুতের্তের পুলিশ। মাদক পাচার ও ব্যবহারের অভিযোগে গ্রেফতার করা হয়েছে প্রায় দু’হাজার জনকে। তবে দুতের্তে একরোখা। বলেছেন, ‘‘আরও মরবে। অনেকে মরবে। যতক্ষণ না শেষ মাদক পাচারকারীকে বার করা সম্ভব হবে, ততক্ষণ আমরা কাজ চালিয়ে যাব।’’

মাদক পাচার রুখতে রদরিগোর এই পদক্ষেপ কি সমর্থনযোগ্য? রদরিগোর সঙ্গে বৈঠকে কি এই প্রশ্ন তুলবেন না খোদ মার্কিন প্রেসিডেন্ট? সোমবার এক সাংবাদিকের এই প্রশ্ন শুনেই ক্ষেপে ওঠেন দুতের্তে। বলেন, ‘‘ও নিজেকে ভাবে টা কী! আমি আমেরিকার হাতের পুতুল নই। আমি একটি দেশের প্রেসিডেন্ট। আমি শুধু এ দেশের মানুষের কাছেই উত্তর দিতে বাধ্য। আর কারও কাছে নয়।’’ সাংবাদিকদের সামনে ওবামার বিরুদ্ধে কু-শব্দ ব্যবহার করতেও পিছপা হননি তিনি। বলেছেন, ‘‘ওবামা যদি আমার কোনও সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন তোলে, তা হলে খা**-র ছেলেকে দেখে নেব।’’

দুতের্তের যুক্তি, ফিলিপিন্সের এই পরিস্থিতির জন্য আমেরিকাই দায়ী। মার্কিন ‘ঔপনিবেশিক অত্যাচারের’ ফলেই আজ এই খারাপ সময়ের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে ফিলিপিন্স।

লেবার পার্টির ভারতীয় বংশোদ্ভূত এমপি কিথ ভাজের পুরুষ যৌনকর্মীর সাথে যৌনক্রিয়া

ব্রিটিশ ট্যাবলয়েড সানডে মিররে এ অনুসন্ধানী প্রতিবেদন


ভারতীয় বংশোদ্ভূত ব্রিটিশ এমপি কিথ ভাজ তার লন্ডনের ফ্ল্যাটে দুজন পুরুষ যৌনকর্মীকে ডেকে এনে যৌনক্রিয়া করেছেন।  রোববার ব্রিটিশ ট্যাবলয়েড সানডে মিররে এ অনুসন্ধানী প্রতিবেদন ছাপা হয়। সে সময় লেস্টারের এই ভারতীয় বংশোদ্ভূত লেবার এমপি একজন যৌনকর্মীকে আসার সময় সাথে নিষিদ্ধ মাদক আনতে বলেন।



ট্যাবলয়েডে পূর্ব ইউরোপীয় ঐ দুই পুরুষ যৌন কর্মীর সাথে এমপি কিথ ভাজের ছবিও ছাপা হয়। সানডে মিরর তাদের ওয়েব সাইটে যৌন কর্মীদের সাথে মি ভাজের গোপনে রেকর্ড করা কথোপকথনও প্রকাশ করে দেয়।

এরপর থেকে প্রভাবশালী ৬০ বছর বয়সী এই এমপির ওপর চাপ বাড়ছিল।

তিনদিনের মাথায় মঙ্গলবার তিনি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বিষয়ক সংসদীয় কমিটির চেয়ারম্যানের পদ থেকে পদত্যাগ করলেন। ২০০৭ সাল থেকে তিনি সংসদের ক্ষমতাধর এই কমিটির প্রধান হিসাবে কাজ করছিলেন।

দুই সন্তানের বাবা কিথ ভাজ ১৯৮৭ সাল থেকে লেস্টার ইস্ট আসন থেকে লেবার পার্টির টিকেটে নির্বাচিত হয়ে আসছেন। টনি ব্লেয়ারের সরকারের সময় তিনি ব্রিটেনের ইউরোপ বিষয়ক মন্ত্রী হয়েছিলেন।

তার দল লেবার পার্টির প্রধান জেরেমি করবিন বলেছেন, কিথ ভাজের ঘটনা সত্যি হলেও তা তার একান্তই ব্যক্তিগত বিষয়।
কিথ ভাজ এমপি

তবে ক্ষমতাসীন কনজারভেটিভ পার্টির পক্ষ থেকে কিথ ভাজের ওপর চাপ বাড়ছে। দলের একজন এমপি বলেছেন, সংসদে এবং পুলিশের কাছে কিথ ভাজের ব্যাপারে তিনি অভিযোগ আনবেন।

কিথ ভাজের পরিবার ভারতের গোয়া থেকে এসে ব্রিটেনের নাগরিক হয়েছিলেন।

মি. ভাজ খুব একটা কথা বলছেন না। শুধু জানিয়েছেন, তাকে নিয়ে সানডে মিররের খবরটি তিনি তার আইনজীবীকে জানিয়েছেন।

গান্ধী নেহরু ও বাজপেয়ীর প্রেম-যৌনতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে আপ মুখপাত্র আশুতোষ তোপের মুখে

 নেহরুর সঙ্গে এডুইনা মাউন্টব্যাটেনের ঘনিষ্ট সম্পর্ক এখন রূপকথা
যৌন কেলেঙ্কারিতে জড়িয়ে বরখাস্ত হওয়া দিল্লির এক মন্ত্রীর সমর্থনে নিজস্ব ব্লগে আম আদমি পার্টির নেতা ও প্রধান মুখপাত্র আশুতোষ তোপের মুখে পড়েছেন।

আশুতোষ লিখেছিলেন, ভারতের সমাজ যদি গান্ধী-নেহরুর মতো জাতীয় নায়কদের সব সম্পর্ক মেনে নিতে পারে, তাহলে দুজন প্রাপ্তবয়স্কর মধ্যে নিজেদের সম্মতিতে যৌন সম্পর্ক হলে অসুবিধা কোথায়?

এরপরই কংগ্রেস ও বিজেপি একযোগে আশুতোষকে তীব্র ভাষায় আক্রমণ করেছে, জাতীয় মহিলা কমিশনও তাকে তলব করেছে। পরিস্থিতি জটিল হয়ে উঠছে বুঝে আম আদমি পার্টিও ওই ব্লগকে এখন আশুতোষের ব্যক্তিগত মত বলে দূরত্ব বাড়াচ্ছে। আর স্পর্শকাতর ওই সব মন্তব্যের জেরে আশুতোষের রাজনৈতিক কেরিয়ারই এখন প্রশ্নের মুখে!

গোটা ঘটনায় নতুন করে এই প্রশ্নটাই উঠে আসছে যে জাতীয় নায়কদের ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে ভারত কি মাথা ঘামাতেও রাজি নয়?

গত সপ্তাহে আম আদমি পার্টির সিনিয়র নেতা আশুতোষ লেখেন, "গান্ধীজি-র সঙ্গে সরলা চৌধুরী নামে এক মহিলার সম্পর্ক নিয়ে কংগ্রেস নেতারা ভীষণ উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছিলেন।"

জাওয়াহারলাল নেহ্‌রু এবং এমকে গান্ধী
 “ভারতের সমাজ যদি গান্ধী-নেহরুর মতো জাতীয় নায়কদের সব সম্পর্ক মেনে নিতে পারে, তাহলে দুজন প্রাপ্তবয়স্কর মধ্যে নিজেদের সম্মতিতে যৌন সম্পর্ক হলে অসুবিধা কোথায়?”

