বৃহস্পতিবার, ৮ সেপ্টেম্বর, ২০১৬

রাষ্ট্রপতি ভবন রাইসিনা হিলে’র রহস্যদুয়ার খুললেন মুগ্ধ প্রণব মুখোপাধ্যায় 

ভারতের রাজধানী দিল্লিতে যাঁরা এসেছেনইন্ডিয়া গেট থেকে রাইসিনা হিলসের দিকে তাকিয়ে দেখেছেনতাঁদেরই চোখ গিয়ে আটকেছে নর্থ ব্লকসাউথ ব্লকের মাঝখান দিয়ে চলে যাওয়া রাস্তার শেষপ্রান্তে থাকা রাষ্ট্রপতি ভবনের দিকে৷ এতদিন সর্বসাধারণের নাগালের বাইরে থাকা ওই বিশাল ভবনের পরতে পরতে ইতিহাসতার সঙ্গী কত ঘটনাকত গল্প যেমন প্রতিটি ঘরের রয়েছে একটা নাম৷ একটি ঘরের নাম মর্নিং রুম৷ সেখানে এক গভর্নর জেনারেলের স্ত্রী সকা লের চা খেতেন৷ নিয়মকানুনও অসংখ্য৷

প্রণব মুখোপাধ্যায় চার বছর আগে রাষ্ট্রপতি হওয়ার পর সাধারণ মানুষের জন্য কী করেছেনপ্রশ্নের জবাব দেওয়ার জন্য সবজান্তা গুগল হাতড়াবার দরকার নেই৷ জবাবটা হলএকসময় বড়লাটের আবাসস্থলরহস্যময়’ রাষ্ট্রপতি ভবনের দরজা সাধারণ মানুষের জন্য হাট করে খুলে দিয়েছেন তিনি৷

রাইসিনা হিলসের চোখ ধাঁধানো বিশাল প্রাসাদ আজকাল যে কেউ ইচ্ছে করলেই অনলাইনে আবেদন করে ঘুরে দেখতে পারেন৷ আগামী অক্টোবর থেকে রাষ্ট্রপতি ভবনের মিউজিয়ামও খুলে যাবে আম জনতার জন্য৷ সারা ভারত থেকে জ্ঞানীগুণীদের সাতদিন ধরে রাষ্ট্রপতি ভবনে এসে থাকার নিয়মিত আমন্ত্রণও জানান প্রণববাবু৷ যার পোশাকি নামইন রেসিডেন্স এখনও পর্যন্ত যোগেন চৌধুরী, অমিতাভ ঘোষের মতো নানা ক্ষেত্রের সফল ১৪০ জন থেকে গিয়েছেন রাষ্ট্রপতি ভবনে৷

কিন্তু রাষ্ট্রপতি ভবনের দরজা সাধারণ মানুষের জন্য খুলে দেওয়ার চিন্তাটা কী ভাবে এল তাঁর মাথায় ? মঙ্গলবার রাতে তার ব্যাখ্যাটা প্রণববাবু নিজেই দিলেনইন রেসিডেন্সঅনুষ্ঠানে৷ চার বছর আগে রাষ্ট্রপতি হয়ে এই বিশাল প্রাসাদে ঢোকার আগে ৪৩ বছর ধরে প্রণববাবু রাষ্ট্রপতি ভবনে অসংখ্যবার এসেছেন৷ তবে তা নেহাতই কাজের খাতিয়ে৷ মোট য় বার বাজেট ভোট অন অ্যাকাউন্ট পেশ করেছেন৷ প্রতিবারই সই নিতে তাঁকে রাষ্ট্রপতি ভবনে আসতে হত৷ যতবার মন্ত্রী হয়েছেন, ততবারই এখানে শপথ নিয়েছেন৷ আর সরকারি ভোজসভায় (ব্যাঙ্কোয়েট) যে কতবার এসেছেন তার হিসেব রাখা কঠিন৷ কিন্তু সে সবই ছিল ধরাবাঁধা তিনটি জায়গায় যাতায়াত৷ অশোক হলে শপথ, ব্যাঙ্কোয়েট হলে সরকারি ভোজসভা, আর যেখানে বসে রাষ্ট্রপতির সই নিতেন৷ প্রণববাবুর কথায়, ‘৪৩ বছর ধরে রাষ্ট্রপতি ভবনের ঢিলছোড়া দূরত্বে থেকেছি৷ কিন্তু রাষ্ট্রপতি ভবন সম্পর্কে আমার যে কোনও ধারণাই ছিল না৷

রাষ্ট্রপতি ভবনে আসার পর প্রথম দু-মাস তাঁকে থাকতে হয়েছিল গেস্ট হাউসে৷ কারণ, রাষ্ট্রপতির ফ্যামিলি স্যুইট তখন তৈরি হচ্ছে৷ এই গেস্ট হাউসেই এক সময় থাকতেন ব্রিটিশ গভর্নর জেনারেলরা৷ স্বাধীনতার পরে চক্রবর্তী রাজাগোপালাচারি যখন দেশের প্রথম ভারতীয় গভর্নর জেনারেল হন, তখন তিনি সেই জায়গাটা গেস্ট হাউস করে নেন৷ আর পুরোনো গেস্ট হাউসটা হয় রাষ্ট্রপতির থাকার জায়গা৷ এখনও সেই ব্যবস্থা চলছে৷ প্রণববাবুর স্বীকারোক্তি, ‘গভর্নর জেনারেলের ঘরটা এত বড় যে বলে বোঝানো যাবে না৷ আমার তো ওখানে থাকতে রীতিমতো অস্বস্তি হত৷মূল রাষ্ট্রপতি ভবনেই ৩৪০টি ঘর আছে৷ প্রায় চার বছর কাটিয়েও সবকটি ঘরে এখনও যেতে পারেননি তিনি৷ ৩২০ একরের জমিতে তৈরি রাষ্ট্রপতি ভবনে শীতকালে আসে ঝাঁকে ঝাঁকে পরিযায়ী পাখি৷ লাইব্রেরিটিও দেখার মতো৷ রাষ্ট্রপতি ভবনের পাখিদের নিয়ে কিছু দিন আগেই একটি বই প্রকাশ হয়েছে৷ এই ভবনে বাস করে যাওয়া গভর্নর জেনারেল, বিদেশি অতিথিদের নিয়েও বই প্রকাশ হয়েছে৷ গর্বের সুরে রাষ্ট্রপতি বলেন, ‘প্রতিটি ঘরে বই রয়েছে৷ এত বই যে, পাঁচ বছর তো দূর, পনেরো বছর থাকলেও সেই বই পড়া শেষ হবে না৷ এমনই রহস্যময় এই ভবন৷ আমি চাই, অন্যরাও এই রহস্যের আস্বাদ নিন৷ সেই ভাবনা থেকেই ইন রেসিডেন্স চালু হয়েছে৷বেশ কয়েকটি মজার অভিজ্ঞতাও শুনিয়েছেন প্রণববাবু৷ বলেন, ‘একটি বাচ্চা ঘড়িতে এমন অ্যালার্ম লাগিয়েছিল, যা নির্দিষ্ট সময়ে বলত, টাইম ফর মেডিসিন৷ সে তার দাদুর জন্য সেই ঘড়ি বানিয়েছিল৷ তাকেও আমি ইন রেসিডেন্স অনুষ্ঠানে এনেছি৷’ 

রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার পর প্রণববাবুকে মাত্র দুদিন সময় দেওয়া হয়েছিল এখানে আসার জন্য৷ তিনি বলছিলেন, ‘আমাকে জানিয়ে দেওয়া হল, নিজস্ব জিনিসপত্র সব একবারে নিয়ে আসতে৷ কারণ নিয়ম হল, একবার রাষ্ট্রপতি হয়ে গেলে দিল্লিতে থাকলে কখনও রাষ্ট্রপতি ভবনের বাইরে রাত কাটানো যাবে না৷ তাই মেয়েকে পাঠিয়েছিলাম সব দেখে আসতে৷ সে সময় বেশ নার্ভাস লাগছিল৷চার বছর পর এখন বঙ্গসন্তান রাষ্ট্রপতির কল্যাণে এখানকার বিরাট হেঁসেলে ঢুকে পড়েছে যাবতীয় বাঙালি খাদ্যসম্ভার৷ রসগোল্লা, সন্দেশ, মিষ্টি দই তো বটেই, আলুপোস্ত, সরষে ইলিশ, লুচি ছোলার ডাল থেকে শুরু করে যাবতীয় বাঙালি সুখাদ্য৷ আর এসেছেন বাঙালি গুণীজনরা৷ ইন রেসিডেন্স অনুষ্ঠানে সাতদিন কাটিয়ে, বুধবারই ফিরে গেলেন রঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায়৷ এর পর আসবেন পরেশ মাইতি৷ পরিবর্তনের এই হাওয়াটাও নিয়ে এসেছেন প্রণব মুখোপাধ্যায়৷ 


বুধবার, ৭ সেপ্টেম্বর, ২০১৬

মোদী-ওবামাকে চিনের তাচ্ছিল্য! বিশ্ব কূটনীতি কি চিরাচরিত সৌজন্যবোধ হারাতে বসেছে? 


