রবিবার, ৫ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭

সংসদীয় ব্যবস্থার একান্ত অনুরাগী সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত

সৈকত রুশদী


পরিণত, সত্তরোর্ধ বয়সে চলে গেলেন রাজনীতিক সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত। যেকোন স্তরের মানুষের সাথে সহজভাবে মিশে যাওয়ার ক্ষমতা ছিল তাঁর সহজাত। এই গুণটির কারণে তিনি অসংখ্য মানুষকে আপন করে নিতে পেরেছিলেন। এমনকী প্রতিপক্ষ রাজনৈতিক দলের নেতা ও কর্মীদের সাথেও তাঁর স্বাভাবিক কথা-বার্তার সম্পর্ক কখন ছিন্ন হয়েছে বলে আমার জানা নেই।  আর সাংবাদিকদের সাথে তাঁর সম্পর্ক ছিল ঈর্ষণীয় রকমের ঘনিষ্ঠ।
১৯৭১ সালে স্বাধীনতা যুদ্ধে প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণ ছাড়াও যে তিনটি কারণে সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের নাম বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে, বিশেষ করে সংসদীয় রাজনীতির ইতিহাসে, স্থায়ী হয়ে থাকবে, তার দু'টি ইতিবাচক।  আর একটি নেতিবাচক।
প্রথমত: তিনি ছিলেন বাংলাদেশের সংবিধান প্রণয়নকারী সংসদের অন্যতম সদস্য।  ১৯৭০ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের বিজয়ের জোয়ারের মধ্যে তিনি মস্কোপন্থী দল হিসেবে পরিচিত ন্যাপ (মোজাফফর)-এর প্রার্থী হিসেবে পূর্ব পাকিস্তানের প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। ঐবছর পাকিস্তানের সাধারণ নির্বাচনে পূর্ব পাকিস্তান অংশের জাতীয় পরিষদের নির্বাচিত সদস্য এবং পূর্ব পাকিস্তানের প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচিত সদস্যদের মধ্যে যাঁরা জীবিত ছিলেন ও স্বাধীন বাংলাদেশের পক্ষ অবলম্বন করেছিলেন, তাঁদের নিয়ে বাংলাদেশ গণপরিষদ (Constituent Assembly of Bangladesh) গঠন করা হয়।  সেই গণপরিষদের একজন বিরোধী দলীয় সদস্য হিসেবে তিনি ১৯৭২ সালের ৪ নভেম্বর বাংলাদেশের নতুন সংবিধান পাশের পক্ষে ভোট দেন এবং সংবিধানের কপিতে স্বাক্ষর করেন।  এক ঐতিহাসিক দায়িত্ব পালন করেন তিনি।
দ্বিতীয়ত: ১৯৭০ সাল থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশে যে কয়টি সংসদীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে এবং যে কয়টিতে তিনি প্রার্থী হিসেবে অংশ নিয়েছেন, একটি বাদে তার সব ক'টিতেই তিনি বিজয়ী হয়ে মোট আটবার (১৯৭০, ১৯৭৯, ১৯৮৬, ১৯৯১, জুন ১৯৯৬, ২০০১, ২০০৮ ও ২০১৪) জনপ্রতিনিধি হিসেবে জাতীয় সংসদে আইন প্রণয়নে কার্যকর ভূমিকা রেখেছেন। তাঁর চেয়ে বেশিবার সংসদ সদস্য হওয়ার রেকর্ড বাংলাদেশে আর কারও নেই। সুনামগঞ্জ জেলার দিরাই উপজেলার সন্তান সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত প্রতিনিধিত্বশীল গণতন্ত্র এবং সংসদীয় পদ্ধতির সরকার ব্যবস্থার একান্ত অনুরাগী ছিলেন। বর্তমান দশম জাতীয় সংসদের সদস্য সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত ক্ষমতাসীন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য ছিলেন।
তৃতীয়ত: আওয়ামী লীগের তৃতীয় সরকারে রেল মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে ২০১২ সালে তাঁর বাসভবনে আসার সময়ে তাঁর একান্ত সহকারী গাড়িতে নগদ ৭০ লাখ টাকাসহ বিডিআর সদর দফতরে ধরা পড়লে তাঁর বিরুদ্ধে বাংলাদেশ রেলওয়ের কর্মী নিয়োগে দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে।  বিরোধী দলের দাবি এবং জনমতের চাপে তিনি মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগ করলেও প্রধানমন্ত্রী তাঁকে দফতর বিহীন মন্ত্রী হিসেবে রেখে দেন। এই ঘটনার অল্প কিছুদিন আগে বাংলাদেশ রেলওয়ে থেকে দুর্নীতির 'কাল বিড়াল' তাড়াতে হবে ঘোষণা দিয়ে তিনি আলোচিত হয়েছিলেন। আর দুর্নীতির অভিযোগ ওঠার পর গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তাঁকেই 'কাল বিড়াল' নামে অভিহিত করা হয়।  আমৃত্যু সেই কলংকের বোঝা বয়ে চলতে হয় তাঁকে।
রাষ্ট্রপতি হোসেইন মোহাম্মদ এরশাদের সামরিক শাসনের অধীনে নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত তৃতীয় জাতীয় সংসদের (১৯৮৬-১৯৮৮) সংবাদ সংগ্রহের দায়িত্ব পালনের সময় কোন একদিন আওয়ামী লীগের এই সাংসদের সাথে আমার পরিচয় জাতীয় সংসদ ভবনের লবিতে।  সম্ভবত: মেহেরপুর-১-এর আওয়ামী লীগ দলীয় সংসদ সদস্য মোহাম্মদ সহিউদ্দীন-এর সাথে লবিতে আলাপের এক পর্যায়ে তিনি কাছে আসলে নিজের সাংবাদিক পরিচয় দিয়ে আমি তাঁর সাথে আলাপ করি।  তখন আমি দৈনিক খবর-এর প্রতিবেদক।  নিরহংকারী, সৎ ও জনদরদী সহিউদ্দীন ছিলেন আমার ফুপুর স্বামী। তিনি আমার আত্মীয়তার পরিচয় দেননি।  তবুও আমার মতো একজন তরুণ সাংবাদিকের সাথে সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের নিরহংকারী আচরণ আমাকে তাঁর সাথে যোগাযোগ রাখতে উৎসাহ দিয়েছিল।  সংসদ অধিবেশন চলার সময়ে এবং অন্য সময়েও সংবাদের জন্য তাঁর সাথে যোগাযোগ রেখেছি।
সেসময়ে প্রস্তাবিত কোন বিল নিয়ে ব্যাখ্যা ও আলোচনার জন্য দৈনিক ইত্তেফাক-এর জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক শফিকুর রহমান (বর্তমানে জাতীয় প্রেস ক্লাবের সভাপতি), জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক স্বপন দাশগুপ্ত (তখন কোন পত্রিকায় ছিলেন আজ আর মনে নেই) ও আরও দু'একজনের সাথে আমি মাঝে মাঝে সেনগুপ্তের সাথে আলাপ করতে যেতাম। তিনি প্রাঞ্জল বাংলায় সহজবোধ্য সব ব্যাখ্যা দিতেন অত্যন্ত আন্তরিকতার সাথে। চুলচেরা বিশ্লেষণ করতেন নির্মোহ ভঙ্গীতে।  কোন দলীয় দৃষ্টিকোণ ছাড়াই।  দেশের ও বিদেশের বিভিন্ন আইনের প্রেক্ষাপটের ভিত্তিতে।  তাঁর এই ব্যাখ্যা ছিল সংসদীয় রীতি-নীতি এবং আইনের ভাল-মন্দ দু'টি দিকই বিশ্লেষণ শেখায় আগ্রহী তরুণ সাংবাদিক হিসেবে আমার জন্য অত্যন্ত মূল্যবান।  আমি বাংলাদেশ টাইমস-এ (১৯৮৭) যোগ দেওয়ার পরও তাঁর সাথে আমার যোগাযোগ  অব্যাহত থাকে।  পরবর্তীকালে আমি বাংলাদেশে কানাডিয়ান, অস্ট্রেলিয়ান ও সবশেষে ব্রিটিশ হাই কমিশনে সব মিলিয়ে ১১ বছর রাজনৈতিক বিশ্লেষক হিসেবে কাজের সময়েও কোন আইন বা অধ্যাদেশ নিয়ে আলাপ-আলোচনার জন্য যখনই যোগাযোগ করেছি, তিনি সাথে সাথেই সময় দিয়েছেন। কথা বলেছেন দীর্ঘ সময় ধরে। দেখেছি সংসদীয় রাজনীতির প্রতি তাঁর অপরিসীম অনুরাগ ও প্রচেষ্টা।
জনগণের অংশগ্রহণমূলক প্রতিনিধিত্বশীল গণতন্ত্র সমুজ্জ্বল রাখা এবং সংসদীয় পদ্ধতির সরকার ব্যবস্থা চালু রাখার লক্ষ্যে আজীবন কাজ করে গেছেন তিনি।  মুক্তিযোদ্ধা ছাড়াও অন্তত: এই একটি কারণে তিনি শ্রদ্ধার পাত্র হয়ে থাকবেন, তাঁর অপর সকল দোষগুণ ছাপিয়ে।
ভাল ও মন্দ মিলিয়েই মানুষ। আজ তাঁর জীবনাবসান হয়েছে।  তাঁর বিদেহী আত্মার চিরশান্তি কামনা করছি।