 "রবীন্দ্রনাথের দূর সম্পর্কের আত্মীয় সরলা-কে গান্ধী বলেছিলেন তার আধ্যাত্মিক স্ত্রী। এতে গান্ধীর স্ত্রী কস্তুরবাও ভীষণ বিচলিত হয়ে পড়েন, পরে কংগ্রেস নেতাদের চাপে গান্ধী সরলাকে ছাড়তে বাধ্য হন। আর তা ছাড়া দুই ভাইঝির পাশে নগ্ন হয়ে শুয়ে তার ব্রহ্মচর্য পরীক্ষার কথা তো সবারই জানা।"

প্রত্যাশিতভাবেই এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদে গর্জে উঠেছে কংগ্রেস। দলের টম ভারাক্কান বা অজয় মাকেনের মতো নেতারা আশুতোষকে ক্ষমা চাইতে হবে বলে দাবি করেছেন।

গান্ধীর সমাধিস্থল রাজঘাটে গিয়ে তাঁকে সম্মান জানিয়ে এসে যে দল প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল, সেই আম আদমি পার্টি কীভাবে তাঁকেই অপমান করার সাহস পায়, সে প্রশ্নও তুলেছেন তারা - এবং প্রতিবাদ করেছেন বিজেপি নেতা তথা সাবেক প্রধানমন্ত্রী অটলবিহারী বাজপেয়ীর চরিত্র হননেরও।

সাবেক প্রধানমন্ত্রী অটলবিহারী বাজপেয়ী
ওই একই ব্লগে নেহরুর সঙ্গে তাঁর অসংখ্য মহিলা সহকর্মী ও এডুইনা মাউন্টব্যাটেনের প্রেমের কথাও উল্লেখ করেছেন আশুতোষ।

বাজপেয়ী সম্পর্কে লিখেছেন, "পার্লামেন্টে দাঁড়িয়ে তিনি নিজেই স্বীকার করেছিলেন অবিবাহিত হলেও তিনি ব্রহ্মচারী নন - এবং কলেজ জীবনের বান্ধবীর সঙ্গে বাজপেয়ীর একসঙ্গে থাকা নিয়ে সমাজ কখনও আপত্তি তোলেনি।"

যথারীতি এতে ক্ষুব্ধ বিজেপিও। কেন্দ্রীয় মন্ত্রী ও বিজেপি নেতা মুখতার আব্বাস নাকভি বলছেন, "এগুলো মানসিকভাবে দেউলিয়া হওয়ার প্রমাণ। যাদের দেশের ইতিহাস, ভূগোল, পরিপ্রেক্ষিত নিয়ে কোনও ধারণা নেই তারাই এগুলো বলতে পারেন।"

বিজেপি এমপি মহেশ গিরি আরও একধাপ এগিয়ে জাতির পিতা গান্ধীর অপমানের জন্য আশুতোষের গ্রেফতার দাবি করেছেন।

বিজেপি ও কংগ্রেসের রাগের আরও একটা কারণ, আশুতোষ এই সব মন্তব্য করেছেন যৌন কেলেঙ্কারিতে অভিযুক্ত এক মন্ত্রীর হয়ে সাফাই গাইতে গিয়ে - পরে যাকে ধর্ষণের অভিযোগে গ্রেফতার হতে হয়েছে।

ভারতে জাতির পিতা গান্ধীর সঙ্গে একজন ধর্ষণকারীর তুলনায় অত্যন্ত ক্ষিপ্ত গান্ধীর নাতি তুষার গান্ধীও।

তুষার গান্ধী বলছেন, "গোটা পরিস্থিতি না-জেনে, শুধু কোনও বই থেকে দুচারটে লাইন টুকে গান্ধীর চরিত্রকে ব্যাখ্যা করা যায় না। ব্রহ্মচর্য নিয়ে বাপুর পরীক্ষা বা তার বিভিন্ন সম্পর্কর সঙ্গে বরখাস্ত হওয়া একজন মন্ত্রীর যৌন সম্পর্কের তুলনা টানা কতটা সঙ্গত দেশই তার বিচার করবে।"

দিল্লি ইউনিভার্সিটির প্রবীণ অধ্যাপক নির্মলাংশু মুখার্জির মতে ভারত তার জাতীয় রাজনীতিকদের ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে কোনও সমালোচনাতেই আগ্রহী নয়। আর তার কারণও আছে।

অধ্যাপক মুখার্জি বলেন, "ভারতে রাজনীতি যত না ব্যক্তিকেন্দ্রিক, তার চেয়ে বেশি ইস্যুকেন্দ্রিক এবং মানুষঘেঁষা। তা ছাড়া একটা সামাজিক রক্ষণশীলতা তো আছেই। সাধারণভাবে রাজনীতিকদের ব্যক্তিগত জীবনে ভূমিকা নিয়ে মানুষের আগ্রহটা ততটা নয়, যতটা তাদের রাজনৈতিক ভূমিকা নিয়ে!"


শনিবার, ৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৬

ভারতের নাগরিকত্ব আইনের কারণে দেশত্যাগের প্রবণতা বাড়তে পারে

 প্রতীক বর্ধন

পুলিশের অভিযানে তামিম চৌধুরী ও এর আগে কল্যাণপুরে নয় জঙ্গির মৃত্যুর মধ্য দিয়ে জঙ্গি তৎপরতার রাশ অনেকটাই টেনে ধরা গেছে বলে পুলিশ মনে করছে। হয়তো সে দাবির সত্যতা রয়েছে। কিন্তু বছর খানেক ধরে জঙ্গিদের এই ধারাবাহিক হামলার প্রভাব জনমনে দীর্ঘদিন ধরে অনুভূত হবে। এসব হামলার কারণে বৈশ্বিক পরিসরে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়েছে। দেশের ভেতরেও মানুষের মনে নিরাপত্তাহীনতার বোধ তীব্র হয়েছে। এমনিতেই মধ্যবিত্তের একটি বড় অংশ দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি, সুশাসনের অভাব ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে অভিবাসনের কথা সব সময়ই কম-বেশি ভাবেন। এসব ঘটনার পর তাঁরা এ ব্যাপারে আরও সিরিয়াস হয়ে উঠেছেন। তাঁদের অনেকেই হয়তো শেষমেশ চলে যাবেন। আবার সরকার ব্লগারদের নিরাপত্তার ব্যাপারে একরকম ঔদাসীন্য দেখানোয় তাঁদের কেউ কেউ দেশ ছেড়ে গেছেন। অন্য অনেকেও এই সুযোগ নিয়েছেন বা নেওয়ার চেষ্টা করছেন।

 

বিশ্বায়নের যুগে অভিবাসন অনেক ক্ষেত্রে স্বাভাবিক ব্যাপার। কিন্তু সব ক্ষেত্রে নয়। একটি দেশের শিক্ষিত তরুণেরা যদি রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার কারণে হরেদরে দেশান্তরি হতে শুরু করেন, সেটা ওই দেশের জন্য ভালো লক্ষণ নয়।


এই অভিবাসনের দুটি দিক রয়েছে। প্রথমত, ১৯৪৭ সালে দেশভাগের সময় থেকে এখানকার হিন্দু জনগোষ্ঠী পশ্চিম বাংলাসহ ভারতের বিভিন্ন প্রদেশে চলে যাওয়া শুরু করে, যে ধারা এখনো শেষ হয়নি। তখন থেকে বিভিন্ন সাম্প্রদায়িক হামলার পর হিন্দুরা নীরবে দেশত্যাগ করে যাচ্ছে। দেশভাগের সময় পূর্ব বাংলা বা আজকের বাংলাদেশে হিন্দু জনগোষ্ঠী ছিল মোট জনসংখ্যার প্রায় ৩১ শতাংশ, আর এখন তা প্রায় ১১ শতাংশে নেমে এসেছে। অবশ্য বিবিএসের এই হিসাব নিয়ে বিতর্ক আছে। সব সরকারের আমলেই সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর ওপর আক্রমণ হয়েছে, কিন্তু তার বিচার হয়নি। সেটা যেমন বিএনপির সরকারের ক্ষেত্রে সত্য, তেমনি আওয়ামী লীগের সরকারের আমলেও। এ বছরের শুরুতে যেভাবে হিন্দুধর্মাবলম্বীসহ সংখ্যালঘুদের টার্গেট করে হত্যা করা হলো, তাতে তাদের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতার বোধ তৈরি হয়েছে। রাজধানী ঢাকায় বসে এটা টের পাওয়া না গেলেও দেশের বিভিন্ন স্থানে এর প্রভাব ঠিকই টের পাওয়া যাচ্ছে।

হিন্দুদের দেশত্যাগের বিষয়টি রাজনৈতিক। কিন্তু এবার তার সঙ্গে নতুন মাত্রা যুক্ত হয়েছে। নরেন্দ্র মোদির বিজেপির সরকার ভারতের নাগরিকত্ব আইনে সংশোধনী এনেছে। ফলে বাংলাদেশ ও পাকিস্তান থেকে হিন্দুসহ যেসব সংখ্যালঘু প্রাণভয়ে ভারতে যাবেন, ভারত সরকার তাঁদের প্রথমে ১০ বছরের জন্য এবং পরে স্থায়ীভাবে নাগরিকত্ব দেবে। বর্তমানে ভারতে প্রায় দুই লাখ অবৈধ বাংলাদেশি বসবাস করছেন। এই আইনের কারণে বাংলাদেশের সংখ্যালঘু হিন্দু জনগোষ্ঠী আরও বিপদে পড়বে। নানা কারণে অনেকেই এই সুযোগ নিতে পারেন, কিন্তু যাঁরা নেবেন না, তাঁরা নানা বৈরী পরিবেশের সম্মুখীন হবেন। গত কয়েক বছরে দেশে নানা কারণেই ভারত-বিরোধিতা তীব্র হয়েছে, ভারত সরকারের এই পদক্ষেপে তা আরও বাড়বে বলেই আশঙ্কা করা যায়। সেটা শেষমেশ হিন্দু-বিরোধিতায় রূপ নিতে পারে। বাংলাদেশের হিন্দুদেরই তার পরিণতি ভোগ করতে হবে।