চিদানন্দ রাজঘট্ট

মার্কিন প্রেসিডেন্ট থিওডোর রুজভেল্টের একটা কথা অনেকেরই জানা৷ তা হল, ‘‘নরম সুরে কথা বলো, কিন্তু হাতে সব সময় একটা লম্বা লাঠি রেখে দিও৷’’ বিশ্ব আধিপত্যের রাজনীতিতে এটাই ‘রুজভেল্ট ডকট্রিন’ নামে সুবিদিত৷ ‘টেডি’ রুজভেল্ট আরও একটা কথা বলতেন৷ সেটা হয়তো অনেকেই জানে না৷ তা হল, ‘‘ওদের (অর্থাৎ যারা আমেরিকার বিরোধী করছে) balls টিপে ধরো৷ তাহলেই দেখবে ওদের হৃদয় এবং মন তোমার ডাকে সাড়া দিচ্ছে৷’’ মোটামুটিভাবে দীর্ঘদিন যাবৎ রুজভেল্টের এই উভয় নীতি নিয়েই বিশ্বে রাজ করেছে মার্কিন প্রশাসন৷ এখন সেই তাদেরই অন্তত কূটনৈতিক সৌজন্যের খাতিরে নানাভাবে ঢিলের বদলে পাটকেল খেতে হচ্ছে৷

সম্প্রতি, চিনের মাটিতে অনুষ্ঠিত G-20-তে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা এবং তুরস্কের মাটিতে ভাইস প্রেসিডেন্ট জো বিডেন প্রায় একই রকম কূটনৈতিক অসৌজন্যের মুখোমুখি হয়েছেন৷ এক দেশের প্রতি আর এক দেশের মনোভাব বোঝাতে এভাবে কূটনীতিক শিষ্টাচারকেই বলি চড়ানোর রাস্তা নিচ্ছেন অনেক রাষ্ট্রনেতা৷ আর মিডিয়ার শ্যেনচক্ষুতে তা ধরাও পড়ে যাচ্ছে৷ যেমন, ওবামা যখন সৌদি আরবের রাজার মুখোমুখি হচ্ছেন তখন তিনি ঘাড় ঝোঁকাতে ঝোঁকাতে ঠিক কতখানি মেরুদণ্ড বাঁকিয়েছেন এবং তার পর উঠে দাঁড়িয়ে প্যান্ট তুলে কীভাবে সোজা করছেন তাও যেমন মিডিয়া ধরে ফেলছে, ঠিক তেমনই ভিন দেশের এয়ারপোর্টে কোন দেশের হয়ে কে কাকে অভ্যর্থনা জানাচ্ছে সেটাও তারা দেখছে এবং বাদবাকি দুনিয়াকে দেখাচ্ছে৷


দীর্ঘদিন ধরেই চিনে কূটনৈতিক সৌজন্যের একটা সুন্দর রেওয়াজ ছিল৷ চৌ এন লাই থেকে দেং জিয়াও পিং, কারও সময়েই তাতে খামতি ঘটেনি৷ তার কারণ হাজার হাজার বছর ধরে কনফুসিয়াস থেকে শুরু করে সান জু-র শিক্ষা৷ চিন সভ্যতার কূটনৈতিক সৌজন্যে তাই ছিল সনাতন ভারতীয় দর্শনেরই ছায়া৷ অতিথি দেব ভবঃ৷ কিন্তু ক্রমে সেই চিনও অসহিষ্ণু হয়ে পড়ছে৷ হয়তো অর্থনৈতিক অস্থিরতা তার একটা বড় কারণ৷ চিদানন্দ রাজঘট্ট লিখছেন, কূটনৈতিকভাবেও চিনের সর্বত্রই এখন একটা ‘আমিই প্রধান, আমিই প্রধান’ ভাব৷ ‘ভুলে যেও না, এটা আমাদের দেশ, এটা আমাদের এয়ারপোর্ট’, এই রকম আর কি৷ আর সে কারণেই তারা হ্যাংকাওয়ে (অধুনা হ্যাংঝাউ) G-20-র গ্রুপ ফটোয় ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীকে পাঠিয়ে দিয়েছে একেবারে মার্জিনের ধারে, ডানদিকের সাইডলাইনে৷ G-20-র সামনের সারির সেন্টার সার্কেলে চিনা সভ্যতার বরাবরের প্রতিবেশী সভ্যতার রাষ্ট্রনেতার ঠাঁই হয়নি৷ ছবিতে সামনের সারিতে মধ্যমণি চিনের প্রেসিডেন্ট জি জিনপিং৷ আর তাঁর দুদিকে রয়েছেন তুরস্ক আর জার্মানির দুই রাষ্ট্রপ্রধান৷ যদিও এখনও পরমাণু শক্তির নিরিখে আজও বিশ্বের দুই মহাশক্তিধর বলতে বারাক ওবামা কিংবা ভ্লাদিমির পুতিনকেই বোঝায়৷ তবু জি জিংপিনের দুপাশে তাঁরাও নেই৷

চিদানন্দ রাজঘট্টর মতে, একটা দেশ যখন নিজে অস্তিত্বের বিপন্নতায় ভোগে তখনই তার মধ্যে এ ধরনের একটা মানসিকতা দেখা যায়৷ তাঁর বক্তব্য, ভারতের উদীয়মান শক্তি লালচিনও রীতিমতো টের পাচ্ছে৷ আর সে কারণেই তারা কূটনৈতিক সৌজন্যের ক্ষেত্রে ভারতকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করছে৷ আমেরিকা ভারতের এই শক্তিবৃদ্ধিতে খুশি৷ অতএব আমেরিকাকেও তারা পাত্তা দিতে চায় না৷ ঠিক যেমন এক সময় ভারতের প্রধানমন্ত্রী অটলবিহারী বাজপেয়ির প্রতি এহেন কূটনৈতিক অসৌজন্য ও অশিষ্টাচার দেখিয়েছিলেন পাক একনায়ক জেনারেল পারভেজ মোশারফ৷ পক্ষান্তরে, আমেরিকায় পা দেওয়ার পর বাজপেয়ি এবং মনমোহন সিং উভয়কেই নিজেরা এগিয়ে গিয়ে উষ্ণ অভ্যর্থনায় ভরিয়ে দেন প্রেসিডেন্ট বুশ এবং প্রেসিডেন্ট ওবামা৷ তুরস্ক, ন্যাটোয় যারা কিনা এখনও টিঁকে রয়েছে মার্কিন প্রশাসনেরই বদান্যতায়, সেই দেশের প্রেসিডেন্ট এরদোগান মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জো বিডেনকে আঙ্কারায় অভ্যর্থনা জানালেন সাধারণ স্তরের কয়েকজন আমলাকে পাঠিয়ে৷ তুরস্কের চোখে আমেরিকার প্রশাসনের ‘অপরাধ’, চিরাচরিত মার্কিন ঐতিহ্য মেনে তারা বিদ্রোহী তুর্কি নেতা ফেতুল্লা গুলেনকে আশ্রয় দিয়েছে৷ একইভাবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ওবামার চোদ্দো পুরুষ উদ্ধার করে মিডিয়ার সামনে ছাপার অযোগ্য ভাষায় প্রতিক্রিয়া দিয়েছেন এশীয় ভূ-রাজনীতির নগণ্য দুকড়ি, ফিলিপিনো প্রেসিডেন্ট দুতার্তে৷ বলেছেন, লাওসে দেখা হলে ওবামাকে তিনি দেখে নেবেন৷ একে তো হাস্যকর ব্যাপার, তার উপর যে দেশের বন্দর থেকে মার্কিন নৌবাহিনী সরে গেলে সে দেশকে চিনের গিলে খেতে চব্বিশ ঘণ্টাও লাগবে না, তারা সার্বভৌমত্বের দোহাই পাড়ছে! এক্ষেত্রে ওবামা-র ‘অপরাধ’, ড্রাগ মাফিয়াদের শেষ করার অভিযানে হাজার হাজার মানুষ মারা যাওয়ায় প্রশ্ন তুলেছেন তিনি৷