টরন্টো,  ৪ ফেব্রুয়ারী ২০১৭

সৈকত রুশদী: কানাডা প্রবাসী সাংবাদিক

বৃহস্পতিবার, ২৬ জানুয়ারি, ২০১৭

বন্ধুত্বের খতিয়ানে বেসুরো সেই তিস্তা বৃত্তান্ত

জগন্নাথ চট্টোপাধ্যায়

আনন্দবাজার পত্রিকা, কলকাতা ২৬ জানুয়ারি, ২০১৭,

বিদ্যুৎ, রাস্তা, রেল-বন্দর, এলপিজি টার্মিনাল, বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে চটের বস্তা— দানের তালিকা খর্ব নয়। কিন্তু তাতেও মন ভার গ্রহীতার। জল চাই তার জল— তিস্তার জল।

গত ২৩-২৪ জানুয়ারি দিল্লিতে ভারত-বাংলাদেশ বহুমাত্রিক সহযোগিতা নিয়ে আলোচনার মূল নির্যাস এটাই। বিদেশ মন্ত্রক, পেট্রলিয়াম মন্ত্রক এবং কলকাতার ইনস্টিটিউট অব সোশ্যাল অ্যান্ড কালচারাল স্টাডিজ (আইএসসিএস)-এর উদ্যোগে এই আলোচনা সভায় ছিলেন দু’দেশের চার মন্ত্রী। আলোচনায় অংশ নেন দু’দেশের বেশ কয়েক জন কূটনীতিকও। কিন্তু গত সাত বছরে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের সর্বোচ্চ অবস্থানে থেকেও কোথাও যেন তাল কেটে যাচ্ছিল। এর কারণ অবশ্যই তিস্তা চুক্তি বাস্তবায়নে অপারগতা।

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী একেএম মোজাম্মেল হক জানান, একাত্তরে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে যে ১,৬৮৬ জন ভারতীয় সেনা প্রাণ দিয়েছিলেন, তাঁদের পরিবারকে পাঁচ লক্ষ টাকা আর মানপত্র দিচ্ছে শেখ হাসিনা সরকার। তাঁর কথায়, ‘‘ভারত না-থাকলে আজ আমরা দেশই পেতাম না।’’ কিন্তু প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নয়াদিল্লি সফর পর পর দু’বার বাতিল হওয়াটা মোটেই শুভ সংকেত নয়। কেন স্থগিত হচ্ছে সফর? মোজাম্মেল সাহেবের কথায়, ‘‘বড় কারণ অবশ্যই তিস্তার পানি পাওয়া নিয়ে অনিশ্চয়তা। ভারতকে এ বার একটু  তৎপর হতে হবে।’’

ঢাকার সঙ্গে সম্পর্ক চাঙ্গা রাখতে ভারতের তৎপরতার কথা আলোচনার শুরুতেই জানিয়েছিলেন বিদেশ মন্ত্রকের যুগ্মসচিব শ্রীপ্রিয়া রঙ্গনাথন। তিনি বলেন, ‘‘২০১৫ সালে ৭.৫৩ লক্ষ বাংলাদেশিকে ভিসা দেওয়া হয়েছিল, ২০১৬ সালে তা বেড়ে হয়েছে ৯.৬ লক্ষ। এতেই স্পষ্ট আদানপ্রদান আজ কতটা নিবিড়।’’ কেন্দ্রীয় বস্ত্র মন্ত্রী স্মৃতি ইরানির কথায়,‘‘সংস্কৃতি তো এক। জামদানি দু’দেশেই তৈরি হয়। জামদানির সূত্রেও তো বাঁধা পড়তে পারে দু’দেশ।’’ সেই সূত্রেই এসেছে চট্টগ্রাম বন্দরে এলপিজি টার্মিনাল, রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্র, গ্যাস পাইপলাইন তৈরির বিষয়ও। পেট্রলিয়াম মন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান বলেন ভারত-রাশিয়া গ্যাস পাইপলাইন তৈরি হলে তা মায়ানমার-বাংলাদেশের মধ্যে দিয়েও আনা হতে পারে। সে ক্ষেত্রে গ্যাস তো পাবেই, ট্রানজিট দিয়ে বহু রাজস্ব আদায় করতে পারবে বাংলাদেশ।

কিন্তু গ্যাসের সঙ্গে সঙ্গে তিস্তার জলের দাবি থেকেও সরছেন না বাংলাদেশের প্রতিনিধিরা। বাংলাদেশের হাই-কমিশনার সৈয়দ মুয়াজ্জেম আলির আক্ষেপ, ‘‘আমরা তো প্রস্তুত। কিন্তু ভারতকে তো নিজেদের অভ্যন্তরীন সমস্যা মেটাতে হবে। সেই সমস্যা যাতে দ্রুত মেটে তার দিকে আমরা তাকিয়ে আছি।’’

তিস্তার প্রসঙ্গই অবশ্য তোলেননি বিদেশ প্রতিমন্ত্রী এম জে আকবর। তাঁর সাফ কথা, ‘‘আজ না-হোক কাল ঢাকা-দিল্লির বন্ধুত্বের সব সমস্যা মিটে যাবে। সব সমস্যা একেবারে মিটে গেলে তো মন্ত্রী-কূটনীতিকদের চাকরিই থাকবে না!’’

মঙ্গলবার, ২৪ জানুয়ারি, ২০১৭

কোরআনে হাত রেখে শপথ নিলে পশ্চিমা মিডিয়া মুসলিম মৌলবাদী আখ্যা দিত!

সৈয়দ আবুল মকসুদ

যুক্তরাষ্ট্রসহ অনেক দেশে ট্রাম্পের বিরুদ্ধে উত্তাল বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হয়শুক্রবার রাতে যুক্তরাষ্ট্রের ৪৫তম প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অভিষেক অনুষ্ঠানটি টেলিভিশনের পর্দায় দেখলাম। খুবই সুন্দর অনুষ্ঠান। খরচ হয়েছে ২০ কোটি ডলার। এর আগের কয়েকজন প্রেসিডেন্টের যেমন বড় বুশ, বিল ক্লিনটন, ছোট বুশ ও বারাক ওবামার ক্ষমতা গ্রহণের অনুষ্ঠানও দেখেছি, তবে তত মনোযোগ দিয়ে নয়, যতটা মনোযোগ দিয়ে দেখেছি মিস্টার ট্রাম্পের অভিষেক।
খ্রিষ্টধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যে অনুষ্ঠানটি সম্পন্ন হওয়ায় আরও ভালো লাগল। খ্রিষ্টধর্মাবলম্বী অধ্যুষিত দেশ বলেই নয়, খ্রিষ্টানপ্রধান দেশ দুনিয়ায় আরও আছে, কিন্তু আমেরিকার জনগণের গড ও যিশুখ্রিষ্টে অবিচল আস্থা। তাদের ভাষায়: ‘ইন গড উই ট্রাস্ট’। পৃথিবীর অনেক দেশের মতো সাংঘাতিক সেক্যুলার-কাম-রাষ্ট্রধর্মের দেশ তাদের নয়। পৃথিবীর অধিকাংশ মানুষের মতো ধর্ম তাদের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। তাই অভিষেকের আগে ট্রাম্প সাহেব ও তাঁর রানি মেলানিয়া গির্জায় গিয়ে প্রার্থনা করেছেন। (অভিষেকের পরে অবশ্য তিনটি বল ড্যান্স কনসার্টের আয়োজন ছিল, তাতে দম্পতিরা নেচেছেন এবং মি. ট্রাম্প রূপসী মেলানিয়াকে দীর্ঘস্থায়ী চুম্বনে তাঁর প্রগাঢ় ভালোবাসার প্রকাশ ঘটিয়েছেন।) হোয়াইট হাউসে গিয়ে তাঁরা বিদায়ী প্রেসিডেন্ট ও ফার্স্ট লেডির সঙ্গে চা বা কফি খেয়েছেন। ইসায়ী ধর্মের বিভিন্ন শাখা ক্যাথলিক, লুথারিয়ান, প্রটেস্ট্যান্ট গির্জার ধর্মযাজকেরা ও র্যাবাই (ইহুদি-ধর্মযাজক) এলেন এবং তাঁরা তাঁদের বাণী পাঠ করলেন। তাঁদের বাণীতে বারবার গড (ঈশ্বর) এবং যিশুখ্রিষ্টের নাম উচ্চারিত হলো। তারপর নতুন প্রেসিডেন্টকে প্রধান বিচারপতি শপথবাক্য পাঠ করান। তাঁর এক হাত উত্তোলিত, আরেক হাত পবিত্র বাইবেলের ওপর রাখা। একটি ট্রেতে সে বাইবেল ধরে ছিলেন মিসেস মেলানিয়া।