দ্বিতীয়ত, দেশের রাজনৈতিক জটিলতা, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা ও সুশাসনের অভাবের কারণে শিক্ষিত মধ্যবিত্তের মধ্যে উন্নত দেশে অভিবাসনের ইচ্ছা সব সময়ই আছে। দেশের প্রায় এক কোটি লোক এখন প্রবাসী। এ পরিস্থিতিতে যাঁরা এত দিন অভিবাসনের ব্যাপারে দোটানায় ছিলেন, তাঁদের অনেকেই এখন সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথা ভাবছেন। অভিবাসন বর্তমান যুগের খুবই আলোচিত বিষয়। সিরিয়া বা মধ্যপ্রাচ্যের লোকেরা দেশত্যাগ করছে বাধ্য হয়ে। যুদ্ধের কারণে সেসব দেশে এখন বসবাস করা দায় হয়ে উঠেছে। আমাদের দেশের পরিস্থিতি তেমন নয়। এখানকার তরুণেরা দেশান্তরি হন মূলত উন্নত জীবনযাপনের সন্ধানে। সমুদ্রপথে মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়া যাওয়ার জন্য আমাদের দেশের কত তরুণ জমি বিক্রি করে জীবন বাজি রেখেছিলেন, তার করুণ চিত্র আমরা দেখেছি। আবার যাঁরা অত্যন্ত মেধাবী মানুষ, তাঁদের কাজ করার সুযোগও দেশে নেই বললেই চলে। ফলে তাঁরাও অভিবাসন করতে চান।

বাংলাদেশের নবীন ও শিক্ষিত লোকজনের মধ্যে অভিবাসন-আকাঙ্ক্ষা নিয়ে যুক্তরাজ্যের গবেষক অ্যালেন ব্যাল একটি গবেষণা করেছেন, যার বঙ্গানুবাদ ত্রৈমাসিক প্রতিচিন্তা পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। তিনি দেখিয়েছেন, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, দ্রুত নগরায়ণ, পরিবারগুলোর শিক্ষায় বিনিয়োগ বাড়ানো প্রভৃতি কারণে উদীয়মান মধ্যবিত্ত নবীনদের মধ্যে নতুন আধুনিক জীবনাচরণের আকাঙ্ক্ষা সৃষ্টি হয়েছে। কিন্তু দেশে তাদের এই আকাঙ্ক্ষা পূরণ হচ্ছে না। বিশ্বায়নের প্রভাবে অনেকেই এখন বিশ্বনাগরিক হতে চায়। ফলে শিক্ষিত মধ্যবিত্তদের মধ্যে উন্নত দেশে পাড়ি জমানোর প্রবণতা বেড়েছে।  

অনেকেই আশঙ্কা করছেন, গুলশানের হামলায় বিদেশি নাগরিকেরা নিহত হওয়ায় দেশে বিদেশি বিনিয়োগ ক্ষতিগ্রস্ত হবে। ইতিমধ্যে মাতারবাড়ি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্পের দরপত্র কার্যক্রমের মেয়াদ এক মাস বাড়ানো হয়েছে। তা ছাড়া হামলার পর থেকে বিদেশিরা মেট্রোরেল নির্মাণ প্রকল্পের কাজে যাচ্ছেন না। ইউরোপীয় ইউনিয়ন তাদের নাগরিকদের জন্য সব জায়গাতেই নিরাপত্তা চেয়েছে। এমন হামলা আরও হলে বিদেশি বিনিয়োগ নিঃসন্দেহে ব্যাহত হবে। অনেকে ব্যবসাও গুটিয়ে নিতে পারেন। সেটা হলে দেশে নতুন করে বেকারত্বের সমস্যা সৃষ্টি হবে। এমনিতেই দেশে উচ্চশিক্ষিত তরুণদের মধ্যে বেকারত্বের হার অনেক বেশি। এর সঙ্গে যদি নতুন করে বেকারত্ব সৃষ্টি হয়, তাহলে পরিস্থিতি যে জটিল আকার ধারণ করবে, তাতে সন্দেহ নেই। তবে জাপানিরা এখানে বিনিয়োগ করার ব্যাপারে ইতিবাচক। তাদের এই আস্থার প্রতিদান আমাদের দিতে হবে।

বিশ্বায়নের যুগে অভিবাসন অনেক ক্ষেত্রে স্বাভাবিক ব্যাপার। কিন্তু সব ক্ষেত্রে নয়। একটি দেশের শিক্ষিত তরুণেরা যদি রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার কারণে হরেদরে দেশান্তরি হতে শুরু করেন, সেটা ওই দেশের জন্য ভালো লক্ষণ নয়। বাংলাদেশ নানা কারণেই পৃথিবীতে একটি ইতিবাচক ভাবমূর্তি তৈরি করতে পেরেছিল, কিন্তু এসব কারণে আমাদের অর্জন ধূলিসাৎ হতে পারে। তাই তরুণদের এই হতাশা দূর করতে হবে। সে জন্য দেশে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার বিকল্প নেই। অন্যদিকে সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা দিতে হবে, তাদের আশ্বস্ত করতে হবে।

প্রতীক বর্ধন: সাংবাদিক ও অনুবাদক।

ফেসবুকে মীর কাসেম অালীর মেয়ে

‘কাল আব্বু থাকবে না এ নিয়ে দুঃখিত নই’

আনন্দবাজার পত্রিকা, কলকাতা

সবাই বুঝে গেছেন আর কিছু করার নেই। সব আইনি পথ শেষ হয়ে গেছে। অপরাধ কবুল করে রাষ্ট্রপতির কাছে ক্ষমাপ্রার্থনা যে করবেন না মির কাসেম আলি, তা আগেই জানত পরিবার। ফলে মানসিক প্রস্তুতি ছিলই। আজ বিকেলে কাসেমের আত্মীয় স্বজনদের জেলে গিয়ে দেখা করে আসার অনুমতি দেওয়া হয়েছিল। এই শেষ দেখা, বুঝে নিয়েই গিয়েছিলেন স্ত্রী, কন্যারা।বিকেল সাড়ে ৩টেয় ছ’টা গাড়িতে করে জেলে পৌঁছন ৪৭ জন। তাঁদের মধ‌্যে মির কাসেমের স্ত্রী, কন্য-সহ ৩৮ জনকে ভেতরে গিয়ে দেখা করতে দেওয়া হয়েছে তাঁর সঙ্গে।
বাবার সঙ্গে দেখা করতে যাওয়ার আগে ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়েছেন মির কাসেমের দুই মেয়ে সুমাইয়া রাবেয়া ও তাহেরা তাসনিম।

সুমাইয়া রাবেয়া লিখেছেন:

‘আমার আব্বু নরম মনের মানুষ। প্রতি বার বক্তব্য দিতে উঠলে কেঁদে ফেলতেন। এটা সবাই জানেন। এর আগে যখন দেখা করতে গিয়েছিলাম তখন আব্বুর চেহারায় বিন্দুমাত্র বিচলতা দেখিনি, বরং সবার সাথে হাসি খুশি ছিলেন। তখন বাবাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, আব্বু, আমাদের ভাইবোনের জন্য আল্লাহর কাছে জান্নাতের সুপারিশ করবে না? আব্বু একগাল হেসে বললেন, শুধু তোমরা না, আমার নাতি-নাতনি, বউমা, জামাই সবার জন্য আল্লাহর কাছে সুপারিশ করব। আমরা সবাই হেসে দিয়েছিলাম। আজকে আবার আব্বুকে দেখতে যাচ্ছি। শেষ বারের মতো। কাল আব্বু থাকবে না এ নিয়ে আমরা দুঃখিত নই। শাহাদাতের মর্যাদা কজনের ভাগ্যে জোটে? এ মৃত্যুর জন্যই তো সারা জীবন সংগ্রাম করেছেন। আল্লাহ আমার আব্বুকে কবুল করে নিন।’
 
সুমাইয়া রবেয়ার লেখা সেই ফেসবুক পোস্ট

আর এক মেয়ে তাহেরা তাসনিম লিখেছেন:

‘সবাই আমার বাবা মির কাসেম আলির জন্য দোয়া করবেন যেন তিনি জান্নাতুল ফেরদৌসের বাসিন্দা হতে পারেন! আর আমাদের, তার পরিবারকে এই শোক কাটিয়ে ওঠার তৌফিক দেন এবং এ দেশ ও জাতিকে তার চলে যাওয়াতে অর্থনীতি ও দেশসেবায় যে অপূরণীয় ক্ষতি হবে, তা কাটিয়ে ওঠার তৌফিক দিন। আমিন। এমকিউ আলি পরিবার!’