ভারতের প্রতি কূটনৈতিক অসৌজন্য আমেরিকা একবারই দেখিয়েছিল৷ সেটা করেছিলেন প্রেসিডেন্ট নিক্সন৷ ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে দেখা করার আগে তাঁকে একবার ২০ মিনিট হোয়াইট হাউসের ভিজিটর্স রুমে বসিয়ে রেখেছিলেন কিসিঞ্জারের হাতের পুতুল নিক্সন৷ তখন নিক্সন-কিসিঞ্জারদের হোয়াইট হাউসে অন্তরঙ্গ কথাবার্তায় ইন্দিরা গান্ধীকে ‘কুত্তি’ বলে সম্বোধন করা হত৷ ইন্দিরা গান্ধীও সাক্ষাতের পর নিক্সনকে হাবেভাবে বুঝিয়ে দেন যে, আপনার মতো বোরিং পাবলিক খুব কমই আছে৷ নিক্সনই হলেন আমেরিকার সেই প্রেসিডেন্ট, উডওয়ার্ড ও বার্নস্টাইন এই দুই সাংবাদিকের ওয়াটারগেট কেলেঙ্কারি ফাঁসের সূত্রে যাঁকে ইমপিচ করা হয়েছিল৷ এক এই নিক্সন ছাড়া আমেরিকার আর কোনও প্রেসিডেন্টই ভারতের কোনও শীর্ষনেতাকে কখনও অসম্মান করেননি, অসৌজন্য তো দূরস্থান৷ একটা সময় ছিল যখন প্রেসিডেন্ট আইজেনহাওয়ার স্বয়ং চিঠি লিখে ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী পণ্ডিত জওহরলাল নেহরুর পরামর্শ চাইতেন৷

ভারতের সঙ্গে আমেরিকার সেই কূটনৈতিক সৌজন্যের সম্পর্ক আরও গাঢ় হয়েছে৷ ২০১৪ সালে আমেরিকায় গিয়ে মার্টিন লুথার কিংয়ের সৌধে যখন পদার্পণ করেছিলেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী, তখন ব্যক্তিগতভাবে তাঁকে সঙ্গ দেন বারাক ওবামা৷ সেই সৌজন্যের যোগ্য প্রত্যুত্তর দেন ভারতের প্রধানমন্ত্রীও৷ ২০১৫ সালে ভারতের সাধারণতন্ত্র দিবসে তাই প্রধান অতিথি হিসাবে আমন্ত্রণ পান মার্কিন প্রেসিডেন্ট৷

চিদানন্দ রাজঘট্: টাইমস অব ইন্ডিয়ার বিখ্যাত সাংবাদিক

মদ খেয়ে গাড়ি চালিয়ে সুইডিশমন্ত্রীর পদত্যাগ আইনের শাসন ও গণতন্ত্র এরই নাম

আইদা হাদজিয়ালিক
একটি দেশে কতটুকু সুশাসন বিরাজমান কিংবা দেশটি কতটুকু গণতান্ত্রিক, তা ওই দেশের গণতান্ত্রিক সরকারের মূল তিনটি খুঁটির দিকে তাকালেই বোঝা যায়। সহজভাবে বললে—আইন বিভাগ, নির্বাহী বিভাগ আর বিচার বিভাগ নামের এই খুঁটিগুলোই মূলত একটি দেশের সুস্থ সবল গণতান্ত্রিক কাঠামোর পরিচায়ক।

গত ১৩ আগস্ট শনিবার ছুটির দিন হলেও কিছু সাংবাদিক সকাল সকাল হাজির হয়েছেন সুইডিশ প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় রোসেনবদে। আগে থেকেই খবর ছিল যে সুইডিশ উচ্চমাধ্যমিক স্কুল, বয়স্ক শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ মন্ত্রী সংবাদ সম্মেলন করবেন। সেই অনুসারে সবাইকে জানানোও হয়েছিল। প্রেস সেক্রেটারি রাসমুস লেনেফোর্স প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের কোপারগেটে সবাইকে স্বাগত জানান। সংবাদ সম্মেলন সকাল ১০টায় শুরু হওয়ার কথা তাই সাড়ে ৯টা থেকেই সবাই জড় হতে থাকেন। এসেছেনও পরিচিত সকল সাংবাদিক।

 আইদা হাদজিয়ালিক সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য দিচ্ছেন 

তিনি যে অপরাধ করেছেন  আইনের চোখে অপেক্ষাকৃত কম গুরুত্বপূর্ণ হলেও একজন মন্ত্রী হিসেবে তাঁর নৈতিক দায়দায়িত্ব নিতেই হবে। আর সে কারণেই পদত্যাগ করছেন।


সকাল ১০টায় সংবাদ সম্মেলনের জন্য যিনি মাইক্রোফোনের সামনে এলেন তার নাম আইদা হাদজিয়ালিক। সাদা কালো পোশাকের মন্ত্রী আইদাকে দেখেই বোঝা যায় চিন্তায় তিনি রাতে ঠিকমতো ঘুমাতেও পারেননি। সুইডেনের ইতিহাসে তিনি সবচেয়ে কম বয়স্ক মন্ত্রী, যিনি পেশায় একজন অ্যাডভোকেট। ২৯ বছর বয়স্কা একজন মুসলিম নারী মাত্র পাঁচ বছর বয়সে বসনিয়া-হার্জেগোভিনা থেকে শরণার্থী হয়ে সুইডেনে এসেছিলেন।

বক্তব্যের শুরুতে সবাইকে শুভ সকাল জানালেন এবং সবাইকে সংবাদ সম্মেলনে আসার জন্য ধন্যবাদ জানিয়ে তিনি যা বললেন তার অর্থ এ রকম:

‘গত পরশুদিন আমি বন্ধুদের সঙ্গে ডেনমার্কের রাজধানী কোপেনহেগেনে ছিলাম। সেখান থেকে নিজ শহর মালমোতে আসার পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু সেদিন বিকেলে একটা কনসার্টের আগে দুই গ্লাস ওয়াইন পান করেছিলাম। এক গ্লাস লাল ও এক গ্লাস সাদা স্পার্কলিং মৌসেরান্দে ওয়াইন। প্রায় চার ঘণ্টা পর আমি আমার জীবনের সবচেয়ে বড় ভুলটি করেছি। আমি গাড়ি চালিয়ে বাড়ি ফিরব বলে ঠিক করছিলাম। স্বাভাবিকভাবেই আমি বিশ্বাস করেছিলাম যে আমি অ্যালকোহল ইনফ্লুয়েন্সের বাইরে রয়েছি। কিন্তু সেতু পার হওয়া মাত্রই আমাকে পুলিশের একটি স্বাভাবিক রুটিন চেকের সম্মুখীন হতে হয়। যেখানে পরীক্ষায় আমার ০.২ প্রোমিল অ্যালকোহল ধরা পড়ে। পুলিশ আমার নামে একটি মামলা করেছে। আমি আশা করছি এর জন্য আমাকে জরিমানা দিতে হবে এবং আমি এই শাস্তি মেনে নিতে রাজি আছি। একই সঙ্গে এটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ যে আমি যত দ্রুত সম্ভব এটা আপনাদের জানাই এবং আমার ভুলের মাশুল হিসেবে আমি প্রধানমন্ত্রী, আমার পার্টির সেক্রেটারি, আমার সহকর্মী আর স্বজনদের সঙ্গে কথা বলি। গতকাল সকাল ৮টায় আমি প্রধানমন্ত্রী স্টেফান লুফভেনকে টেলিফোন করি এবং বিকেলে আমাদের দেখা হয়। আমি আমার ভুলের জন্য ক্ষমা চেয়েছি এবং যা ঘটেছে তার পুঙ্খানুপুঙ্খ ব্যাখ্যা করেছি। আমি বুঝতে পারছি অনেকেই আমার ওপর ক্ষুব্ধ এমনকি আমি নিজেও গভীরভাবে মর্মাহত ও অনুতপ্ত।

ব্যক্তিগতভাবে আমি বিশ্বাস করি মদ্যপান ও গাড়ি চালনা একসঙ্গে করা ঠিক নয় এবং আমি এটা আগে কখনোই করিনি। এই বিষয়ে আইন করে দেওয়া হয়েছে ও সুস্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করে দেওয়া হয়েছে মদ্যপান করে গাড়ি চালানো কতখানি বিপজ্জনক। আইনগতভাবে আমার এই অপরাধ যত ক্ষুদ্রই হোক না কেন; তারপরও আমার মনে হয় আমি যা করেছি তা খুবই মারাত্মক ও ক্ষতিকর। আমি বেড়ে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে দায়িত্ব নিতে শিখেছি এবং এ ক্ষেত্রেও নিতে চাই। সেই জন্যই আমি প্রধানমন্ত্রীকে বলেছি যে আমার এই অপরাধের দায় নিয়ে আমি মন্ত্রিত্বের পদ থেকে সরে দাঁড়াতে চাই। আসছে সোমবার আমি আমার পদত্যাগপত্র জমা দেব এবং প্রধানমন্ত্রী বলেছেন যে তিনি তা গ্রহণ করবেন।