কোনো মুসলমানপ্রধান দেশের সরকার বা রাষ্ট্রপ্রধানের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠান।  দেশের জাতীয় মসজিদে গিয়ে দুই রাকাত নফল নামাজ আদায় করলেন। তারপর গেলেন শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে।  কোরআনের ওপর হাত রেখে সর্বশক্তিমান আল্লাহর (গড) নামে শপথ নিলেন। ওই দেশ ও ওই রাষ্ট্রপতি/প্রধানমন্ত্রীকে নির্ঘাৎ মুসলিম মৌলবাদী বলে আখ্যায়িত করত পশ্চিমের বস্তুনিষ্ঠ মিডিয়া।

যদিও যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানে সরকারি পদ গ্রহণের জন্য কোনো ধর্মপালনের বিধান নেই, তবু অধিকাংশ প্রেসিডেন্ট গির্জায় যান। তা তিনি সেখানে গিয়ে কায়মনোবাক্যে প্রার্থনা করুন বা না করুন। বারাক হোসেন ওবামাও গিয়েছেন।
কল্পনা করুন, পৃথিবীর মানুষের যে মনস্তত্ত্ব, তাতে কোনো উন্নয়নশীল দেশের, বিশেষ করে কোনো মুসলমানপ্রধান দেশের সরকার বা রাষ্ট্রপ্রধানের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠান। প্রেসিডেন্ট বা প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হয়ে শপথ নেবেন। তার আগে তিনি দেশের জাতীয় মসজিদে গিয়ে দুই রাকাত নফল নামাজ আদায় করলেন। তারপর গেলেন শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে। সুন্নি, শিয়া বা অন্য কোনো মাজহাবের ইমামরা এলেন এবং তাঁরা তাঁদের আশীর্বাণী পাঠ করলেন। সব শেষে কোরআনের ওপর হাত রেখে সর্বশক্তিমান আল্লাহর (গড) নামে শপথ নিলেন। ওই দেশ ও ওই রাষ্ট্রপতি/প্রধানমন্ত্রীকে নির্ঘাৎ মুসলিম মৌলবাদী বলে আখ্যায়িত করত পশ্চিমের বস্তুনিষ্ঠ মিডিয়া।
গণতন্ত্র ইউরোপের কোনো কোনো দেশে ছিল রাজতন্ত্রের সঙ্গে মিলেমিশে, কিন্তু গত প্রায় আড়াই শ বছর যাবৎ যুক্তরাষ্ট্রের গণতন্ত্র বিশ্বব্যাপী প্রশংসিত হয়েছে। সেই গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে সে দেশের প্রতিষ্ঠাতারা স্মরণীয় ভূমিকা পালন করেছেন। এবং তাঁদের সঙ্গে মার্কিন দার্শনিক ও চিন্তাবিদদের ভূমিকাও বিরাট। জর্জ ওয়াশিংটন, টমাস জেফারসন, জেমস ম্যাডিসন, আব্রাহাম লিংকন, থিওডোর রুজভেল্ট, ফ্রাঙ্কলিন রুজভেল্ট, ডি ডি আইজেনহাওয়ার, জন এফ কেনেডি প্রমুখ আমেরিকার উন্নতিতে ও গণতন্ত্র
প্রতিষ্ঠায় অবিস্মরণীয় ভূমিকা রেখেছেন। তাঁদের সঙ্গে চার্লস পিয়ার্স, উইলিয়াম জেমস, যোশিয়া রয়েস, জর্জ সান্তায়ানা, জন ডিউই, আলফ্রেড হোয়াইটহেড প্রমুখ দার্শনিক ও ভাবুকেরা জাতির একটি দার্শনিক ভিত্তি তৈরি করে দিয়ে গেছেন। আমেরিকাকে পৃথিবীতে এক নম্বর বানাতে কোনো ধনকুবেরের চেয়ে তাঁদের এবং বিজ্ঞানী-শিক্ষাবিদদের ভূমিকাই প্রধান। পুঁজিবাদী সমাজে ধনকুবেরদের একটা ভূমিকা তো থাকেই।