তাহেরা তাসনিম এর ফেসবুক পোস্ট

বৃহস্পতিবার, ১ সেপ্টেম্বর, ২০১৬

ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরীর খোলা চিঠি সব দলের গণতন্ত্রায়নের জন্য প্রয়োজন ও প্রযোজ্য

ড. তোফায়েল আহমেদ


ড. জাফরুল্লাহ চৌধুরী আমার অত্যন্ত শ্রদ্ধাভাজন। ব্যক্তিগতভাবে তার স্নেহ এবং প্রশ্রয় সব সময়ই আমি পেয়ে আসছি। বিএনপির নতুন কমিটি এবং বিশেষত একটি রাজনৈতিক দলে গণতন্ত্র ও নীতিচর্চার যে বিষয়গুলো সূক্ষ্ম ও সাহসিকতার সঙ্গে তিনি তুলে ধরেছেন তা যে কোনো বিচারে প্রণিধানযোগ্য। একটি রাজনৈতিক দল হিসেবে বিএনপি বা চেয়ারপারসন হিসেবে বেগম খালেদা জিয়া কীভাবে কতটুকু মেনে নেবেন তা দেখার এবং ভাবার বিষয়। বিশেষ করে দলের অভ্যন্তরে গণতন্ত্র চর্চা এবং নীতি-নির্ধারণী প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা বিষয়ে যে কথাগুলো তিনি খোলা চিঠিতে লিখেছেন তা শুধু বিএনপির জন্য নয়, দেশের সব রাজনৈতিক দলের ক্ষেত্রেই অনুসরণীয় হওয়া উচিত।

ড. তোফায়েল আহমেদ
ড. জাফরুল্লাহ চৌধুরী বিএনপির কোনো পদ-পদবি ধারণ করেন বলে অন্তত আমার জানা নেই। তাই বিএনপির নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে তার আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু করার আছে বলেও আমার মনে হয় না। তবে তিনি বিভিন্ন সময়ে বেগম জিয়ার সঙ্গে সরাসরি বা বিএনপি সম্পর্কে অনেক কথা বলে যাচ্ছেন যা বিভিন্ন সময়ে গণমাধ্যমে এসেছে, এভাবে ইতিপূর্বে কেউ বিএনপি বা বেগম জিয়াকে বলেছেন বলে আমার জানা নেই। ড. জাফরুল্লাহ চৌধুরী অত্যন্ত খোলা মনের মানুষ। তিনি যা বলেন বা লিখেন তা সরাসরিই করেন। কোনো রাজনৈতিক দলে না থাকলেও প্রকৃতিগতভাবে তিনি রাজনীতিরই মানুষ। সেটি হঠাৎ করে এ সময়ের ঘটনা নয়, ১৯৬০-এর দশক থেকেই সমসাময়িক রাজনীতি ও রাজনীতির মানুষগুলোর সঙ্গে তার গভীর সম্পৃক্ততা ছিল। মুক্তিকালীন সময়ে তিনি বিদেশে উচ্চশিক্ষা অসমাপ্ত রেখে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেন, এটাই দেশের প্রতি তার নিঃস্বার্থ অঙ্গীকার উপলব্ধির জন্য যথেষ্ট। স্বাধীন দেশের উপযোগী স্বাস্থ্যনীতি, জাতীয় ওষুধনীতি ও দক্ষ স্বাস্থ্য ব্যবস্থা গড়ে তোলার পেছনে তার চেষ্টা ও কর্মের স্বীকৃতি সবাই দেবেন। দেশের স্থানীয় সরকার বিষয়ে তার সুস্পষ্ট অঙ্গীকার রয়েছে। তিনি দেশের একজন সিনিয়র এবং সক্রিয় সিটিজেন। দেশের রাজনীতি ও রাজনৈতিক দলের ওপর তার বক্তব্য অবশ্যই গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচিত হওয়া উচিত।
আমার এ লেখার উদ্দেশ্য কিছুটা ভিন্ন। ড. চৌধুরী তার খোলা চিঠির একটি অংশে বিএনপির গঠনতন্ত্রে ‘দলের সদস্য নয়, অথচ বিশেষ ক্ষেত্রে পারদর্শী, যোগ্যতাসম্পন্ন ও সুদক্ষ ব্যক্তিদের কো-অপট করার বিধান আছে এবং ওই বিধানের অধীনে বিভিন্ন বিষয়ভিত্তিক অভিজ্ঞতাসম্পন্ন অদলীয় ব্যক্তিদের তিনি বিভিন্ন কমিটিতে অন্তর্ভুক্তির পরামর্শ দিয়েছেন যার মধ্যে আমার নামও উল্লেখ করেছেন। তার বিএনপিকে দেওয়া পরামর্শে তিনি ক্ষতিকর বা বিব্রতকর কোনোকিছুই করেননি। বরং তিনি ওই বিশিষ্ট ব্যক্তিদের তালিকাভুক্ত করে আমাকে সম্মানিত করেছেন বলেই আমি মনে করি। তবে রাজনৈতিক দলের অঙ্গীভূত হয়ে কাজ করার ক্ষেত্রে আমার একটি ব্যক্তিগত অবস্থান আছে। দীর্ঘদিন ধরে নিজেকে অদলীয় একটি অবস্থানে স্থির রাখার চেষ্টা করেছি। তা সব সময় যে সুখকর তাও নয়, তা সত্ত্বেও আমার অবস্থানটি আমি পরিষ্কার রেখেছি। কারণ নাগরিক সমাজের একজন হিসেবে নানা বিষয়ে মতামত দিতে গেলে প্রায়শ তাতে দলগত মেরুকরণের চেষ্টা চলে। মতামত কখনো কারও মতের পক্ষে আবার বিপক্ষে যায়, তাতে ব্যক্তির ওপর জোর করে দলের রং মাখিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। যারা নাগরিক সমাজের হয়ে কাজ করেন, কথা বলেন এরকম অনেকেই দল করে থাকেন। তাতে আমার ব্যক্তিগত কোনো অমত/দ্বিমত নেই। কিন্তু আমি ব্যক্তিগতভাবে কোনো রাজনৈতিক দলের সদস্য হয়ে কাজ করতে অপারগ। কোনো দলের প্রতি বিরাগ থেকে নয়, এটি মূলত আমারই সীমাবদ্ধতা।

আমি বা আমার মতো আরও অনেকে আমরা যে কাজগুলো করি, মূলত রাজনৈতিক দল ও সরকারি বেসরকারি নানা পর্যায়ে নীতি-নির্ধারকদের জন্যই তা করে থাকি। আর একটি লক্ষ্য থাকে জনশিক্ষা ও জনসচেতনতা সৃষ্টি। আমাদের এ কাজগুলো থেকে ইচ্ছা করলে বিএনপি কেন, যে কোনো রাজনৈতিক দলই তাদের নীতিনির্ধারণী প্রক্রিয়ায় তা গ্রহণ/বর্জন করতে পারেন। কিন্তু আমি ব্যক্তিগতভাবে কোনো রাজনৈতিক দলের কাঠামোভুক্ত হয়ে কাজ করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করব না। কারণ আমাদের রাজনৈতিক দলীয় সংস্কৃতিতে দলের অভ্যন্তরে ভিন্নমতের কোনো স্থান নেই। দলের শৃঙ্খলার সঙ্গে আমার ব্যক্তি স্বাতন্ত্র্য বা ব্যক্তি মতাদর্শকে আমি কম্প্রোমাইজ করতেও রাজি নই। তাই সচেতনভাবে দলীয় পরিমণ্ডলের বাইরে নাগরিক সমাজ (Civil Society) এর একজন হিসেবে থাকতে সব সময় স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি।