আমি স্টেফান লুফভেন সরকারের সঙ্গে কাজ করতে পেরে এবং এর অর্জনের জন্য গর্বিত। এ জন্যে আমি সরকারকে ধন্যবাদ জানাই, ধন্যবাদ জানাই আমার সহকর্মীদের ও সুইডিশ জনগণকে, যারা আমার ওপর বিশ্বাস ও আস্থা রেখেছিলেন।’

ঠিক এখানেই শেষ হয় সুইডিশ সরকারের সবচেয়ে কম বয়স্ক একজন মন্ত্রী আইদা হাদজিয়ালিকের বক্তব্য। সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে পদত্যাগ করে তাঁর বক্তব্যে তিনি বুঝিয়ে দেন তিনি যে অপরাধ করেছেন যা আইনের চোখে অপেক্ষাকৃত কম গুরুত্বপূর্ণ অপরাধ হলেও একজন মন্ত্রী হিসেবে তাঁর নৈতিক দায়দায়িত্ব তাঁকে নিতেই হবে। আর সে কারণেই তিনি পদত্যাগ করছেন।

মোট ছয় মিনিট ৫০ সেকেন্ডের এই সংবাদ সম্মেলনে মন্ত্রী আইদার এই বক্তব্য ছিল মাত্র দুই মিনিট ৫০ সেকেন্ডের। এরপর এই সংবাদ সম্মেলনের স্থায়িত্ব ছিল আরও চার মিনিট যেখানে সাংবাদিকেরা তাকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে বিভিন্ন রকম প্রশ্ন করেন। সেখান থেকে যে সারাংশ পাওয়া যায় তা হলো, একজন মন্ত্রী মদ্যপান করে গাড়ি চালিয়েছেন, পুলিশের স্বাভাবিক রুটিন চেকে ধরা পড়ার পর পুলিশ তাঁর নামে মামলা করেছে। ফলাফল স্বরূপ নৈতিক দায়দায়িত্ব নিয়ে তিনি পদত্যাগ করেছেন।

এর নাম আইনের শাসন, এর নাম গণতন্ত্র।

আলী হোসেন, স্টকহোম (সুইডেন) থেকে।

বিরোধিতা গণতন্ত্রে অপরিহার্য ■ ভারতের সুপ্রিম কোর্ট জানিয়ে দিল, সমালোচনা রাষ্ট্রদ্রোহ নয়

ভারতের সুপ্রিম কোর্ট

সরকারের বিরুদ্ধে ফোঁস করলেই রাষ্ট্রদ্রোহের মামলা!  ভারতের সুপ্রিম কোর্ট জানিয়ে দিল, আর নয়।

নরেন্দ্র মোদী সরকার ভারতের ক্ষমতায় আসার পর দেশটির বিভিন্ন প্রান্তে রাষ্ট্রদ্রোহের মামলা করার যেন হিড়িক পড়েছে। কখনও জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংগঠনের নেতা কানহাইয়াকে রাষ্ট্রদ্রোহের মামলায় জেলে পোরা হচ্ছে। কখনও মোদীর নিজের রাজ্য গুজরাতে পটেল আন্দোলনকারী নেতা হার্দিক পটেলের বিরুদ্ধে এই মামলা হচ্ছে। কখনও অসহিষ্ণুতা নিয়ে মুখ খোলায় অভিনেতা আমির খান ও তাঁর স্ত্রীর বিরুদ্ধে মামলা। কখনও বা প্রতিরক্ষা মন্ত্রীর উল্টো সুরে ‘পাকিস্তান নরক নয়’ বলায় কন্নড় অভিনেত্রী রম্যার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহের মামলা হয়েছে। ২০১৪ সালেই গোটা দেশে এমন ৪৭টি মামলা করা হয়েছে। গ্রেফতার করা হয়েছে ৫৮ জনকে। কিন্তু মাত্র এক জন ছাড়া কাউকে শেষ পর্যন্ত শাস্তি দিতে পারেনি সরকার।

রাষ্ট্রদ্রোহের মামলার এই অপব্যবহার রুখতেই ‘কমন কজ’ নামে একটি সংস্থা সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হয়েছিল। সেই মামলার ভিত্তিতেই শীর্ষ আদালত সাফ জানিয়ে দিয়েছে, সরকারের বিরুদ্ধে কড়া সমালোচনা করলেই তা রাষ্ট্রদ্রোহ হয়ে যায় না। কোনও বিষয় আদৌ রাষ্ট্রদ্রোহ কিনা, তা নিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে সুপ্রিম কোর্টের সাংবিধানিক বেঞ্চের নির্দেশ অক্ষরে অক্ষরে পালন করতে হবে। শীর্ষ আদালত আবেদনকারী সংস্থার আইনজীবী প্রশান্ত ভূষণকে জানিয়েছে, গোটা দেশের কোথায় এই আইনের অপব্যবহার হয়েছে, সে সব সুপ্রিম কোর্টের সামনে আনতে। আদালত মামলাগুলি বিবেচনা করে রায় দেবে।

রাষ্ট্রদ্রোহ আইনটি কী?

ভারতীয় দণ্ডবিধির ১২৪-এ ধারা অনুযায়ী, কথায়, ইঙ্গিতে বা অন্য ভাবে বৈধ সরকারের অবমাননা করতে চাইলে, ঘৃণা বা অসন্তোষ ছড়াতে চাইলে জরিমানা-সহ তিন বছর পর্যন্ত জেল বা যাবজ্জীবন হতে পারে। রাষ্ট্রদ্রোহ আইনটি তৈরি হয় পরাধীন ভারতে স্বাধীনতা সংগ্রামীদের দমন করতে। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকে আইনটি বরাবর বিতর্কে থেকেছে। ১৯৬২ সালে কেদারনাথ সিংহ বনাম বিহার সরকারের মামলায় সুপ্রিম কোর্ট আইনের ব্যাখ্যা সামনে নিয়ে আসে। শীর্ষ আদালত বলে, হিংসা ছড়িয়ে বিশৃঙ্খলা তৈরির চেষ্টা হলে কিংবা সংবিধানে বাক্ স্বাধীনতার এক্তিয়ারের পরিধি লঙ্ঘন হলেই রাষ্ট্রদোহের অভিযোগ আনা যেতে পারে। সুপ্রিম কোর্টে বিচারপতি দীপক মিশ্র ও উদয় ইউ ললিতের বেঞ্চ এখন সাংবিধানিক বেঞ্চের সেই রায়কেই অক্ষরে অক্ষরে পালন করার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন। বিচারপতিরা বলেছেন, প্রত্যেক ম্যাজিস্ট্রেটকে কেদার নাথ মামলার রায় মেনে চলতে হবে।

আবেদনকারীর আইনজীবী প্রশান্ত ভূষণের বক্তব্য, সুপ্রিম কোর্টের সাংবিধানিক বেঞ্চের রায়ের পরেও কোনও সরকারই আইন বদলাতে এগিয়ে আসেনি। ফলে মামলার সময় পুলিশের কাছে আদালতে ব্যাখ্যা সংক্রান্ত তথ্য থাকে না। আবেদনকারীর অভিযোগ, মাওবাদীদের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে চিকিৎসক বিনায়ক সেনের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগ এনেছিল ছত্তীসগঢ় সরকার। শীর্ষ আদালত সেই অভিযোগ পরে খারিজ করে দেয়। সেই সময় ইউপিএ সরকারের আইনমন্ত্রী বীরাপ্পা মইলি আইন সংশোধনের কথা বলেও পরে পিছিয়ে আসেন। তবে এখন শাসক দল বিজেপির বক্তব্য, আইনের অপব্যবহারের শিকার সকলেই। খোদ অরুণ জেটলির বিরুদ্ধেও রাষ্ট্রদ্রোহের মামলা হয়েছিল তাঁর একটি নিবন্ধের জন্য। যেখানে তিনি বিচার ব্যবস্থার সমালোচনা করেছিলেন। উত্তরপ্রদেশের এক বিচারক নিজে থেকেই জেটলির বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহের মামলা করার নির্দেশ দেন। পরে ইলাহাবাদ হাইকোর্ট সেই বিচারককে সাসপেন্ড করে দেয়। আর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের কর্তাদের বক্তব্য, মোদী সরকার ক্ষমতায় আসার পর আইনটি পর্যালোচনার জন্য ইতিমধ্যেই আইন কমিশনকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।