বাইবেলে হাত রেখে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নিচ্ছেন বারাক হোসেইন ওবামা
শুধু আমেরিকার নয়, যেকোনো দেশের রাষ্ট্রপ্রধানের অভিষেক অনুষ্ঠান অবশ্যই আনন্দের বিষয়। কিন্তু ট্রাম্প যখন দায়িত্ব বুঝে নেন তখন তাঁর দেশে এবং পৃথিবীর অনেক দেশে তাঁর বিরুদ্ধে উত্তাল বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হয়। বাংলাদেশ ছাড়া পৃথিবীর অন্তত ৬০টি দেশে নারীসমাজ রাজপথে নেমেছে বিচিত্র প্ল্যাকার্ড বহন করে এবং স্লোগান দিতে দিতে। যাঁর আশীর্বাদ আবশ্যক, সেই মাননীয় রোমান ক্যাথলিক পোপ পর্যন্ত আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন: দুনিয়া কি একুশ শতকের হিটলারকে দেখতে যাচ্ছে?
নির্বাচনী প্রচারণার সময় থেকেই মি. ট্রাম্পের কথাবার্তা ও অঙ্গভঙ্গি জাতি-ধর্ম-বর্ণনির্বিশেষে বিশ্বব্যাপী বহু মানুষের অন্তরের গভীরতম স্থানে আঘাত করেছে। শতাধিক বছর ধরে পৃথিবীর শুভবুদ্ধিসম্পন্ন নারী ও পুরুষ নারীর অধিকার ও মর্যাদার জন্য আন্দোলন-সংগ্রাম করেছেন শত শত বছরের পুরুষতান্ত্রিকতার প্রাধান্য কমাতে। সেই নারী জাতিকেও তিনি অসম্মান করেছেন। মার্টিন লুথার কিং জুলিয়ারের ছিল একটা ড্রিম—স্বপ্ন। সেই স্বপ্ন বিদায়ী প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার মাধ্যমে আংশিক পূরণ হয়েছে। মি. ট্রাম্প বাকি অংশ নস্যাৎ করে দিলেন। তাঁর ১৫ সদস্যের মন্ত্রিপরিষদে মাত্র একজন কৃষ্ণাঙ্গ, লাতিন বংশোদ্ভূত কারও স্থান হয়নি।
নির্বাচনের আগে মি. ট্রাম্প ইঙ্গিত দিয়েছেন ভারত ও হিন্দুদের তিনি ভালোবাসেন। কিন্তু নির্বাচিত হয়ে টেলিফোনে কথা বলেছেন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফ ও তাইওয়ানের সরকারপ্রধানের সঙ্গে। চীনের চেয়ে তাইওয়ান তাঁর কাছে গুরুত্বপূর্ণ হওয়ার অর্থ চীনের নেতাদের বোঝার ক্ষমতা যথেষ্ট।
হিন্দুপ্রধান ভারত একটি বহু জাতি ও বহু ধর্মাবলম্বীর বাসভূমি। ভারত একটি মহান সভ্যতা। ভারতের ইতিহাস-ঐতিহ্য আমেরিকার ইতিহাস-ঐতিহ্যের চেয়ে হাজার গুণ পুরোনো। সেখানে হিন্দুধর্মাবলম্বীরা সংখ্যাগরিষ্ঠ এবং হিন্দুদেরই প্রাধান্য। কিন্তু সাংবিধানিকভাবে এখনো ভারত একটি ‘ধর্মনিরপেক্ষ গণতন্ত্র’। সেখানে রাষ্ট্রপতি থেকে রাষ্ট্রের যেকোনো পদে অহিন্দুদের নিযুক্তিতে কোনো বাধা নেই। কিন্তু মি. ট্রাম্প হতে চান শুধু ভারতের হিন্দুদের বন্ধু—ভারতের বৌদ্ধদের নয়, পার্সিদের নয়, আহমদিয়াদের নয়, শিখদের নয়, বাহাইদের নয় এবং শুধু ভারতের কেন, কোনো মুসলমানের তো নয়ই। তাঁর এই উক্তি পৃথিবীর ইতিহাসে কোনো রাষ্ট্রনায়কের সবচেয়ে সাম্প্রদায়িক উচ্চারণ।
আগামীকাল যদি চীনের প্রেসিডেন্ট বলেন, আমি শুধু বাংলাদেশের মুসলমানদের বড় বন্ধু। চীনের ব্যবসা-বাণিজ্য বাংলাদেশের মুসলমানরাই বেশি পাবেন। রাশিয়ার পুতিন যদি বলেন, আমরা বাংলাদেশের মুসলমানদের বন্ধু, তা হবে বাংলাদেশের সমগ্র জনগোষ্ঠীর প্রতি অপমান। কারণ, তা বাংলাদেশের হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিষ্টানদের প্রতি চরম অবজ্ঞার শামিল।
ট্রাম্প সাহেব খুবই বুদ্ধিমান। তিনি রাশিয়ার প্রশংসা করে বৌদ্ধপ্রধান চীনকে চাপে রাখতে চান, মুসলমানদের নিন্দা করে হিন্দুপ্রধান ভারতকে প্রীত করতে চান। তিনি তাঁর উদ্বোধনী ভাষণে ইসলামি জঙ্গিদের নির্মূল করার অঙ্গীকার করেছেন। পৃথিবীর পনেরো আনা মুসলমানও চায় ইসলামি জঙ্গিরা নির্মূল হোক, আইএস ও আল-কায়েদা নির্মূল হোক। কিন্তু তাদের নির্মূল করার ষোলো আনা দায় বিধাতা তাঁকেই দিয়েছেন, তা বিশ্বাসযোগ্য নয়।
মুসলমানদের একটি ক্ষুদ্র গোষ্ঠী মধ্যপ্রাচ্যে কী কারণে টেররিস্ট হয়েছে, তা ট্রাম্প সাহেবের চেয়ে ভালো আর কেউ জানে না। তিনি পৃথিবীর যাবতীয় বিষয় বাদ দিয়ে চাইছেন ইসরায়েলে তাঁর দেশের দূতাবাস তেল আবিব থেকে সরিয়ে জেরুজালেমে নেবেন। জেরুজালেম মুসলমানদের পবিত্র স্থান। সেখানে কি ব্রিটেন, ফ্রান্স, জার্মানি, ভারত, চীনের দূতাবাস আছে? এই দূতাবাস সরানোর ঘোষণার কী অর্থ, তা তাঁর অবশ্যই জানা আছে।
সারা দুনিয়ার মানুষের কপালে যা ঘটবে, আমাদেরও তা–ই হবে। তাই বেশি ভাবার কিছু নেই। মনে হয়, হালকা থেকে মাঝারি ধরনের জঙ্গিবাদ আমাদের সরকারের জন্য সুবিধাজনক। পশ্চিমা দুনিয়া তা-ই চায়। প্রধানমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী যতই বলছেন বাংলাদেশে আইএস বা আল-কায়েদা নেই; সাধারণ মানুষেরও তা-ই ধারণা, কিন্তু আমেরিকা বলতে চাইছে, তারা আকছার আছে। এর মধ্যে কিছুদিন আগে ভারতের প্রভাবশালী দৈনিক দ্য হিন্দুকে তথ্যমন্ত্রী জানান, বাংলাদেশে ৮ হাজার আল-কায়েদা জঙ্গি আছে। ৮ হাজার বা ৮০০ খুব বেশি সংখ্যা, যদি বাংলাদেশে দুই-এক শ আল-কায়েদার জঙ্গি থাকত, তাহলে জনগণ ও সরকার অবশ্যই টের পেত।
বাংলাদেশ তার তৈরি পোশাকসহ পণ্যের শুল্কমুক্ত সুবিধা বা জিএসপি নিয়ে এমনিতেই মুশকিলে আছে। দর-কষাকষির ক্ষমতা আমাদের ব্যবসায়ী নেতা ও আমলাদের পর্যাপ্ত নেই। ট্রাম্প প্রশাসন যে দয়াপরবশ হয়ে বাংলাদেশকে জিএসপি সুবিধা দেবে, সে আশা দুরাশা। অথচ আমাদের রপ্তানি পণ্যের জন্য তা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তার ওপর যদি আল-কায়েদা বা আইএস নিয়ে আসামির কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হয়, তাহলে বিপদের আশঙ্কা।
আমেরিকা শুধু ফার্স্ট নয়, যদি ফার্স্টতরও হয়, তাতে আমাদের ঈর্ষার কারণ নেই। কারণ, আমরা তার প্রতিদ্বন্দ্বী হতে পারব না। আমাদের রোল নম্বর দুই নয়, তিন অঙ্কের ঘরে। সম্পদে, সামরিক অস্ত্রে, জ্ঞানে যে জাতি বড়, তাকেই মানুষ বড় বলে। ওসবের অগ্রগতিতেই বড় বা এক নম্বর হওয়া যায়।
কোনো জাতির সমৃদ্ধি ও সভ্যতা চিরকাল এক রকম থাকে না। একটি সময় তা চূড়া স্পর্শ করে। তারপর শুরু তার পতনের। পতন শুরু হওয়ার পরও ২০, ৫০ বছর এক রকম থাকে, ভেতরে-ভেতরে ক্ষয় হয়ে গেলেও। তবে শাসকদের কারও না কারও হাতে পতনের আনুষ্ঠানিক সূচনা হয়। রোমান সাম্রাজ্যের পতন ঘটেছে। তুরস্কের ওসমানীয় সাম্রাজ্যের পতন ঘটেছে। ভারতবর্ষে মোগল সাম্রাজ্যের পতন ঘটেছে, যার শুরু আওরঙ্গজেব থেকে। একসময় ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের সূর্য অস্ত যেত না। উদার ও দূরদৃষ্টিসম্পন্ন শাসক ছাড়া কোনো হঠকারী সংকীর্ণচেতা শাসক কোনো জাতিকে উচ্চতায় নিয়ে যেতে পারে না, ধ্বংসের সূচনা করতে পারে মাত্র।
আমাদের প্রাচ্যের, বিশেষ করে ভারতবর্ষের নীতি সবার সঙ্গে ঐক্য ও সম্প্রীতি। আমরা মানুষে মানুষে অবিশ্বাস, ঘৃণা, বিদ্বেষ, ষড়যন্ত্র, ভীতি প্রদর্শন অপছন্দ করি। আমেরিকায় ট্রাম্প সাহেব ছাড়া আরও মানুষ আছেন। তাঁদের শুভবুদ্ধি আছে বলে জানি। যুক্তরাষ্ট্রের সাংবিধানিক ও গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোও শক্তিশালী। রাজনীতিকদের অনেকের দেশপ্রেম ও কাণ্ডজ্ঞান অসামান্য। মার্কিন কংগ্রেসের অনেক সদস্য তাই ট্রাম্পের অভিষেকে যোগ দেননি। সেখানকার পোশাক ডিজাইনারদের প্রায় কেউই মিসেস ট্রাম্পের পোশাকের নকশা করতে সম্মত হননি। তাই আশা করি কোনো ব্যক্তিবিশেষ পৃথিবীকে অস্থিতিশীল করতে পারবেন না।

সৈয়দ আবুল মকসুদ: লেখক ও গবেষক।

প্রথম আলো’র সৌজন্যে

শুক্রবার, ৬ জানুয়ারি, ২০১৭

৫ জানুয়ারির ভুল, ভুল থেকে শিক্ষা

একটি নির্বাচনকালীন গ্রহণযোগ্য সরকার গঠন করতে হবে। এসব কাজে সরকারকে বিরোধীদল কর্তৃক সর্বতোভাবে সহায়তা করতে হবে। আমার মতে, এসবই ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের শিক্ষা আমাদের জন্য।

আসিফ নজরুল


৫ জানুয়ারির নির্বাচন নিয়ে একতরফা মূল্যায়ন হলে তা দেশের গণতন্ত্র ও সুশাসনের জন্য আরও অমঙ্গলজনক হবে। কারণ, এই নির্বাচন সরকারের গণপ্রতিনিধিত্বমূলক চরিত্র সম্পর্কে প্রশ্নই শুধু জন্ম দেয়নি, দেশের নির্বাচনব্যবস্থা সম্পর্কেও মানুষের মনে প্রবল অবিশ্বাস ও অনাস্থার সৃষ্টি করেছে। এর সঠিক বিশ্লেষণ হলেই কেবল আমরা ভবিষ্যতের করণীয় সম্পর্কে ধারণা পেতে পারি।