আমি ব্যক্তিগতভাবে সব দলের নেতা ও আদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। দ্বিমত বা পরামর্শ থাকলে তা লেখনী বা বক্তব্যের মাধ্যমে প্রকাশ করি। দলীয় বুদ্ধিজীবীরা ইচ্ছা করলে তা দলের নীতিনির্ধারণী প্রক্রিয়ায় স্থান দিতে পারেন। তবে বাংলাদেশের যে কোনো রাজনৈতিক দল কোনো পরামর্শের জন্য ডাকলে সাড়া না দেওয়ার কোনো কারণ নেই। ইতিপূর্বে অনেক দলের মুক্ত আলোচনায় অংশগ্রহণ করে নিজের বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ গ্রহণ করেছি। বহু আগে স্থানীয় সরকার সহায়ক গ্রুপ, সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুপ্র) পরবর্তীতে প্রতিষ্ঠাকালীন সময় থেকে সুজন, ড. এ টি এম শামশুল হুদার আহ্বানে গঠিত Concern Citizen Group প্রভৃতি নাগরিক সংগঠনে ক্ষুদ্র অবদান রাখার চেষ্টা করেছি। দেশে কার্যকর গণতন্ত্র, সুশাসন প্রতিষ্ঠার সব উদ্যোগে সাধ্যমতো নিজের অবদান রাখার চেষ্টা করি। এ জন্য সরকার বা কোনো রাজনৈতিক দল থেকে কোনো বড় ধরনের প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হইনি। ড. জাফরুল্লাহ চৌধুরীকে তার সাহসী ও সময়োপযোগী বক্তব্যের জন্য অভিনন্দন। আমি মনে করি, তার এ বক্তব্য বিএনপিসহ দেশের সব রাজনৈতিক দলে গণতন্ত্রায়নের জন্য প্রয়োজন এবং প্রযোজ্য।

ড. তোফায়েল আহমেদ : গবেষক এবং দেশে স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ হিসেবে সমধিক পরিচিত


বাংলাদেশের অগ্রগতিতে শরিক হতে পেরে যুক্তরাষ্ট্র গর্বিত

জন কেরি

আপনাকে অনেক অনেক ধন্যবাদ মার্শা (বাংলাদেশে মার্কিন রাষ্ট্রদূত মার্শা বার্নিকাট)। আসুন, আমরা সবাই মিলে রাষ্ট্রদূত মার্শা বার্নিকাটের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাই, তিনি বাংলাদেশে দারুণভাবে কাজ করছেন। তিনি সত্যি দুর্দান্ত কাজ করছেন।

আমি সেই সঙ্গে তাঁর সব সহকর্মীকে ধন্যবাদ জানাতে চাই। কারণ আমরা জানি এখানে যে কাজ হচ্ছে, সবাই মিলেমিশে করছেন। আর তাঁদের সবার সঙ্গে আমি একটু পরে সাক্ষাৎ করব। তাঁরা সবাই কঠোর পরিশ্রম করছেন। আসলে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক নির্মাণের চেষ্টার কাজে আমরা সবাই কঠোর পরিশ্রম করছি। আর আজ এই বিকেলে আপনারা যাঁরা এখানে উপস্থিত হয়েছেন, সবার প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাই। সবাইকে অশেষ ধন্যবাদ জানাই।

বাংলাদেশে এসে এডওয়ার্ড এম কেনেডি সেন্টার পরিদর্শন করতে পারা ব্যক্তিগতভাবে আমার জন্য একটা দারুণ সুযোগ। আমি জানি, টেড কেনেডি বাংলাদেশের ইতিহাসে এবং এ দেশের মানুষের হৃদয়ে একটি বিশেষ স্থান দখল করে আছেন। এর কারণ, ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে নিজের দূরদৃষ্টি এবং সমর্থনের বিষয়ে তিনি ছিলেন দ্ব্যর্থ, দ্বিধাহীন।

তাঁকে আমি অনেক অনেক বছর ধরে দেখেছি। আমার যখন ১৮ বছর বয়স, তাঁর সঙ্গে আমার প্রথম সাক্ষাৎ হয়। ১৯৬২ সালের কথা। তখন সবে আমি হাই স্কুল পাস করে বেরিয়েছি। পুরো একটি গ্রীষ্ম আমি টেড কেনেডিকে মার্কিন সিনেটের সদস্য হিসেবে নির্বাচিত করার কাজে বিনা পয়সায় দায়িত্ব পালন করি। এটা ছিল তাঁর প্রথম নির্বাচন। টেড কেনেডি প্রেসিডেন্ট জন এফ কেনেডির শূন্য আসনে নির্বাচন করেছিলেন। টেডের ভাই জন কেনেডি দুই বছর আগেই প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছেন।

নির্বাচনের সেই প্রচারণা ছিল দুর্দান্ত। আমি তাতে অংশ নিয়ে যেসব অভিজ্ঞতা অর্জন করেছিলাম তা অনেক বছর পর সিনেট সদস্য হতে আমাকে সহায়তা করে। ছাত্রজীবনে নির্বাচনী প্রচারণায় অংশ নেওয়ার সময় আমার কখনো মনে হয়নি বড় হয়ে আমিও একজন জুনিয়র সিনেটর হব, সিনেটর টেড কেনেডির সহযোগী হয়ে সিনেটে কাজ করব। আমরা ২৯ বছর একসঙ্গে কাজ করেছি। কয়েক বছর হলো তিনি নেই। মারা গেছেন। তবে আমি সিকি শতাব্দীরও বেশি সময় তাঁর সঙ্গে কাজ করতে পেরেছি। আর আজ তাঁর নামাঙ্কিত একটি প্রতিষ্ঠানে আসতে পেরে নিজে সম্মানিত বোধ করছি।

এখানে একটি বিষয় যোগ করতে চাই। আমার মনে হয় তাঁর ও আমার এই যে জুনিয়র-সিনিয়র সিনেটরের জুটি তা মার্কিন সিনেটের মধ্যে দীর্ঘতম। আমি তো ভাবতাম, সারাটি জীবন যদি ওভাবেই কেটে যেত! সিনেটর স্ট্রম থার্মন্ড ছিলেন ফ্রিত্জ হলিংয়ের সঙ্গে সবচেয়ে বয়সী ব্যক্তি। তিনি শতায়ু পেয়েছিলেন। তাই আমিও বলতাম, শত বছর! খুব ভালো তো। আমারও এমন সুযোগ হবে।

আমি যে ঢাকায় আসতে চেয়েছি এর অনেক কারণ রয়েছে। এখানে আমি যে সংবর্ধনা পেয়েছি তার জন্য অন্তরের অন্তস্তল থেকে কৃতজ্ঞতা জানাই। আমি বিশেষ করে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর প্রতি কৃতজ্ঞ। তাঁর সঙ্গে আমার খুবই ভালো আলোচনা হয়েছে। এখানে আমি একটি কথা জোর দিয়ে বলতে চাই।

বাংলাদেশের সংস্কৃতি বিশ্বের সবচেয়ে উন্নত, বৈচিত্র্যপূর্ণ ও সুন্দর সংস্কৃতিগুলোর একটি। এ দেশ সত্যিকার অর্থেই আ ‘গোল্ডেন বাংলা’, ‘সোনার বাংলা’।

প্রধানমন্ত্রী (শেখ হাসিনা) এবং আমার মধ্যে অত্যন্ত গভীর ও বিশদ আলোচনা হয়েছে; পররাষ্ট্রমন্ত্রী আলীসহ (এ এইচ মাহমুদ আলী) অন্য বাংলাদেশি কর্মকর্তাদের সঙ্গেও হয়েছে। আজকের এসব আলোচনার মধ্য দিয়ে সুযোগ হয়েছে স্বাধীনতার পর গত সাড়ে চার দশকে বাংলাদেশ কত দূর এগিয়েছে এবং আমাদের দুটি দেশ স্বাস্থ্য থেকে শুরু করে শিক্ষা, আঞ্চলিক নিরাপত্তা থেকে বৈশ্বিক নিরাপত্তার মতো বিষয়ে কিভাবে একযোগে কাজ করতে পারে তার ওপর আলোকপাত করার।

আমি আপনাদের জানাতে চাই, বাংলাদেশের অগ্রগতিতে শরিক হতে পেরে যুক্তরাষ্ট্র অনেক গর্বিত। বাংলাদেশ মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার তিনটি প্রধান উন্নয়ন উদ্যোগের বিষয় স্বাস্থ্য, খাদ্য নিরাপত্তা ও জলবায়ু পরিবর্তনের বিভিন্ন ইস্যুর অংশীদার। এই অংশগ্রহণকে আমরা স্বাগত জানাই।