সরকার বা শাসকের সমালোচনা হলেই, সমালোচকের গায়ে ‘দেশদ্রোহী’ তকমা দেগে দেওয়ার অভ্যাস বেশ প্রাচীন। আমাদের দেশেও সে অভ্যাস বহু দিনের। কোনও মন্তব্যে বা প্রতিবাদে যদি অস্বস্তি হয় শাসক দলের বা সরকারের নীতি নির্ধারকদের, তা হলেই সে প্রতিবাদকে রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে দ্রোহমূলক বলে প্রতিপন্ন করার চেষ্টা ভারতে অতীতে বহু বার দেখা গিয়েছে। সম্প্রতি সে প্রবণতা আরও একটু বেশি বলে প্রতীত হয়। এই বদভ্যাসের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিল দেশের সর্বোচ্চ আদালত। সরকারের সমালোচনা মাত্রেই রাষ্ট্রদ্রোহ নয়— আরও এক বার স্পষ্ট করে জানাল সুপ্রিম কোর্ট। যে সন্ধিক্ষণে ভারত দাঁড়িয়ে আজ, তাতে খুব জরুরি ছিল এই বার্তার উচ্চারণ।

এমন উচ্চারণ যে দেশে এই প্রথম, তা কিন্তু নয়। গণতন্ত্রের রক্ষক হিসেবে পরিচিত যে প্রতিষ্ঠানগুলি, তারা বার বার ক্ষমতাসীনের এই অপচেষ্টার বিরুদ্ধে সরব হয়েছে। গণতন্ত্রে শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের সংস্থান যে চিরন্তন, সে মূল্যবোধ এ দেশে যথেষ্ট মজবুত বলেই প্রমাণিত হয়েছে। তার মধ্যেও কিন্তু বার বার বিরোধী স্বরের বিনাশাকাঙ্খা মাথাচাড়া দিয়েছে।

গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ কখনও বিরোধী স্বরের বিনাশ চায় না, সংরক্ষণই চায়। বিরোধীর শিবিরে যত ক্ষণ বেঁচে থাকে নির্ভীক সমালোচনার অধিকারবোধ, তত ক্ষণই গণতন্ত্রের আয়ুষ্কাল। যে নাগরিক চিন্তার রাজ্যে ক্ষমতাসীনের বিপরীত মেরুতে, তাঁর অধিকারের মৃত্যু আসলে গণতান্ত্রিক চেতনার মৃত্যু। এই বোধ ভারতীয়ত্বে যথেষ্টই বিদ্যমান। কিন্তু রাজনৈতিক দাপটেও এক অনাকাঙ্খিত শ্লাঘার নিহিতি রয়েছে। দাপট দেখিয়ে বিরোধী কণ্ঠস্বরকে নুইয়ে দেওয়ার মধ্যে প্রভুত্ব আস্বাদনের আহ্লাদ রয়েছে। উপমহাদেশের অন্যান্য রাজত্বেও এই প্রবণতার উপস্থিতি আমরা লক্ষ্য করেছি। তাতে গণতন্ত্রের প্রতিষ্ঠা কী ভাবে বার বার ধাক্কা খেয়েছে, তাও আমরা দেখেছি। তা সত্ত্বেও সতর্ক হতে পারিনি অনেকেই।
ভুলে গেলে চলবে না, আমাদের পারিপার্শ্বিকতায় অগণতান্ত্রিক মরুবালুরাশি। মাঝে ভারত গণতন্ত্রের সযত্নলালিত মরূদ্যান এক। গৌরবের মহিমান্বিত অস্তিত্ব সেই সত্যেই নিহিত। ভুলে যাচ্ছিলাম আমরা সে কথা। সকলে না ভুললেও অনেকেই। দেশের সর্বোচ্চ আদালত আরও এক বার মনে করিয়ে দিল। আরও এক বার স্পষ্ট বাখ্যায় জানিয়ে দিল, প্রতিবাদ, বিরোধিতা, সমালোচনা গণতন্ত্রের অপরিহার্য বৈশিষ্ট্য।

১৯৬২ সালেও এমনই সতর্কবার্তা শোনা গিয়েছিল ভারতের বিচারবিভাগের সর্বোচ্চ পীঠস্থানটি থেকে। ক্ষমতার অলিন্দে নতুন যে প্রজন্মের অধিষ্ঠান আজ, পাঁচ দশকেরও বেশি আগে ধ্বনিত সতর্কবার্তার অনুরণন সে প্রজন্মের কর্ণকুহরে নেই হয়তো আর। তাই আরও এক বার মনে করিয়ে দিতে হল কথাটা। আরও এক বার ধরিয়ে দিতে হল গণতন্ত্রের মূল সুরটা। মরূদ্যানের গরিমা নিয়ে বাঁচতে চাইলে, এই উচ্চারণের অনুরণনটা চিরন্তন করে নিতে হবে আমাদেরই।

 

সর্বদলীয় প্রতিনিধিদল ঘুরে আসার পরও শান্তি ফিরল না অশান্ত কাশ্মীরে 

নিষিদ্ধ হয়েছে নামেই। কাশ্মীরে পেলেট গানের আঘাত দেখাচ্ছেন এক ব্যক্তি



















ভারতের সর্বদলীয় প্রতিনিধিদল অশান্ত কাশ্মীর ঘুরে আসার পরও সেখানে শান্তি ফিরল না৷ বরং আবার আগের মতোই বিক্ষোভ, নিরাপত্তা বাহিনীর পেলেট গানের ব্যবহারে উত্তন্ত রইল ভূস্বর্গ৷ বিক্ষোভকারী ও নিরাপত্তা বাহিনীর সংঘর্ষে নিহত হয়েছেন আরও দু’জন। ফলে কাশ্মীরে নিহতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়াল ৭৩৷

এদিকে, কাশ্মীর সফর থেকে ফেরার পর এ দিন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সঙ্গে দেখা করেছেন দেশটির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথ সিং৷ তিনি প্রধানমন্ত্রীকে সর্বদলীয় প্রতিনিধিদলের সফর এবং কাশ্মীরের অবস্থা নিয়ে বিস্তারিত রিপোর্ট দিয়েছেন৷ বুধবার ফের সর্বদলীয় বৈঠক ডাকা হয়েছে৷ কাশ্মীরের ক্ষেত্রে সমস্যাটা হল, বিচ্ছিন্নতাবাদী নেতারা আলোচনায় বসতে রাজি নন৷ তাঁদের সঙ্গে কথা না বললে, পরিস্থিতি স্বাভাবিক হচ্ছে না৷ মেহবুবা মুফতি সরকার এখনও চেষ্টা করে যাচ্ছে বিচ্ছিন্নতাবাদীদের আলোচনার টেবিলে বসাতে৷ রাজনাথ জানিয়ে দিয়েছেন, এটা মুখ্যমন্ত্রীর ব্যক্তিগত প্রয়াস৷ এর সঙ্গে কেন্দ্রীয় সরকারের কোনও সম্পর্ক নেই৷

সর্বদলীয় প্রতিনিধিদল যখন কাশ্মীরে গিয়েছিল, তখনও সিপিএম নেতা সীতারাম ইয়েচুরিরা ব্যক্তিগতভাবে বিচ্ছিন্নতাবাদী নেতাদের বাড়িতে গিয়ে তাঁদের সঙ্গে কথা বলতে গিয়েছিলেন৷ কিন্তু তাঁদের সে প্রয়াসও সফল হয়নি৷ এতে বিব্রত রাজনাথ দায়টা বিচ্ছিন্নতাবাদী নেতাদের ওপরই চাপিয়ে দিয়েছেন৷ শুধু তাই নয়, কেন্দ্র মনে করছে কাশ্মীরে অশান্তির জন্য বিচ্ছিন্নতাবাদীরাই দায়ী৷ আর তাই, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক সূত্রে খবর, বিচ্ছিন্নতাবাদীরা বিদেশ সফর, নিরাপত্তা ও চিকিৎসা সংক্রান্ত যে সব সুযোগ-সুবিধা পান, তা সবই কাটছাঁট করার কথা ভাবা হচ্ছে৷

এদিকে বিচ্ছিন্নতাবাদীদের প্রতি ক্ষোভ গোপন রাখেননি মেহবুবাও৷ সর্বদলীয় প্রতিনিধিদের সঙ্গে বিচ্ছিন্নতাবাদীদের দেখা না করাকে ‘কাশ্মীরিয়তের’ অপমান বলে উল্লেখ করেছেন মেহবুবা৷ তাঁর কথায়, ‘অতীতে কাশ্মীর সমস্যা মেটানোর অনেক সুযোগ আমরা হারিয়েছি৷ এখনও যদি আমরা সেই সুযোগ হারাই, তবে পরবর্তী প্রজন্ম আমাদের ক্ষমা করবে না৷’