২.
৫ জানুয়ারির নির্বাচন নিয়ে বাংলাদেশে দুটি প্রধান দৃষ্টিকোণ রয়েছে। একটি দৃষ্টিকোণ তুমুল সমালোচনামূলক। এই দৃষ্টিকোণ থেকে বলা হয় যে ৫ জানুয়ারির নির্বাচন বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে খারাপ ও অপ্রতিনিধিত্বশীল নির্বাচনের একটি। এই নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটার ভোট দেওয়ার সুযোগ পাননি, সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনে প্রার্থীকে কোনো ভোটই চাইতে হয়নি, সংখ্যাগরিষ্ঠ দল এতে অংশ নেয়নি, এমনকি যে কয়টি আসনে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে, সেখানেও সুষ্ঠুভাবে নির্বাচন হয়নি। বলা হয় যে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিল করার মাধ্যমে এবং পরে প্রধানমন্ত্রী পদে শেখ হাসিনাকে বাদ দিয়ে নির্বাচনকালীন সরকার গঠনের প্রস্তাব না মেনে নিয়ে আওয়ামী লীগ এই পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছিল। অনেকে এ-ও মনে করেন যে নির্বাচন-পূর্ববর্তী সময়ের জনমত জরিপ, স্থানীয় সরকার নির্বাচনগুলোর ফলাফল এবং বাংলাদেশের চিরন্তন রাজনৈতিক সংস্কৃতি (ক্ষমতাসীন দলের পরাজয়) অনুসারে ৫ জানুয়ারি একটি নিরপেক্ষ নির্বাচন হলে এতে ফলাফল সম্পূর্ণ অন্য রকম হতে পারত।
৫ জানুয়ারির নির্বাচনের অন্য পক্ষের লোকজনের প্রায় কেউই এই নির্বাচনের গুণগত মান নিয়ে তেমন কোনো উচ্চবাচ্য করেন না, বলেন না যে এটি একটি ভালো নির্বাচন ছিল। তবে তাঁদের মতে, এই নির্বাচন মন্দ দিকের পুরো দায়দায়িত্ব বিএনপির। তঁাদের দৃষ্টিকোণ থেকে বলা হয় যে এই নির্বাচনে সবার অংশগ্রহণ অবাধ করার জন্য ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ বিএনপির সঙ্গে আন্তরিকতাপূর্ণ আলোচনা করেছিল, তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী নির্বাচনকালীন সরকারে অংশ নেওয়ার জন্য বিএনপিকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন, এমনকি নির্বাচনের সময় অতি গুরুত্বপূর্ণ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বিএনপিকে দেওয়ার প্রস্তাবও করেছিলেন। বলা হয় যে বিএনপি সরকারের আন্তরিকতায় সাড়া না দিয়ে সহিংস আন্দোলনের মাধ্যমে এই নির্বাচন বয়কটের ঘোষণা দিয়েছিল বলেই নির্বাচন এমন একতরফাভাবে অনুষ্ঠিত হয়েছিল।

৩.
এই দুই বয়ানের কোনোটি কি পুরোপুরি অসত্য? আমাদের সমস্যা হচ্ছে আমরা মনে করি, একটি বয়ান সত্যি হলে অন্যটি পুরোপুরি মিথ্যা। কিন্তু আমাদের এখন সময় এসেছে উপলব্ধি করার যে উপরিউক্ত দুই বয়ানই সত্যি, অন্তত অনেকাংশে সত্যি। এই নির্বাচনে অংশ না নেওয়াও ভুল হয়েছিল, এই নির্বাচন একতরফাভাবে অনুষ্ঠিত করাও ভুল হয়েছিল।
এসব ভুল মোচনের সুযোগ তখন ছিল। সংবিধানের ১০৬ অনুচ্ছেদ মোতাবেক সুপ্রিম কোর্টের পরামর্শ নিয়ে নির্বাচনটি পিছিয়ে দিয়ে সবার অংশগ্রহণের শেষ একটি চেষ্টা করার সুযোগ ছিল। এমন প্রস্তাব তখন নাগরিক সমাজের একটি বড় অংশের পক্ষ থেকে নির্বাচনের কিছুদিন আগে করাও হয়েছিল।
এটি সম্ভব না হলে ৫ জানুয়ারি নির্বাচনের সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা পালন করে অল্প সময়ের মধ্যে আরেকটি নির্বাচনের ঘোষণা দেওয়া সম্ভব ছিল। প্রধানমন্ত্রী নিজে এমন সম্ভাবনার কথা বলেছিলেন। ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের পর আওয়ামী লীগ সে রকম কিছু করার কোনো উদ্যোগ নেয়নি, সে রকম উদ্যোগ নিতে আওয়ামী লীগকে প্রভাবিত করার নিয়মতান্ত্রিক রাজনীতিও বিএনপি করতে পারেনি। বরং ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের বর্ষপূর্তিতে জনসভা করার সুযোগ না পাওয়ার পর বিএনপি ও তার সঙ্গীরা অধৈর্য হয়ে যে সহিংস আন্দোলন শুরু করে তা মধ্যবর্তী নির্বাচনের দায় থেকে আওয়ামী লীগকে অনেকাংশে অবমুক্ত করে দেয়।
৫ জানুয়ারি এবং এর পরের ঘটনাপ্রবাহে তাই সবার ভুল ছিল। কারও বেশি কারও কম। ভুল পরিমাপের চেয়ে জরুরি বিষয় হচ্ছে এটি উপলব্ধি করা যে ৫ জানুয়ারিকেন্দ্রিক ভুলের মাশুল দিচ্ছে কোনো না কোনোভাবে সবাই। এর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের মানুষ ভোটাধিকারের অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়েছে, দেশে নির্বাচনব্যবস্থার প্রতি আস্থা মারাত্মকভাবে বিনষ্ট হয়েছে,
জনমতের গুরুত্বের প্রতি সরকারের অবজ্ঞা বৃদ্ধি পেয়েছে, শক্তিশালী বিরোধী দলের অভাবে ক্ষমতার ভারসাম্য নষ্ট হয়েছে, নাগরিক সমাজ বিভক্ত হয়েছে, গণমাধ্যমের ওপর সরকারের খবরদারি বেড়েছে, আওয়ামী লীগ ও বিএনপি উভয়ের প্রতি রুষ্ট মানুষের সংখ্যা বেড়েছে, বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে বহু অন্যায্য আবদার মেনে নিতে হয়েছে, সুস্থ রাজনীতির অভাবে জঙ্গিবাদ মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। সবচেয়ে যা ভয়াবহ এর মধ্য দিয়ে মানুষের গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষার পরিবেশ মারাত্মকভাবে বিনষ্ট হয়েছে।

৪.
৫ জানুয়ারি থেকে তাহলে কী শিখব আমরা? শুধু দোষারোপ করা? নাকি এগোনোর পথটাও খোঁজা? আমার মতে দ্বিতীয়টি। কারণ, ইতিহাসচর্চা মানে বর্তমান থেকে অতীতের পানে ক্রুদ্ধভাবে চেয়ে দেখা নয়। প্রখ্যাত আমেরিকান ইতিহাসবিদ উইলিয়াম অ্যাপলম্যানের মতে, ইতিহাসচর্চার বরং উদ্দেশ্য হওয়া উচিত অতীতে ফিরে গিয়ে আগের ধারণা ও দৃষ্টিকোণগুলোর সীমাবদ্ধতা উপলব্ধি করা এবং এভাবে বর্তমানের করণীয় সম্পর্কে আরও গভীর ও যৌক্তিক সিদ্ধান্তে আসা।
আমার মতে, এটি করতে হলে আমাদের অন্তত এটি বুঝতে হবে ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের মধ্যে আর যা-ই হোক কোনো গৌরব নেই। এই নির্বাচন কাউকে বিজয়ী করেনি। এমন নির্বাচন আর কখনো না হতে দেওয়ার মধ্যেই আমাদের কল্যাণ নিহিত।
আমাদের কল্যাণ নিহিত সুষ্ঠু নির্বাচনের মধ্যে। আমরা সর্বশেষ নারায়ণগঞ্জ নির্বাচনেই দেখেছি সুষ্ঠু নির্বাচন মানুষকে কতটা আশাবাদী করে তোলে। নারায়ণগঞ্জে আইভীর জয়ে আওয়ামী লীগ বিজয়ী হয়েছে, আবার ওয়ার্ড কমিশনার নির্বাচনে অংশ নিয়ে ১২টিতে জিতে বিএনপিও জয়ী হয়েছে।
নারায়ণগঞ্জ নির্বাচন আবারও প্রমাণ করেছে সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন সরকারের সদিচ্ছা। এই সদিচ্ছা আমরা আগেও স্থানীয় নির্বাচনে সরকারের মধ্যে দেখেছি (যেমন ২০১৩ সালের গাজীপুর নির্বাচন), নির্বাচন কমিশন তাই তখনো নিরপেক্ষভাবে কাজ করতে পেরেছিল। কিন্তু একই কমিশন আবার সরকারের চাপে পড়ে ২০১৪ সালের জাতীয় নির্বাচনে বহু প্রশ্নবিদ্ধ পদক্ষেপ নিয়ে সমালোচিত হয়েছিল (যেমন সময় পার হওয়ার পর আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থীদের মনোনয়ন প্রত্যাহারের আবেদন গ্রহণ করা, অন্যদিকে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে জাতীয় পার্টির প্রার্থীরা মনোনয়ন প্রত্যাহার করার পরও তাঁদের প্রার্থিতা বহাল রাখা ইত্যাদি)।
নির্বাচন কমিশনের এই ভূমিকা যতই নজিরবিহীন হোক, তা অস্বাভাবিক ছিল না। কারণ, বাস্তবতা এটিই যে বাংলাদেশের স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে কখনো কোনো জাতীয় নির্বাচনে নির্বাচন কমিশন দলীয় সরকারগুলো ইচ্ছার বাইরে গিয়ে কাজ করতে পারেনি।
হয়তো এই বাস্তবতা থেকেই আওয়ামী লীগ নেত্রী ২০১৩ সালে একটি নির্বাচনকালীন সরকারের প্রস্তাব দিয়েছিলেন। তাঁর এই দৃষ্টিভঙ্গি হয়তো তখনকার সমস্যা সমাধানের জন্য যথেষ্ট বা পর্যাপ্ত ছিল না, কিন্তু তা অবজ্ঞা করার মতোও ছিল না। আমি মনে করি, বর্তমান বাস্তবতায় এই প্রস্তাব ধরে এগোলেই আমরা ৫ জানুয়ারির মতো একটি ভুলে ভরা অতীত থেকে সামনের দিকে এগোতে পারি।
আমাদের অবশ্যই ভবিষ্যতে একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন কমিশন গঠন এবং নির্বাচনী আইনের প্রয়োজনীয় সংস্কার করতে হবে। কিন্তু এসবের পাশাপাশি আমাদের গ্রহণযোগ্য একটি নির্বাচনকালীন সরকারও গঠন করতে হবে। এসব কাজে সরকারকে বিরোধী দল কর্তৃক সর্বতোভাবে সহায়তা করতে হবে। আমার মতে, এসবই ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের শিক্ষা আমাদের জন্য।