এখন আমি জানি যে সব সময়ই কেউ না কেউ আমাদের সম্পর্কের মধ্যে কিছু টানাপড়েন অনুভব করেছে এবং এটা শুরু হয়েছিল ১৯৭১ সালে। ১৯৭১ সালে আমি বয়সে তরুণ। সবে কলেজ থেকে ফিরেছি এবং ভিয়েতনাম যুদ্ধ থেকে ফিরেছি। আমরা সবাই বাংলাদেশের স্বাধীনতার সমর্থক ছিলাম। তবে আমি এই ভেবে গর্বিত যে একা সিনেটর টেড কেনেডিই বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধে সমর্থন করেননি, আমরা সবাই সমর্থন করেছি। ম্যাসাচুসেটস বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের পক্ষে ছিল। এ জন্যও আমি গর্ব বোধ করছি।

আমরা সবাই জানি, এখন আমরা খুবই অন্য রকম এবং খুবই কঠিন এক সময় পার করছি। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বড় ধরনের ঝুঁকিতে থাকা অঞ্চলগুলো খুবই জনবহুল। তাদের অবস্থান উপকূলের কাছে। সাইক্লোন ও হারিকেনের মতো দুর্যোগের ঝুঁকিও তাদের বেশি। এ কারণেই বাংলাদেশ ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোর মধ্যে সবার শীর্ষের একদম কাছাকাছি রয়েছে। ২০৫০ সালের মধ্যে বাংলাদেশের প্রায় দেড় কোটি মানুষ তাদের আবাস হারাতে পারে। আর এ কারণেই যুক্তরাষ্ট্র, প্রেসিডেন্ট ওবামা এবং ব্যক্তিগতভাবে আমি আমাদের স্থানীয় সহযোগীদের নিয়ে কঠোর পরিশ্রম করে যাচ্ছি। কারণ উপকূলীয় এলাকার সম্পদের ওপর নির্ভরশীল লাখ লাখ বাংলাদেশি মানুষের সহযোগিতায় জলবায়ু সহিষ্ণুতা সৃষ্টি, নবায়নযোগ্য জ্বালানির নানা প্রকল্পে সহায়তা, জরুরি আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ করতে হবে।

আপনারা সবাই জানেন, জলবায়ু পরিবর্তন যে সংকট নিয়ে এসেছে তার সমাধান গোপন কিছু নয়। তা হচ্ছে জ্বালানিনীতি, যা গ্রহণ করা জরুরি হয়ে পড়েছে। আপনারা যদি সঠিক জ্বালানিনীতি গ্রহণ করতে পারেন, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সৃষ্ট সমস্যার সমাধান করতে পারবেন। আজই আমি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী (শেখ হাসিনা) ও পররাষ্ট্রমন্ত্রীর (এ এইচ মাহমুদ আলী) সঙ্গে বৈঠকে মন্ট্রিল প্রটোকলের চ্যালেঞ্জ নিয়ে কথা বলেছি। আমরা কথা বলেছি হাইড্রোকার্বন থেকে নতুন প্রযুক্তি ব্যবহারের বিষয়েও। শুধু এ কৌশল গ্রহণ করেই আমরা পৃথিবীর উষ্ণতা বৃদ্ধি আধাডিগ্রি সেলসিয়াস কমিয়ে ফেলতে পারি। কাজেই এ বিষয়ে আমাদের করার অনেক কিছুই আছে। এই পরিবর্তন আনার জন্য যেসব দেশ লড়াই করছে তাদের শীর্ষে বাংলাদেশের থাকা প্রয়োজন আছে এবং যু্ক্তরাষ্ট্রও এটা প্রত্যাশা করছে।

আমি প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি, যুক্তরাষ্ট্র ভবিষ্যতে এ বিষয়ে বাংলাদেশকে যতটুকু সম্ভব সহায়তা করবে; অতীতের বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় আমরা যেমনটা বাংলাদেশের পাশে থেকেছি। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকে যুক্তরাষ্ট্র শিক্ষক প্রশিক্ষণ, যোগাযোগব্যবস্থার আধুনিকায়ন, স্বাস্থ্য খাতের উন্নতি, শ্রমিক ও নারী অধিকার এগিয়ে নেওয়া এবং খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধিতে শত শত কোটি ডলার দিয়েছে। দুই দেশের বাণিজ্যিক সম্পর্কও এতটাই বৃদ্ধি পেয়েছে যে যুক্তরাষ্ট্র এখন বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় বাণিজ্য সহযোগী দেশ, আমরা বাংলাদেশের বৃহত্তম রপ্তানি বাজার এবং সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগেরও (এফডিআই) প্রধান উৎস।

আমাদের এ সম্পর্ক বৃদ্ধিতে অনন্য ভূমিকা রেখেছে দুই হাজার ৮০০ কোটি ডলারের তৈরি পোশাক শিল্প। আপনাদের দেশের প্রবৃদ্ধির হার ৬ শতাংশে রাখার কাজেও এটি ভূমিকা রেখেছে। তবে শুধু প্রবৃদ্ধির জন্যই প্রবৃদ্ধি আমাদের মূল উদ্দেশ্য নয়। আপনারা উন্নতি করতেই থাকলেন, করতেই থাকলেন, করতেই থাকলেন। কিন্তু এই উন্নতি হতে পারে ভুল মূল্যবোধ ঘিরে। আপনাদের উন্নতির মন্দ ফলও হতে পারে। এমনও হতে পারে, প্রবৃদ্ধি হলো; কিন্তু মানুষ অধিকার পাচ্ছে না, ন্যায্য উপার্জন পাচ্ছে না বা শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। তাই একমাত্র প্রবৃদ্ধিই কাঙ্ক্ষিত সূচক হতে পারে না। রানা প্লাজার ধস এবং এর আগে তাজরীন ফ্যাক্টরিতে আগুন—এ দুই মর্মান্তিক দুর্ঘটনা একটি মৌলিক সত্য আমাদের সামনে নিয়ে এসেছে। আর তা হচ্ছে, যতক্ষণ না বাংলাদেশে শ্রমিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে, তাদের অধিকার নিশ্চিত হবে ততক্ষণ এ দেশ তার মানুষের আশা পূরণ করতে পারবে না এবং উন্নয়নের সুফল সবার কাছে পৌঁছবে না। এটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

আর এ কারণেই বাংলাদেশ সরকার, বেসরকারি খাত, ট্রেড ইউনিয়ন ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো যে উদ্যোগগুলো নিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র তাতে ব্যাপকভাবে সমর্থন জানায়। উদ্যোগগুলো হচ্ছে কারখানার নিরাপত্তায় পরিদর্শন বাড়ানো, নিম্নমানের কারখানা বন্ধ করে দেওয়া, শ্রমিক নিগ্রহের কোনো বিষয়ে নির্ভয়ে অভিযোগ করার ব্যবস্থা থাকা।

তবে এসব উদ্যোগ একটি সম্পূর্ণ প্রক্রিয়ার অংশ। শ্রমিকদের নিরাপত্তা বাড়ানোর পাশাপাশি তাদের অধিকারও বাড়াতে হবে। দেশের তৈরি পোশাক শিল্পের কারখানায় শ্রমিকদের ক্ষমতায়ন, তাদের ইউনিয়ন করার অধিকার, দরকষাকষির অধিকারের পূর্ণ ক্ষমতা দেওয়ার মাধ্যমে বাংলাদেশের পোশাক খাত সত্যিকার অর্থে ব্যাপকভাবে উপকৃত হতে পারে। কাজটি কঠিনও নয়, সহজ। আর তা হচ্ছে ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশে, শোষিত হওয়ার সুযোগ রয়েছে এমন স্থানে কাউকে কাজ করতে বাধ্য করা যাবে না।

বেশ কয়েক বছর আগের একটি ঘটনা আপনাদের বলতে চাই। আমি তখন উত্তর ম্যাসাচুসেটসের লাওয়েল নামের একটি এলাকায় থাকি। এটি যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম প্রথম পরিকল্পিত জনপদ। শিল্প বিপ্লব এবং ইংল্যান্ডের প্রথম দিকের উন্নয়নের ওপর ভিত্তি করেই এলাকাটি বিকশিত হয়। এ এলাকার নদীর তীরে বিরাট বিরাট কারখানা গড়ে উঠেছিল। কারণ এ নদীর পানি কারখানার জন্য দরকার ছিল। কাপড়সহ নানা দ্রব্য উৎপন্ন হতো কারখানায়। আমেরিকার জন্য এ উৎপাদন দরকারও ছিল। তবে বিশাল এসব কারখানায় অনেক সময় শিশু শ্রমিক কাজ করত। তারা দুপুরের খাবারের বিরতি পেত না। টয়লেটের বিরতিও তাদের দেওয়া হতো না। ১৬ ঘণ্টা ধরে কাজ করতে হতো। শেষ পর্যন্ত শ্রমিকদের অধিকার দান এবং উন্নত কাজের পরিবেশের দাবিতে শুরু হয় আন্দোলন। পরিবর্তনও আসে।