মেহবুবা মনে করেন এখন কেন্দ্রে নরেন্দ্র মোদীর ‘শক্তিশালী’ সরকার রয়েছে, তাই কাশ্মীর সমস্যা সমাধানের একটা সুযোগ রয়েছে৷ সেই বার্তা বহন করেই কেন্দ্রের প্রতিনিধি দল নিঃশর্তে কথা বলতে এসেছিলেন৷ তা ফিরিয়ে দিয়ে বিচ্ছিন্নতাবাদীরা নিজেদের কাশ্মীরিয়তকে অপমান করেছেন৷ এ সবের পরও তাঁর সরকার যে শান্তি ফেরানোর প্রক্রিয়া চালিয়ে যাবে, তাও স্পষ্ট করে দিয়েছেন মেহবুবা৷ তবে, কাশ্মীর পরিস্থিতি উন্নত হওয়ার কোনও লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না৷ বিক্ষোভকারীরা পুলিশকর্মীদের বাড়ি চড়াও হচ্ছেন৷ এতে জটিলতা বেড়েছে৷ শ্রীনগরে এ দিন কার্ফু না থাকলেও চারজন বা তার বেশি লোকের জমায়েতের ওপর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে৷ তার মধ্যেই অনন্তনাগের সির হামদান এলাকায় নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষে নাসির আহমেদ মীর নামে এক যুবকের মৃত্যু হয়৷ সোমবার রাতে সোপোরে একইভাবে আহত হয়েছিলেন মুসেইব নাগো নামে এক যুবক৷ এ দিন হাসপাতালে মৃত্যু হয়েছে তাঁর৷ বিচ্ছিন্নতাবাদীদের ডাকা বন্ধে কাশ্মীরের স্বাভাবিক জনজীবনও বিপর্যস্ত৷

এই অবস্থায় যে প্রশ্নটা সামনে এসেছে, কাশ্মীরের পরিস্থিতি কী ভাবে স্বাভাবিক হবে? এতদিন ধরে সরকারের আশা ছিল, নিরাপত্তা বাহিনী কিছুটা সংযত আচরণ করলে ধীরে ধীরে পরিস্থিতি ঠিক হয়ে যাবে৷ আর বেশিদিন এই ধরনের আন্দোলন চলতে পারে না৷ কিন্তু দেখা যাচ্ছে, কার্ফু প্রত্যাহার করেও উত্তেজনা কমেনি৷ সংঘর্ষ অব্যাহত৷ আন্দোলনকারীরা আলোচনায় বসতে উৎসাহী নন৷ এই অবস্থায় কি নতুন কোনও পন্থা নেবে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার?

মুসলিম মৌলবীদের একটি প্রতিনিধিদল এ দিন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করে৷ কাশ্মীর নিয়েই তাঁরা কথা বলেছেন৷ পরে মৌলবীদের প্রতিনিধি জানান, ‘আমরা নিশ্চিত স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী কাশ্মীর সমস্যার সমাধান করতে পারবেন৷’ পরে রাজনাথ কাশ্মীর নিয়ে নিজের বাড়িতে একটা বৈঠক ডাকেন৷ সেখানে অরুণ জেটলি, বিজেপি সভাপতি অমিত শাহ এবং জম্মুর নেতা জিতেন্দ্র সিং উপস্থিত ছিলেন৷ তাঁরাও অধরা সমাধানসূত্র নিয়ে আলোচনা করেন৷ সেখানেই স্থির হয়েছে, বুধবার সর্বদলীয় বৈঠকের পর সিদ্ধান্ত ঘোষণা হবে৷ এ দিন প্রধানমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর আলোচনার পরও নতুন কোনও সমাধানসূত্র সামনে আসেনি৷ এই অবস্থায় বুধবার সর্বদলীয় বৈঠকে আলোচনায় কী হয় , তা তাত্পর্যপূর্ণ৷

কারণ, সরকার, বিরোধী সকলেই চাইছে, কাশ্মীরে যেন দ্রুত শান্তি ফিরে আসে৷ কিন্তু কোন পথে তা ফিরবে, সেই সূত্র অধরাই৷

এর মধ্যে আবার পুঞ্চে নিয়ন্ত্রণরেখায় এ দিন সংঘর্ষবিরতি লঙ্ঘন করেছে পাকিস্তান৷ এক সপ্হেতারও কম সময় এ নিয়ে দু’বার অস্ত্রবিরতি লঙ্ঘন হল৷ সোমবার মাঝ রাত থেকে ভারতীয় সেনাছাউনি লক্ষ করে গুলি চালাতে থাকে পাক সেনা৷ ভারতীয় সেনাও পাল্টা জবাব দেয়৷ তবে, হতাহতের কোনও খবর মেলেনি৷

ফারাক্কা ব্যারেজের জন্য বিহারে বন্যা হয়নি, হলে প্রথমেই প্লাবিত হত মালদহ জেলা


যদি ফরাক্কা ব্যারেজের জন্যই বিহারে বন্যা হত তবে প্রথমেই প্লাবিত হত মালদহ জেলা৷ কিন্তু এ বছর এখনও সেখানে বন্যা হয়নি৷ ‘বাঁধ-ভেঙে-দাও ডাক বনাম নদীপথের বাস্তব’তা নিয়ে লিখছেন ভারতের নদী বিশেষজ্ঞ

 কল্যাণ রুদ্র 

প্রধানমন্ত্রীর কাছে বিহারের মুখ্যমন্ত্রী নীতীশ কুমার ফরাক্কা ব্যারেজ ভেঙে ফেলার দাবি জানিয়েছেন। সংবাদে প্রকাশ বিহারের মুখ্যমন্ত্রী নীতীশ কুমার গত ২৩ অগস্ট প্রধানমন্ত্রীর সাথে দেখা করে ফরাক্কা ব্যারেজ ভেঙে ফেলার দাবি করেছেন৷ তাঁর অভিযোগ ব্যারেজের জন্যই গঙ্গার খাতে পলি জমছে, বর্ষার বিপুল জলস্রোত বয়ে যাওয়ার পথ সঙ্কীর্ণ হয়েছে৷ আর এই জন্যই বিহারে বন্যা হচ্ছে৷ এ বছর বিহারে অাগস্ট মাসে প্রায় ৩০-৪০ শতাংশ কম বৃষ্টি হলেও ৩০ লক্ষ মানুষ বন্যায় বিপন্ন৷ বিহারের আগেই প্লাবিত হয়েছিল উত্তরপ্রদেশের এলাহাবাদ ও বারাণসী শহর৷ উজানের সেই জলের সাথে নেপাল থেকে নেমে আসা সারদা, ঘর্ঘরা ও কোশির জল যুক্ত হয়েই যে বিহারে এই বন্যা এ কথা নীতীশ কুমার বিলক্ষণ জানেন৷ তবু তিনি হঠাৎ কেন এমন দাবি করলেন এবং প্রধানমন্ত্রীই বা কেন এ বিষয়ে অনুসন্ধানের আশ্বাস দিলেন তা রাজনৈতিক বিশ্লেষণের বিষয়; তবে ফরাক্কা ব্যারেজ ভেঙে ফেলার দাবি আমরা আগেও শুনেছি৷

১৯৭৬ সালের ১৬ মে বাংলাদেশের কয়েক হাজার মানুষ মৌলানা ভাসানির নেতৃত্বে রাজশাহী থেকে ভারত সীমান্ত পর্যন্ত মিছিল করে এসেছিলেন৷ তাদের দাবি ছিল ‘ফরাক্কা ব্যারেজ ভেঙে ফেল’৷ এর পর ভাগলপুরের মৎস্যজীবীরাও সোচ্চার দাবি তুলেছিলেন ‘ফরাক্কা ব্যারেজ তোড়ো’৷ ওদের যুক্তি ছিল আগে ইলিশ মাছ বেনারস ও এলাহাবাদের গঙ্গায় এমনকী আগ্রার গা-ঘেঁষে বহমান যমুনাতেও পাওয়া যেত৷ কিন্তু ১৯৭৫ সালে ব্যারেজ নির্মাণের পর ইলিশের সেই অবাধ গতিপথ বন্ধ হয়েছে৷ এ কথা অনস্বীকার্য যে  মৎস্যজীবীদের অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা নয়৷ শুধু ফরাক্কা কেন কানপুরেও তো আরও একটি ব্যারেজ তৈরি হয়েছে৷ গত ৪ অগস্ট কেন্দ্রীয় মন্ত্রী উমা ভারতী সংসদে জানিয়েছন ফরাক্কা ব্যারেজের পাশ দিয়ে ইলিশ মাছের যাতায়াতের পথ বা ফিস ল্যাডার তৈরি করা হবে৷ সেই পথ করে দিলেও দূষিত গঙ্গা -যমুনার উজান বেয়ে ইলিশ মাছ আগের মতোই যাতায়াত করবে এমন ভাবনার যৌক্তিকতা নিয়ে আলোচনা এই নিবন্ধের বিষয় নয় ; তাই ফিরে আসি নীতীশ কুমারের কথায় ; ফরাক্কা নিয়ে তিনি যা বলেছেন তার যৌক্তিকতা নিয়ে বিতর্কের অবকাশ আছে৷ উল্লেখ্য ফরাক্কা ব্যারেজ নির্মাণের আগেও বিহারে বন্যা হত , এখন বন্যার ব্যান্তি বেড়েছে কিনা তা অবশ্যই গবেষণার বিষয়৷