আসিফ নজরুল: অধ্যাপক, আইন বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

প্রথম আলো’র সৌজন্যে

মঙ্গলবার, ২৭ ডিসেম্বর, ২০১৬

Mercantile Bank chairman, NRBC collude in huge loan, share scams, BB finds Shahidul Ahsan holds NRBC shares in ‘fake names’, gets Tk 301cr loan

Mercantile Bank chairman Shahidul Ahsan

AKM Zamir Uddin

Mercantile Bank chairman Shahidul Ahsan and NRB Commercial Bank colluded in huge irregularities like loan scam and illegal shareholding in ‘fake names’, according to a Bangladesh Bank investigation.
NRB Commercial Bank sanctioned Tk 301 crore to Ahsan violating the rules and regulations.
NRBC Bank violated the single borrower exposure limit to sanction the loans in favour of Ahsan’s business organisations as it approved 56 per cent credit limit amounting to Tk 301 crore against its capital of Tk 540 crore.
According to the bank company act, the outstanding amount of loan to a single person, counterparty or a group will not exceed 35 per cent of the capital of a bank at any point of time.
The central bank findings came from separate three inspections at Principal Branch and Uttara Branch in the capital Dhaka, and Chandraganj Branch in Noakhali of NRBC Bank. The central bank conducted the inspections in the last week of November.
Besides, NRBC Bank did not take adequate collateral securities from Ahsan against its sanctioned and disbursed loans, the BB investigation report said.
It said Ahsan also ‘illegally gripped’ NRBC Bank’s shares of its two sponsor directors — Kamrun Nahar Sakhi and ABM Abdul Mannan. The two directors hold shares of the bank worth Tk 43.71 crore.

Sakhi and Mannan have been staying abroad since 2009, but Ahsan opened ‘fake’ accounts with Gulshan Branch of Mercantile Bank in the names of the two persons.
Ahsan transferred huge amount of cash dividend against the shares of the two persons to his business group AG Agro Industries Ltd’s account in 2014 and 2015 violating the rules.
The BB report said that Ahsan was the real owner of the shares of Sakhi and Mannan and it was a punishable offence in line with the bank company act and the shares should be confiscated.
The NRBC Bank ‘illegally duplicated’ the signatures of Sakhi and Mannan and showed them as attendees of the board meetings so that they could play role in sanctioning loans in favour of Ahsan.
AKM Shafiqul Islam and Syed Golam Farouque were nominated as alternative directors of Sakhi and Mannan at the board of directors of the bank.
Shafiqul and Farouque are also directors and consultants of Ahsan Group owned by the Mercantile Bank chairman.


Mercantile Bank Chairman Shahidul Ahsan along Managing Director and CEO Kazi Masihur Rahman congratulating Deputy Governor of Bangladesh Bank SM Moniruzzaman with a bouquet of flowers for being promoted.
The board of NRBC Bank sanctioned Tk 119 crore on June 6, 2015 to Ahsan in presence of Shafiqul and Farouque.
Moreover, Ahsan attended the bank’s annual general meeting on April 18, 2016 as a proxy man of Sakhi.
According to the BB report, AG Agro Industries opened a current account with the Principal Branch of NRBC Bank on April 18, 2013.
The board of the bank sanctioned a credit limit of Tk 140 crore to the Ahsan’s business organisation on May 8, 2013 with mortgaging a land worth only Tk 3.91 crore.
The central bank asked the bank in December 2013 to decrease the credit limit considering the inadequate collateral securities.
The bank informed the BB that it decreased the limit to Tk 118 crore and Ahsan’s credit outstanding stood at Tk 20.88 crore on December 23, 2013.
But, the bank increased the Ahsan’s credit limit again to Tk 183 crore on May 3, 2016 violating the central bank’s directive when his overall credit limit stood at Tk 995.77 crore from other banks on the day.
The NRBC Bank’s document showed that it had taken collateral securities of Tk 60 crore, but the real mortgage amount was Tk 3.91 crore considering the value of the land.
Chandraganj Branch of NRBC Bank also sanctioned a credit limit of Tk 118 crore in favour of Begumganj Feed Mills Ltd owned by Ahsan resulting that the single borrower exposure limit crossed 56 per cent of the bank’s capital.
Violating the single borrower exposure limit was a punishable offence in line with the bank company act.
The disbursed loan to Ahsan apparently showed as regular but he repaid the instalments of the loans from other branches of the NRBC Bank.
Uttara Branch of NRBC Bank disbursed loans to one family of Aziz Chowdhury with his sons Salahuddin Chowdhury and Tareq Chowdhury, but a significant amount of the loans was transferred to the account of AG Agro Industries.
The same family took loans against its business organisation Stylish Garments and a remarkable amount of the loans was transferred to the account of AG Agro Industries.
The BB report suspected that Ahsan might keep his credit accounts as non-defaulted situation by creating loan accounts anonymously.
A BB official told New Age on Sunday that the central bank was now thinking to take actions against Ahsan as he controlled the NRBC Bank’s board behind the scene.
Ahsan declined to make any comment regarding the allegation although New Age made four attempts over the last one week.
When communicated with NRBC Bank’s management to take opinion about the fraudulent act, Ruhul Amin, head of public relation department of the bank, told New Age on Tuesday that the bank’s managing director Dewan Mujibur Rahman would not make any comment in this regard.
BB executive director and spokesperson Subhankar Saha told New Age that the central bank was still investigating the issue in details. So it would not be logical to make any comment under the circumstances, he added.