আজকের যুক্তরাষ্ট্রের দিকে তাকান। আমরা এখন বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী অর্থনীতি হিসেবে বিকশিত হয়েছি। আমরা এখনো বিশ্বের সবচেয়ে বড় অর্থনীতি। চীনও দ্রুত উন্নতি করছে। চীনের জনসংখ্যা ১৩০ কোটি। একদিন চীন আরো বড় অর্থনীতির দেশে পরিণত হবে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র এখনো উদ্ভাবন ও সৃষ্টিশীলতার অর্থনীতি ধরে রেখেছে। আমাদের অর্থনীতি মানুষকে অধিকতর অধিকার দেয়। কিশোরদের কলেজে যাওয়ার সুযোগ দেয়। তাদের অভিভাবকদের ভালো কাজের সুযোগ করে দেয় এবং উত্তর প্রজন্মও ভালো জীবনযাপনের পরিবেশ পায়। আর তা সম্ভব হয়েছে মূলত এ জন্য যে আমরা শ্রমিকদের অধিকার দিয়েছি এবং তাদের কর্মপরিবেশের উন্নয়ন সাধন করেছি। আমরা সবার উপকারের কথা বিবেচনা করার মাধ্যমেই জাতি হিসেবে উন্নত হয়েছি। আসলে যখন একটি দেশের সবাই সুবিধা পায় তখন পুরো জাতিই উন্নতি করে। এটাই আসল তত্ত্ব। এ তত্ত্ব আমরা আমাদের অভিজ্ঞতা থেকেই জেনেছি। এখন আমরা যা করার চেষ্টা করছি তা হচ্ছে এটা মেনে নেওয়া যে এই অর্জনের জন্য আমাদের দীর্ঘ সময় ব্যয় করতে হয়েছে। কাজটা সহজ ছিল না। এসব পরিবর্তনের কিছু কিছু হয়েছে মাত্র গত ১৫ বছরে। সিনেটর টেড কেনেডি এবং অন্যদের ধন্যবাদ, আমাদের দেশের সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুবিধা দেওয়ার জন্য তাঁরা কাজ করেছেন এবং তখন আমিও ভোট দিয়েছিলাম, আমাদের দেশ আজ যে অধিকতর শক্তিশালী, এর পেছনে ওই সিদ্ধান্তের অবদান আছে।

কিন্তু আমরা এখনো নানা ক্ষেত্রে লড়াই করছি। সুতরাং আপনাদের প্রতি আমার বার্তা হলো, কখনো ক্ষুব্ধ হবেন না। কারণ রাতারাতি কিছু হয় না। সব কিছুর জন্যই সময় ও শ্রম লাগে। আপনাদের নিজেদের স্বার্থে, জাতির অগ্রগতির প্রয়োজনে বাংলাদেশের সমৃদ্ধি প্রয়োজন। কিন্তু এখানে আমাদের মনে রাখতে হবে, একটি সমাজের মানুষ নিরাপত্তা বোধ করে কি না তার সঙ্গে সমৃদ্ধির একটা সম্পর্ক আছে। আর উগ্রবাদীরা এমন স্থানকেই নিজেদের কর্মকাণ্ডের স্থল হিসেবে বেছে নেয়, যেখানে মানুষ অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিকভাবে নিজেদের প্রান্তিক, অবহেলিত বোধ করে। সহিংসতার মধ্যে প্রবৃদ্ধি অর্জন এবং তা ধরে রাখা অনেক কঠিন। বিনিয়োগের সঙ্গে নিরাপত্তার সম্পর্ক আছে। আপনারা যদি বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আশা করেন, তাদের জন্য অবশ্যই নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। আবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে সুধীসমাজ, সেই সঙ্গে গণমানুষের মত প্রকাশের ক্ষমতাকেও শক্তিশালী করতে হবে। কোনো বিষয়ে দৃষ্টি কাড়ার জন্য উগ্রপন্থা ছাড়া আর কোনো পথ খোলা নেই, যেন কেউ এমন ভাবার পরিবেশ না পায়।

এসব কারণেই সন্ত্রাসীদের, বিশেষ করে আল-কায়েদা ও দায়েশকে (আইএস) পরাজিত করতে বাংলাদেশ এবং প্রতিটি মহাদেশের অংশীদারদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করা যুক্তরাষ্ট্র অব্যাহত রাখবে। ১ জুলাই ঢাকার হলি আর্টিজান রেস্তোরাঁয় সন্ত্রাসী হামলা ছিল চরম নিষ্ঠুরতা। ওই হামলার স্পষ্ট লক্ষ্য ছিল বাংলাদেশকে বিভক্ত করা এবং সুন্দর এই সমাজকে বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন করা। এর আগে কয়েক বছর ধরে ছোট মাত্রার আরো অনেক হামলার ঘটনা ঘটেছে বাংলাদেশে। সংখ্যালঘু সম্প্রদায়, বিদেশি নাগরিক, ব্লগার কিংবা নিরাপত্তা কর্মকর্তারা এসব হামলার লক্ষ্যবস্তু হয়েছেন। হামলাগুলোর উদ্দেশ্য স্পষ্ট। তারা আপনাদের বিভক্ত করতে চায়। তারা মানুষকে পরস্পর বিচ্ছিন্ন করতে চায়। তারা চায় অভ্যন্তরীণ বিবাদ।

বাংলাদেশসহ বিশ্বজুড়ে এ ধরনের ঘৃণ্য সহিংসতা আমাদের খুব রূঢ়ভাবে মনে করিয়ে দেয় যে যারা এ ধরনের হামলা চালায় বা মদদ দেয়, তাদের ভৌগোলিক সীমানার প্রতি সম্মান, অন্যের অধিকারের বিষয়ে বিবেচনা এবং আইনের শাসনের প্রতি শ্রদ্ধা নেই। তারা বাংলাদেশ বা যুক্তরাষ্ট্র এবং বিশ্বের বেশির ভাগ মানুষের মূল্যবোধের প্রতিনিধিত্বও করে না। তাই এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট বার্তা দেওয়া জরুরি হয়ে পড়েছে।

ইরাকে মানুষ ইয়াজিদি, শিয়া ও খ্রিস্টান শুধু এ-জাতীয় পরিচয়ের কারণে আইএস জঙ্গিদের হাতে প্রাণ হারাচ্ছে। আইএস সংস্কৃতি, ইতিহাস ও ঐতিহ্যকে হামলার লক্ষ্য করছে। এ কারণেই আমি উগ্রবাদের বিরুদ্ধে লড়াইকে অন্যতম কঠিন চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখি। এ সমস্যার সমাধানে পৌঁছতে আমাদের এক প্রজন্ম বা তার চেয়েও বেশি সময় লাগতে পারে। তবে আমি বলতে চাই, আইএসকে আমরা হারাতে যাচ্ছি, তারা হারবেই। আমরা বোকো হারাম ও আল-শাবাবকেও পরাজিত করব। আমরা সেই লক্ষ্যে সঠিক পথে রয়েছি।

তবে আমাদের লড়াইটা অব্যাহত রাখতে হবে। আর তা শুধু মাঠের লড়াইয়ে নয়, মানসিকতার ক্ষেত্রে। যদি এমন হয়, অনেক তরুণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যাওয়ার সুযোগ থেকে বঞ্চিত, বেকারত্ব কিংবা হতাশা তাদের পেয়ে বসেছে—উগ্রবাদীরা তাদের দলে ভেড়ানোর সুযোগ পেয়ে যাবে। তখন এ সহিংসতা বন্ধ করা যাবে না।

মনে রাখবেন, কোনো দেশই সন্ত্রাসবাদ থেকে নিরাপদ নয়। আর আতঙ্ক ছড়ানো সহজ। সরকার ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে দিনে ২৪ ঘণ্টা, সপ্তাহে সাত দিন এবং বছরে ৩৬৫ দিন সতর্ক থাকতে হয়। কিন্তু কেউ যদি মনে করে, যেকোনো দিন সন্ত্রাসী হয়ে উঠতে পারে। নিজেকে এবং আরো কিছু মানুষকে হত্যাও করতে পারে। এ নিয়ে চমক সৃষ্টি করতে পারে। এ ক্ষেত্রে গণমাধ্যম সন্ত্রাসবাদের এ-জাতীয় ঘটনাগুলো খুব ফলাও করে প্রচার যদি না করে, আমাদের সবার জন্য মঙ্গলজনক হয়। ঘটনা হচ্ছে, আমাদের সবাইকেই ঐক্যবদ্ধ হতে হবে এবং যুক্তরাষ্ট্র সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে এ লড়াইয়ে বাংলাদেশের পাশে রয়েছে।