নীতীশ কুমারের দাবিতে বাংলাদেশের কিছু বুদ্ধিজীবী ও সাংবাদিক যারপরনাই উল্লসিত কারণ ফরাক্কা ব্যারেজ ভেঙে ফেলার ওদের অনেক দিনের দাবিতে এ দেশেও সিলমোহর পড়ল৷ কিন্তু ওঁরা যে কথা ভাবেননি তা হল চার দশক ধরে ব্যারেজের উজানে যত পলি আর পাড়-ভাঙা বোল্ডার জমেছে তা বর্ষার প্রবল স্রোতের টানে বাংলাদেশের দিকে ধাবিত হলে গঙ্গা-পদ্মা ও তার শাখানদীগুলির খাতের কী হাল হবে? তাই প্রতিবেশী বন্ধুদের কাছে বিনীত অনুরোধ, একটু ভাবুন, ভাবা অভ্যেস করুন৷ 

ফরাক্কা ব্যারেজ নির্মিত হয়েছিল কলকাতা বন্দরকে পুনরুজ্জীবিত করার জন্য৷ আশা করা হয়েছিল গঙ্গা থেকে ৪০০০০ কিউসেক জল ভাগীরথীতে আনতে পারলে মোহানার সব পলি ধুয়ে সাগরে চলে যাবে; নৌ-পরিবহণের পথ সুগম হবে৷ সেই উদ্দেশ্যে ফরাক্কায় ব্যারেজের উজানে ৮.৭০ কোটি ঘনমিটার জল আটকে গঙ্গার জলস্তর প্রায় ৭ মিটার উঁচুতে তোলা হয়েছে৷ ৩৮ কিমি দীর্ঘ ফিডার খাল দিয়ে গঙ্গা ও ভাগীরথীকে যুক্ত করা হয়েছিল৷ ভরা বর্ষায় ফরাক্কা ব্যারেজে অতিরিক্ত জল জমতে থাকলে উজানেও তার প্রভাব পরে৷ রাজমহল থেকে ফরাক্কা পর্যন্ত ৩৫ কিলোমিটার গতিপথে এই প্রভাব স্পষ্ট বোঝা যায়৷ এ কথাও সত্যি যে স্বাভাবিক নিকাশি ব্যাহত হয় বলেই ব্যারেজের উজানে পলি জমে এবং গঙ্গার জলের সাথে প্রতি বছরে ভেসে আসা প্রায় ৫০ কোটি টন পলির কিছুটা নদী খাতে জমে থাকে৷ নীতীশ কুমার যা বলেননি তা হ’ল ব্যারেজ নির্মাণের পর মালদহে গঙ্গার গতিপথ বদলে গেছে৷ এখন রাজমহল ও ফরাক্কার মাঝে গঙ্গা ধনুকের মতো বাঁকা পথে বইছে৷ নদীর স্রোত ব্যারেজের মাঝামাঝি আঘাত করলে ১০৯টি গেট দিয়ে সমান ভাবে জল প্রবাহিত হতে পারত, কিন্তু এখন বাঁকা পথে বয়ে আসা স্রোত ব্যারেজের দক্ষিণ-পশ্চিম বা মুর্শিদাবাদের দিকে জমে যাচ্ছে৷ ডিজাইন অনুযায়ী ব্যারেজের প্রতিটি গেট দিয়ে এক সেকেন্ডে ৩০০০০ ঘনফুট (কিউসেক) জল প্রবাহিত হতে পারে৷ এ কথা সত্যি যে ব্যারেজের সব গেট খুলে দিলেও জল বেরিয়ে যেতে সময় লাগে; কিন্তু এটাই বিহারের বন্যার কারণ এমন কথা ভাবা অর্থহীন৷ এই বছর উত্তর ভারতে অতিবৃষ্টির জন্য গঙ্গা অাগস্ট মাসে স্বাভাবিকের থেকে অনেকটা উপর দিয়ে বইছিল ; এই নিবন্ধটি যখন লিখছি তখন গঙ্গার জলস্তর কানপুর, এলাহাবাদ ও বারাণসীতে বিপদ সীমার উপরে উঠে আবার নামতে শুরু করেছে৷ ওই জল যে বিহার, পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশের মধ্য দিয়ে বঙ্গোপসাগরে যাবে সে কথা নীতীশ কুমারের অজানা নয়৷ গঙ্গা বিহারে প্রবেশ করার পর তার সাথে যুক্ত হয় নেপাল থেকে নেমে আসা কোশি, গন্ডক, ঘর্ঘরা এবং দাক্ষিণাত্যের নদী শোন৷ এত জল গঙ্গা ধারণ করতে পারে না বলেই দু’কূল ছাপিয়ে ওঠে৷ প্লাবনভূমিতে নতুন পলি ছড়িয়ে কয়েক দিন পর জল নেমে যায়৷ নদীখাত গভীর হয় আর বহু ব্যবহারে ক্লিষ্ট প্লাবনভূমি আবার উর্বর হয়ে ওঠে৷ এ সব কথা বিহারের মানুষরা বিলক্ষণ জানেন৷ যদি ফরাক্কা ব্যারেজের জন্যই বিহারে বন্যা হত তবে প্রথমে প্লাবিত হত মালদহ জেলা৷ কিন্তু মালদহের গঙ্গা বিপদসীমার সামান্য উপর দিয়ে বইলেও এ বছর এখনও বন্যা হয়নি৷ উল্লেখ্য ফুলহার নদী মানিকচকের কাছে গঙ্গায় মেশার আগে দু’কূল ভাসিয়েছে; কারণ ওই নদীটিও কোশির মতোই হিমালয়ের জল বয়ে আনে৷

যদি নীতীশ কুমারের দাবি মেনে ফরাক্কা ব্যারেজ ভেঙে ফেলা হয় তা হলে পশ্চিমবঙ্গে কী প্রভাব পড়বে সেই আলোচনা জরুরি৷ প্রথমেই বলা দরকার ১৯৭৫ সাল থেকে ভাগীরথী -হুগলি নদী ফরাক্কা ব্যারেজ থেকে জল পাচ্ছে৷ ৫০০ কিমি দীর্ঘ ভাগীরথী নদীতে দক্ষিণে সাগর থেকে নবদ্বীপ পর্যন্ত জোয়ার -ভাঁটা খেলা করে৷ আর উজান থেকে যে জল বয়ে আসে তা মূলত আসে ফিডার খাল দিয়ে৷ বর্ষায় অজয়, ময়ূরাক্ষী, বাঁশলই, পাগলা --- এই সব নদী প্রচুর জল ভাগীরথীতে নিয়ে এলেও গ্রীষ্মে শুকিয়ে যায়৷ তখন ফিডার খাল দিয়ে বয়ে আসা ফরাক্কার জলই একমাত্র ভরসা৷ ওই জল না পেলে জঙ্গিপুর থেকে নবদ্বীপ পর্যন্ত ভাগীরথীর ২২০কিমি গতিপথে অক্টোবর থেকে মে মাস পর্যন্ত জল থাকবে না, নদী আগের মতো হেঁটেই পার হওয়া যাবে৷ গত চার দশক ধরে ভাগীরথীর বাস্ত্ততন্ত্র ব্যারেজের জলের সাথে খাপ খাইয়ে নিয়েছে৷ নদীর ওই অংশের জল আপেক্ষিক ভাবে কম দূষিত বলে ওখানেই আশ্রয় নিয়েছে বিপন্ন প্রজাতির ডলফিন আর বাঙালির অতিপ্রিয় ইলিশ মাছ৷ সেন্ট্রাল ইনল্যান্ড ফিসারিজ রিসার্চ ইনস্টিটিউট-এর গবেষণা থেকে জানা গেছে এই নদীতে এখনও ২২৫ প্রজাতির মাছ বেঁচে আছে এবং মৎস্যজীবীদের সংখ্যা প্রায় ২৬০০০৷ নদীপাড়ের ৩৮টি পুরসভা ও তিনটি কর্পোরেশন এই নদী থেকেই পানীয় ও গৃহস্থালির জন্য জল সরবরাহ করে৷ ফরাক্কা ব্যারেজের জল আসা বন্ধ হলে মুর্শিদাবাদ ও নদিয়ার জল সরবরাহ ব্যবস্থা ভেঙে পড়বে, অন্য দিকে হুগলি নদীর জল লবণাক্ত হয়ে যাবে৷ এই দুই জেলার ভূগর্ভের জল আর্সেনিকে দূষিত বলে নদী থেকে জল সরবরাহ করাই একমাত্র নিরাপদ উপায়৷ জঙ্গিপুর থেকে নবদ্বীপ পর্যন্ত ভাগীরথী নদীর খাত যদি কোনও দিন শুকিয়ে যায় তবে তা হবে এক জাতীয় বিপর্যয় কারণ হলদিয়া থেকে এলাহাবাদ পর্যন্ত গঙ্গা এক নম্বর জাতীয় জলপথ হিসেবে স্বীকৃত৷ নদীর এই অংশের সংস্কারের জন্য কেন্দ্রীয় সরকার ‘নমামি গঙ্গা ’ প্রকল্পের অধীনে নানা কর্মসূচি গ্রহণ করেছে৷ গঙ্গা-ভাগীরথী ফিডার খাল সহ প্রায় ২৬০ কিমি নদীপথ শুকিয়ে গেলে প্রকল্পটি বাতিল করতে হবে৷