Courtesy: New Age Dec 25,2016

রবিবার, ২৫ ডিসেম্বর, ২০১৬

বাংলাদেশি টিভি চ্যানেল ভারতে ব্রাত্য কেন

 অমিত গোস্বামী


গত শতাব্দীর আশির দশকের শেষদিক। তখন টেলিভিশন দেখার জন্য পশ্চিমবঙ্গের প্রায় সব বাড়িতে ছাদের ওপরে অ্যালমুনিয়ামের দুটি অ্যান্টেনা শোভা পেত। একটি ভারতের সরকারি চ্যানেলের জন্য। অন্যটি বিটিভি অর্থাৎ বাংলাদেশ টেলিভিশনের জন্য। তখন দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন বাকের ভাই অর্থাৎ বর্তমান সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর। ভারতের দূরদর্শন তখন দুয়োরানি। বিটিভির বিজ্ঞাপনের জোরে বাজারে বিকোচ্ছে বাংলাদেশি সাবান, গুঁড়োদুধ, কনডেন্সড মিল্ক, পেস্ট। চোরাইপথে আসছে সব। তৎকালীন প্রেসিডেন্ট এরশাদ বিটিভির প্রচারে তখন রীতিমতো হিরো। বাংলাদেশের টিভি নাটকের জনপ্রিয়তায় ঢাকা পড়ে গেছে কলকাতায় তৈরি বাংলা সিনেমা। উপায় না দেখে কলকাতা দূরদর্শন শনিবারে চালিয়ে যাচ্ছে উত্তম, সুচিত্রা, সুপ্রিয়া, সৌমিত্র। তা সত্ত্বেও বোকাবাক্স শাসন করে যাচ্ছে পদ্মাপারের রাজ্জাক, ববিতা। এ এক অদ্ভুত বাংলাদেশি রাজত্ব বিরাজ করছে টেলিভিশনে। তীব্র আকর্ষণে সন্ধ্যা হলেই খুলছে টিভি নামক চৌখুপি বাক্স আর বাজছে ‘আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালবাসি।’

অমিত গোস্বামী
কিন্তু ১৯৯০ সালে ভারতের বাজারে এলো ক্যাবল চ্যানেল মাত্র চারটে প্রাইভেট চ্যানেল নিয়ে। তার একটি বিবিসি নিউজ। সেই সময় থেকে বিটিভির পিছু হটা শুরু। আরেকটা ফ্যাক্টর অবশ্যই কাজ করেছিল। স্বৈরতন্ত্রবিরোধী আন্দোলন বাংলাদেশে তীব্র হতেই পেশাদারিত্বের উৎকর্ষ ছেড়ে বিটিভি হয়ে গেল কর্তাভজা লাউড স্পিকার। মুখ ফেরাতে শুরু করল ভারতীয় বাঙালি দর্শক। মুছে গেল বাংলাদেশ আমাদের টেলিভিশন সেট থেকে। বিদেশি টেলিভিশন চ্যানেলের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় লড়তে শুরু করল ভারতীয় চ্যানেলগুলো। তখন বিদেশি চ্যানেলগুলোর সম্প্রচার হতো সিঙ্গাপুর বা হংকং থেকে। কিছু প্রযুক্তিগত সুবিধা পাওয়ার কারণে। ভারতীয় চ্যানেলগুলো প্রতিযোগিতার চাপে সেই প্রযুক্তির সুবিধা নেওয়ার জন্য নিজেদের অফিস করে নিল সিঙ্গাপুরে। অর্থাৎ দাঁতে দাঁত চেপে লড়ে গেল ভারতীয় চ্যানেলগুলো এবং জনপ্রিয়তার হিসেবে পেছনে ফেলে দিল বিদেশি চ্যানেলদের। কিন্তু তখন কোথায় বাংলাদেশের টেলিভিশন শিল্প? তারা এই আকাশলড়াই থেকে নিজেদের দূরে রেখে মন দিল ভারতীয় চ্যানেলের অনুকরণে। কিন্তু দুধ যদি পাওয়া যায় মানুষ ঘোল খাবে কেন? বাজার অর্থনীতির নিয়ম মেনে সুযোগ পেতেই বাংলাদেশের টিভি বাজারের দখল নিল ভারতের চ্যানেলগুলো। আজ বাস্তব এই যে, বাংলাদেশে ভারতের কমপক্ষে ৪২টি টিভি চ্যানেল দেখানো হয়। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গ তথা অবশিষ্ট ভারতে বাংলাদেশের প্রায় ৩০টি চ্যানেলের মধ্যে অনিয়মিতভাবে দু-একটি দেখা যায়। প্রশ্ন ওঠে, এই পরিস্থিতি কেন? সম্প্রতি একটি জরিপের রিপোর্টে বলা হয়েছে, ‘বাংলাদেশে টেলিভিশন দেখেন এমন নারীদের ৬৬ শতাংশের বেশি অধিকাংশ সময় ভারতীয় টিভি চ্যানেল দেখেন। চ্যানেলগুলোর শীর্ষে রয়েছে স্টার জলসা। বাংলাদেশের ৫৮ শতাংশ নারী দর্শক নিয়মিত এই চ্যানেলটি দেখেন।’ জরিপটি করেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পপুলেশন সায়েন্সেস বিভাগ।


সিনেমা, টেলিভিশন বা বিনোদন জগতে আদর্শ খুব বেশি একটা কাজ করে না। এখন পৃথিবীর বিভিন্ন চ্যানেল আপনার হাতের মুঠোয়। আপনি আপনার রিমোট কন্ট্রোল চাপতে থাকুন। বাংলাদেশে আমেরিকা, ইংল্যান্ড, ইন্ডিয়া প্রভৃতি দেশের ভালো ভালো চ্যানেল দেখতে পাবেন। তাই ইন্ডিয়ার ওই চ্যানেলটি দেখব না, এসব কথা বলে এখন আর পার পাওয়া যায় না। বাংলাদেশের অনেকের ধারণা, যেখানে আজ ভারত সারা বিশ্বের দর্শকদের তাদের চলচ্চিত্র, হিন্দি সিরিয়াল, নাটক, গান, নাচ দিয়ে মাতিয়ে তুলছে সেখানে ভারতের রাজনৈতিক নেতৃত্ব হয়তো বাংলাদেশের টিভি চ্যানেলগুলোকে তাদের দেশে প্রবেশাধিকার দিচ্ছে না। কিন্তু ধারণাটা সম্পূর্ণ ভুল। বাংলাদেশে ভারতের টিভি চ্যানেলের প্রচার নিষিদ্ধ করার দাবিতে আন্দোলন বা আবেদন করা হয়েছে অনেকবার। কিন্তু বাংলাদেশের টিভি চ্যানেলগুলোর সম্প্রচার না হওয়ার পেছনে আসল কারণটা কী?

ভারতে বিদেশি টিভি চ্যানেল দেখাতে হলে কিছু নিয়মনীতি পালন করতে হয়। সম্প্রতি ভারতীয় হাইকমিশনের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ‘বাংলাদেশের টিভি চ্যানেলের অনুষ্ঠান ভারতে দেখানোর ক্ষেত্রে ভারত সরকারের কোনো আইনি বাধা নেই। ২০১১ সালের ৫ ডিসেম্বর প্রকাশিত ভারত সরকারের তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অনুসরণ করে যে কেউ ভারতে বাংলাদেশের টেলিভিশন চ্যানেল ডাউনলিংক করতে পারবে।’

বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়, ‘ভারতীয় তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ও ভারতে কোনো বাংলাদেশি চ্যানেল ডাউনলিংকের ক্ষেত্রে বিধিনিষেধ আরোপ করেনি। কোনো কোম্পানি যদি বাংলাদেশি চ্যানেল ডাউনলিংক করতে চায়, তা হলে ভারতের তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় নীতিমালা অনুযায়ী সর্বতোভাবে সহায়তা করতে প্রস্তুত। তবে এখন পর্যন্ত বাংলাদেশের কোনো টেলিভিশন চ্যানেল ভারতে ডাউনলিংকের জন্য অনুমতি চেয়ে আবেদন করেনি।’

তবে আবেদনকারী কোম্পানিকে প্রথম টেলিভিশন চ্যানেল ডাউনলিংকের জন্য ৫ কোটি ভারতীয় টাকা এবং পরবর্তী পর্যায়ে প্রতিটি অতিরিক্ত চ্যানেল ডাউনলিংকের জন্য ২ কোটি ৫০ লাখ ভারতীয় টাকা নেট মূল্য পরিশোধ করতে হবে। এই মূল্য ছাড়াও ডাউনলিংকের অনুমতি মঞ্জুরের সময় ১০ লাখ ভারতীয় টাকা ফি দিতে হবে। এ ছাড়া বিদেশ থেকে আপলিংক করা প্রতিটি চ্যানেল ডাউনলিংকের জন্য বার্ষিক ফি হিসেবে ১৫ লাখ ভারতীয় টাকা দিতে হবে। ডাউনলিংকের নিবন্ধন ও অনুমতি ১০ বছর বহাল থাকবে। এটা করতে পারলে মাল্টি সিস্টেম অপারেটররাও (এমএসও) সেই চ্যানেল বিপণনের ব্যবস্থা করতে পারবে। কিন্তু বিদেশি টিভি চ্যানেল প্রদর্শনের ক্ষেত্রে ডাউনলিংক ফি বেশি হওয়ায় ভারতীয় ক্যাবল অপারেটররা আগ্রহ প্রকাশ করছেন না।