আরো গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হলো, সন্ত্রাসীদের পরাজিত করতে হলে আমাদের গণতন্ত্রের মূলনীতি থেকে সরে না এসে, গণতন্ত্রের সঙ্গে প্রতারণা না করে একে বরং আরো সুদৃঢ় করতে হবে। একজন মানুষ কেন সন্ত্রাসী হয়ে ওঠে? এ প্রশ্নের কোনো সুনির্দিষ্ট উত্তর হয়তো নেই। এর অনেক কারণ থাকতে পারে। তবে আমাদের ভুলে গেলে চলবে না যে এখন পর্যন্ত গণতন্ত্রই উগ্রবাদ ও সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য প্ল্যাটফর্ম। কারণ গণতান্ত্রিক পরিবেশে মানুষ তাদের ক্ষোভ প্রকাশ করতে পারে। যখন মানুষ স্বাধীনভাবে বিতর্ক করতে পারে তখন মিথ্যার দ্বারা প্রভাবিত হওয়া, শান্তির ধর্ম ইসলামকে ভুলভাবে উপস্থাপন করা এবং নাশকতায় জড়িয়ে পড়ার সুযোগটি কমে আসে।

অতএব, আজ মানুষের জন্য এই দায়িত্ববোধ বর্তায় যে তারা সমাজ বিনির্মাণে ভূমিকা রাখবে, সহিংসতার মাধ্যমে ধ্বংস করার দিকে যাবে না। এখন কেউ কেউ যুক্তি দিতে পারেন, যখন বিভিন্ন দেশ সন্ত্রাসী হামলার শিকার হচ্ছে, এমন মুহূর্তে গণতন্ত্রের মূলনীতিগুলো মেনে চলা খুবই কঠিন। আমিও বিষয়টি বুঝি। তবে এখন আমার-আপনার সামনে দুটি পথ খোলা। এর মধ্যে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ সমুন্নত রাখাটাই এ সময় বেশি গুরুত্বপূর্ণ। আপনি যদি তা না করেন, বিরোধিতা, আতঙ্ক ও উন্মাদনা থেকে সমস্যা আরো জটিল হয়ে উঠতে পারে।

বন্ধুরা, দুই দেশের মধ্যকার সম্পর্কের ভবিষ্যতের ব্যাপারে বিশ্বাসের এক নতুন বোধ নিয়ে আজ আমি এখান থেকে বিদায় নেব। আর এ নিয়ে আমার মনে কোনো দ্বিধা নেই। আরো বেশি সময় এখানে অবস্থান করার ইচ্ছা ছিল আমার। কিন্তু সমসাময়িক সংঘাতময় অবস্থা এবং দায়িত্বের বোঝা আমাকে কোথাও বেশিক্ষণ থাকার সুযোগ দেয় না। এ ব্যাপারে আমার স্ত্রী-সন্তানদেরও জিজ্ঞেস করতে পারেন। তবে আমি আপনাদের প্রাণবন্ত, গতিশীল সমাজের শক্তিটা অনুভব করতে পারছি। আমি তা অনুধাবন করতে পারছি। এখানে দারুণভাবে দায়িত্বশীল মার্কিন রাষ্ট্রদূত আমাকে এ বিষয়ে অবগত করেছেন। আমার সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী নিশা বিসওয়ালও সব সময় তা বলেন। তাঁরা যথার্থই বলে থাকেন। দুই দেশের পারস্পরিক অংশীদারির প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে আরো দৃঢ় বিশ্বাস নিয়ে আমি এখান থেকে বিদায় নেব।

আমি নিশ্চিত নই বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্র আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিয়ে এত ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করবে, বাংলাদেশ বঙ্গোপসাগরে টহল দেওয়ার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের জাহাজ ব্যবহার করবে, এক দশক আগেও কেউ এ ভবিষ্যদ্বাণী করতে পারত কি না। এখন সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলা থেকে শুরু করে মহাসাগরের পরিবেশ পর্যন্ত অনেক ক্ষেত্রেই আমাদের অভিন্ন স্বার্থ যুক্ত। সব কিছু নিয়েই আমরা একসঙ্গে কাজ করছি।

একই সঙ্গে এটা বিস্ময়কর নয় যে বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্র শুধু অভিন্ন স্বার্থের ক্ষেত্রে অংশীদার নয়, বন্ধুও বটে। ১৯৭১ সালে যখন আমি যুদ্ধের প্রতিবাদ করছিলাম, যখন সুন্দর এই দেশের অধিবাসীরা ভয়াবহভাবে আক্রান্ত হচ্ছিল তখন বিশ্বের অন্য প্রান্তে কেউ কেউ চোখ সরিয়ে রেখেছিল। আমি আগেই আপনাদের বলেছি, সে সময় আমরা তরুণতর প্রজন্মের একদল মানুষ নাগরিক অধিকার, নারী অধিকার, পরিবেশ বা শান্তিবাদী আন্দোলনে সম্পৃক্ত ছিলাম। সময়টা ছিল অসাধারণ। আমরা নতুন নতুন ধারণা ও সম্ভাবনা দেশের জনগণের সামনে তুলে ধরছিলাম। আর যে বিষয়টি আমাকে গর্বিত করেছিল তার অন্যতম হচ্ছে টেড কেনেডির বাংলাদেশের পক্ষে সমর্থন ব্যক্ত করা এবং এখানে সংঘটিত অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াই করার কাজটি।

চরম গোলযোগপূর্ণ ওই সময়ে সিনেটর কেনেডি এ অঞ্চলে ছুটে এসেছিলেন। তিনি শরণার্থী শিবির ঘুরে দেখেছিলেন। যুক্তরাষ্ট্রে ফিরে গিয়ে সিনেটে তিনি এখানকার সহিংসতাকে ‘পরিকল্পিত (সিস্টেমেটিক) ত্রাসের রাজত্ব’ বলে আখ্যায়িত করেছিলেন। পরের বছরের শুরুতে তিনি আবার এখানে ফিরে আসেন এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যুদ্ধের সময় সেনাদের হামলায় মরে যাওয়া একটি গাছের স্থানে একটি বটের চারা রোপণ করেন। পরে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে সেদিন তিনি সীমিত অর্থনৈতিক ও কৌশলগত বিষয়ের ওপর আলোচনা করেননি, বরং তিনি কথা বলেন এমন এক সম্পর্ক নিয়ে, যা হবে আরো দৃঢ়, গভীরতর ও বিশ্বজনীন। সেদিন কেনেডি বলেছিলেন, সরকারের সঙ্গে সরকারের যোগাযোগ যুক্তরাষ্ট্রের প্রকৃত পররাষ্ট্রনীতি নয়, বরং জনগণের সঙ্গে জনগণের, বন্ধুর সঙ্গে বন্ধুর, মানুষের সঙ্গে মানুষের যোগাযোগই মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির মূলকথা। কারণ এক অর্থে আমরা সবাই বাংলাদেশি, আমরা সবাই আমেরিকান। আমরা সবাই একই বিশাল মানবসমাজের অংশীদার।

যে গাছটি সেদিন আমার সাবেক সিনেট সহযোগী রোপণ করেছিলেন, তা এই দেশ জন্মলাভে দেওয়া রক্ত, আত্মত্যাগ ও সাহসের এক জীবন্ত প্রতীক হয়ে আছে। বৃক্ষটি এখনো বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের জনগণের বন্ধুত্বের প্রতীক। আজ এই যে আমি এখানে এসেছি তা এই বন্ধুত্বকে দৃঢ় করতে এবং বর্তমান ও ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় আমাদের সম্পর্ক ও সংকল্পকে জোরদার করার লক্ষ্য থেকেই। বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্র উভয় দেশের কল্যাণে সেই গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য পূরণে আপনাদের সবার সঙ্গে কাজ করতে আমি অধীর হয়ে আছি। আমরা যদি একসঙ্গে সঠিকভাবে কাজটি করতে পারি, তা সমগ্র বিশ্বের জন্যই কল্যাণকর হবে।

আপনাদের অনেক অনেক ধন্যবাদ।

জন কেরি : মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী, সোমবার ঢাকার ধানমণ্ডিতে এডওয়ার্ড এম কেনেডি সেন্টারে রাখা ভাষণের ভাষান্তর