নীতীশ কুমারের দাবিতে বাংলাদেশের কিছু বুদ্ধিজীবী ও সাংবাদিক যারপরনাই উল্লসিত কারণ ফরাক্কা ব্যারেজ ভেঙে ফেলার ওদের অনেক দিনের দাবিতে এ দেশেও সিলমোহর পড়ল৷ কিন্তু ওঁরা যে কথা ভাবেননি তা হল চার দশক ধরে ব্যারেজের উজানে যত পলি আর পাড়-ভাঙা বোল্ডার জমেছে তা বর্ষার প্রবল স্রোতের টানে বাংলাদেশের দিকে ধাবিত হলে গঙ্গা-পদ্মা ও তার শাখানদীগুলির খাতের কী হাল হবে? তাই প্রতিবেশী বন্ধুদের কাছে বিনীত অনুরোধ, একটু ভাবুন, ভাবা অভ্যেস করুন৷ পৃথিবীর এই বৃহত্তম গণতন্ত্রে আঞ্চলিক রাজনীতি নানা জটিল পথে আবর্তিত হয়৷ ফরাক্কা ব্যারেজ ভেঙে ফেলার এই অবাস্তব দাবি জাতীয় রাজনীতিতে কতটা গুরুত্ব পাবে তা দেখার জন্য আমাদের আরও কিছু দিন অপেক্ষা করতে হবে৷ তত দিনে গঙ্গা প্লাবনভূমিতে পলি ছড়িয়ে আবার তার খাতে ফিরে যাবে৷ এই ভাবেই গঙ্গা ভারতের কৃষি-অর্থনীতিকে লালন করেছে সেই অনাদি কাল থেকে৷

মঙ্গলবার, ৬ সেপ্টেম্বর, ২০১৬

স্মার্ট ফোনে আয় বাড়ছে ফেসবুকের ■ ফেসবুক ও টুইটারের মুনাফা পাল্লা দিয়ে বাড়ছে


ফেসবুক এবং টুইটারের ক্রমবর্ধমান জনপ্রিয়তার সঙ্গে সঙ্গে উপছে পড়ছে কোষাগার৷ সারা বিশ্বে মোবাইল গ্রাহকের সংখ্যা যত বাড়ছে, ততই বৃদ্ধি পাচ্ছে সোশ্যাল নেটওয়ার্কিং সাইটের সঙ্গে সমাজের সর্বস্তরের যুক্ত হওয়ার প্রবণতা৷ পাল্লা দিয়ে বাড়ছে ফেসবুক এবং টুইটারের মতো জনপ্রিয়তম সোশ্যাল নেটওয়ার্কিং সাইটের মুনাফা৷

এই দুই সংস্থার পক্ষ থেকে সম্প্রতি তাদের আয়ের যে খতিয়ান তুলে ধরা হয়েছে, তাতে স্পষ্ট মুনাফা বৃদ্ধির অঙ্ক৷ লাভের অঙ্ক বৃদ্ধির পিছনে বিজ্ঞাপনী আয়ের অঙ্ক ব্যাপক বৃদ্ধি পাওয়াই অন্যতম কারণ বলে জানিয়েছেন ফেসবুক এবং টুইটার কর্তৃপক্ষ৷

পরিসংখ্যান থেকে দেখা যাচ্ছে, গত বছরের তুলনায় এই বছরে ফেসবুকের বিজ্ঞাপন বাবদ আয় বেড়েছে ৬৩ শতাংশ৷ একই ক্ষেত্রে টুইটারের আয় বৃদ্ধি ১৮ শতাংশ৷ জুলাই-আগস্ট, এই ত্রৈমাসিকে এই বছর ফেসবুকের আয় হয়েছে ৬.২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার৷ গত বছর ঠিক এই সময়ে জুলাই-আগস্ট, তা ছিল ৩.৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার৷

টুইটারের ক্ষেত্রে তা ২০১৫ সালের জুলাই-আগস্ট ত্রৈমাসিকে ৪৫২ মিলিয়ন মার্কিন ডলার৷ এই বছর একই ত্রৈমাসিকে টুইটারের মোট আয় ১৮ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে পৌঁছে হয়েছে ৫৩৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলারে৷

এই বিপুল পরিমাণ আয় বৃদ্ধির পিছনে বিজ্ঞাপনী রোজগারই যে সবথেকে বড় মাধ্যম, তা গোপন করেনি ফেসবুক কর্তৃপক্ষ৷ ফেসবুক বলছে, শেষ কোয়ার্টারে তাদের মোট আয়ের ৯৬:৯ শতাংশ এসেছে বিজ্ঞাপন বাবদ আয় থেকে৷ আয়ের বাকিটা এসেছে বাত্সরিক পেমেন্ট এবং অন্যান্য ফি বাবদ প্রান্ত অর্থ থেকে৷

এই বিপুল পরিমাণ বিজ্ঞাপনী আয় বৃদ্ধির কারণ বিশ্লেষণ করতে গিয়ে ফেসবুক কর্তৃপক্ষ দেখতে পেয়েছে যে তাদের সাইটে বিজ্ঞাপন দিতে আগ্রহী ব্র্যান্ডগুলি, যাদের বিজ্ঞাপনী পরিভাষায় ‘ক্লায়েন্ট’ বলা হয়, তারা নিজেদের মার্কেটিং প্ল্যান অনুযায়ী মোবাইল ব্যবহারকারী বা ‘ইউজার’দের কাছে নিজেদের সংস্থার বিজ্ঞাপন পৌঁছে দিতে সদা প্রস্ত্তত৷ তাদের এই বাড়তি আগ্রহের পিছনে রয়েছে মোবাইলে বিজ্ঞাপন দেখে পণ্য কিনতে বা পরিষেবা গ্রহণে আগ্রহী জনতার বাড়তি উত্সাহ৷ এই ‘ব্র্যান্ড ইনিশিয়েটিভ’কেই নিজেদের আয় বৃদ্ধিতে রূপান্তরিত করে ফেলেছে ফেসবুক এবং টুইটার৷

টুইটারের আয়ের সিংহভাগই আসছে বিজ্ঞাপন বাবদ প্রান্ত আয় থেকে৷ সংস্থার দেওয়া তথ্য থেকে জানা যাচ্ছে যে, মোট আয় ৫৩৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের ৮৮ :৯ শতাংশ এসেছে বিজ্ঞাপনী আয় থেকে৷

মোবাইল ব্যবহারকারীদের প্রতি বিজ্ঞাপনদাতাদের বাড়তি উত্সাহের পরিমাণ বোঝা যায় ফেসবুকের আর্থিক পরিসংখ্যান থেকে৷ সংস্থার বিজ্ঞাপন বাবদ মোট আয় যেখানে ৬ :২ মিলিয়ন মার্কিন ডলার , সেখানে মোবাইল ইউজা ব্যবহারকারীদের ক্ষেত্রে বিজ্ঞাপন বাবদ আয় করেছে ৫ :২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার , যা মোট বিজ্ঞাপনী আয়ের ৮৪ শতাংশ৷ টুইটারের ক্ষেত্রেও একই ধারা দেখা যাচ্ছে৷ বিজ্ঞাপন বাবদ সংস্থার মোট আয়ের ৫৩৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের মধ্যে ৮৯ শতাংশ অর্থ এসেছে মোবাইল পরিষেবার ক্ষেত্রে দেওয়া বিজ্ঞাপন থেকে৷ পরিমাণ ৪৭৬ :১৫ মিলিয়ন ডলার৷