ভারতের পশ্চিমবঙ্গে বাংলাদেশের বেসরকারি চ্যানেল চালাতে আগ্রহী এখানকার চ্যানেল বিপণনকারী সংস্থাগুলো। কলকাতাসহ রাজ্যের বাঙালি দর্শকদের মধ্যে বাংলাদেশি চ্যানেল প্রদর্শনের জন্য নিয়মিত দর্শকদের কাছ থেকে চাপ সহ্য করতে হচ্ছে বিপণনকারীদের। কিন্তু এখনো পর্যন্ত বাংলাদেশের কোনো চ্যানেল আইনগতভাবে ভারতে ডাউনলিংকের অনুমোদন নিয়ে না আসায় দর্শকদের কাছে বাংলাদেশের চ্যানেল পৌঁছে দিতে পারছে না বিপণনকারী সংস্থাগুলো। সম্প্রতি বাংলাদেশের একটি চ্যানেলের মালিক আমাকে একান্ত আড্ডায় বলেছেন, ‘বাংলাদেশের মাত্র ২০০ কোটি টাকার বিজ্ঞাপনের বাজারে দেশীয় চ্যানেলগুলো চালাতে হিমশিম খেতে হয়। তার ওপর যদি ভারতে সম্প্রচারের জন্য বড় অঙ্কের টাকা দিতে হয় তাহলে বিপদে পড়তে হবে।’

এতক্ষণে আসল সমস্যা বোঝা গেল। প্রথম ডাউনলিংকের জন্য ৫ কোটি ভারতীয় টাকা, সঙ্গে ডাউনলিংকের অনুমতি মঞ্জুরের সময় ১০ লাখ ভারতীয় টাকা এবং ডাউনলিংকের জন্য বার্ষিক ফি হিসেবে ১৫ লাখ ভারতীয় টাকা প্রতি চ্যানেলকে দিতে হবে। এখানে একটা কথা অবশ্যই মাথায় রাখা দরকার। ইংরেজি বা হিন্দি চ্যানেলের প্রসার সর্বভারতীয়। কিন্তু বাংলা চ্যানেলের প্রচার শুধু বাংলাভাষীদের মধ্যে। কাজেই সারা ভারতে প্রচারিত বিদেশি চ্যানেলগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের চ্যানেলগুলোর একই রকম অর্থ জমা দেওয়ার ফরমানে তাদের ইচ্ছা বা উৎসাহ আজ অবধি তৈরি হয়নি।

তাহলে বাংলাদেশে যে ভারতীয় চ্যানেলগুলো প্রচারিত হচ্ছে সে জন্য তাদের বাংলাদেশ সরকারকে কী দিতে হচ্ছে? ক্যাবল নেটওয়ার্ক অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ বা কোয়াবসূত্রে জানা যায়, বর্তমানে বাংলাদেশে ভারতের প্রায় অর্ধশত চ্যানেল প্রচারিত হচ্ছে। কিন্তু এর বিনিময়ে তারা খুবই কম অর্থ দিচ্ছে। ভারতীয় চ্যানেল মাত্র তিন লাখ টাকার টোকেন মানি দিয়ে বাংলাদেশে চালু করা যায়। আরও একটা কথা, বেশিরভাগ ভারতীয় চ্যানেল ‘ফ্রি টু এয়ার’ (বিনামূল্যের) হওয়ায় সব চ্যানেল সম্প্রচার করা অত্যন্ত সুবিধাজনক।

বুঝলাম। কিন্তু এ তো অন্যায়। কোথায় ৫ কোটিরও বেশি আর কোথায় ৩ লাখ! ক্যাবল অপারেটররা ব্যবসায়ী। তারা তাদের সুবিধা দেখবেন। কিন্তু এই সমস্যার সমাধান একমাত্র করতে পারেন দুই দেশের সরকার। কিন্তু তার আগে জানিয়ে রাখি, বাংলাদেশে স্বাধীনতা প্রায় ৪৪ বছর পর প্রথম বাস্তবসম্মত সম্প্রচার নীতিমালা এতদিনে তৈরি হয়েছে। কিন্তু এখনো সম্প্রচার আইন তৈরি হয়নি। কথা ছিল ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বাংলাদেশের গত সফরের সময় এই সমস্যা নিয়ে আলোচনা হবে। কিন্তু হয়নি। এটা অবশ্যই বাংলাদেশের কূটনৈতিক ব্যর্থতা। কারণ তিস্তার স্রোত বাংলাদেশের জন্য যতটা জরুরি, বাংলাদেশের চ্যানেল তেমনই ভারতে আসা জরুরি। না হলে যেটা হবে সেটা হলো সাংস্কৃতিক আগ্রাসন। দিবে আর নিবে মিলাবে মিলিবে যাবে না ফিরেÑ সেটা আর হবে না।

বাংলাদেশের বর্তমান সরকার অনেক কাজ করছে, যা বাস্তবোচিত ও ভবিষ্যতের জন্য ভালো ফল আনতে বাধ্য। কাজেই তাদের কাছে এই প্রত্যাশা করা যেতেই পারে, এই সমস্যা সমাধানে তারা উদ্যোগী হবে। কিন্তু বাংলাদেশের চ্যানেলগুলোর পশ্চিমবঙ্গে গ্রহণযোগ্যতা কতটুকু? ভারতের অন্যতম বৃহত্তম চ্যানেল বিপণনকারী সংস্থা মন্থনের পরিচালক শিবশঙ্কর চক্রবর্তীর মতে, বাংলাদেশে যেহেতু অধিকাংশ পশ্চিমবঙ্গবাসীর পূর্বপুরুষের ভিটা এবং একই সংস্কৃতি, ভাষা এবং খাদ্যাভ্যাসের ফলে এখানে বাংলাদেশের চ্যানেলগুলো সম্প্রচারে আসলে দর্শকদের যেমন বাংলাদেশি চ্যানেল দেখার সুযোগ হবে, তেমনই চ্যানেলগুলোও ব্যবসা করতে পারবে। জিটিপিএল নামে আর একটি বৃহত্তম চ্যানেল বিপণনকারী সংস্থার পরিচালক সুষেন বলেন, ‘প্রতিদিন কয়েকশ ফোন আসে। সবারই দাবি, অন্য বিদেশি চ্যানেল দেখা গেলে কেন বাংলাদেশের খবর-নাটক-ছবি কোনো চ্যানেলে দেখানো হচ্ছে না। এর জবাব আসলে আমরা দিতে পারি না।’ ভারতের জি-গ্রুপের বিপণনকারী সংস্থার সিটি ক্যাবলের পরিচালক সুরেশ শেঠিয়া মনে করেন, যেহেতু বাংলাদেশের কোনো চ্যানেল এখানে দেখানো হয় না তাই যারাই আগে এ উদ্যোগ নিয়ে আসবে তারা অবশ্যই ব্যবসা করতে পারবে।

বাংলাদেশের চ্যানেলগুলো ভারতে এলে আরেকটি লাভ হবে। ব্যাপারটা একটু খুলে বলি। বাংলাদেশের কোম্পানি প্রাণ গ্রুপ কলকাতার নাগেরবাজারের কাছে একটি অফিস নিয়ে ভারতের ব্যবসা জগতে তাদের উপস্থিতির ক্ষীণ স্বাক্ষর রেখেছেন। তারা জি বাংলাসহ আরও দু‘একটি টিভির খুব জনপ্রিয় কয়েকটি অনুষ্ঠানের মূল স্পন্সর। কোটি কোটি টাকা ঢেলেছেন, অবশ্যই ভারতীয় কোম্পানি হিসেবে। উদ্দেশ্য, বাংলাদেশে যাতে তাদের প্রডাক্টের ব্যাপক প্রচার হয়। হয়েছেও। তার সঙ্গে উপরি লাভ হয়েছে এই যে, প্রাণ গ্রুপের প্রডাক্টের জনপ্রিয়তা পশ্চিমবঙ্গে এতটাই বেড়ে গেছে যে, তাদের সেই দাবি মেটানোর ক্ষমতা নেই। একইভাবে বাংলাদেশের চ্যানেলগুলোর আগমনে বেশ কিছু ভারতীয় কোম্পানি বাংলাদেশে তাদের ব্যবসা শুরু করবে। এই যে পারস্পরিক ব্যবসায়িক পরিযান, এতে বাংলাদেশের অর্থনীতিকে বলবান করে তুলবে।

ভারতের প্রখ্যাত সাহিত্যিক সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় জীবদ্দশায় বলেছিলেন, ‘এটা অনুচিত। মানা যায় না। আমরা তো পৃথিবীর অন্যান্য দেশের টিভি চ্যানেলগুলো দেখতে পাই, তবে বাধা কেন বাংলাদেশের টিভি চ্যানেলের ওপর?’

কবি শঙ্খ ঘোষ বললেন, ‘বাংলাদেশ আমাদের বন্ধু। পাকিস্তানি চ্যানেল দেখা যায়, অথচ বাংলাদেশের চ্যানেল দেখতে পারি না। এটা কী করে হয়!’

অর্থাৎ এ দেশের সুশীল সমাজ বাংলাদেশের টিভি চ্যানেলগুলোকে স্বাগত জানাতে প্রস্তুত। তবে আরেকটি কথা বাংলাদেশের টিভি চ্যানেলের ৩৫ থেকে ৪০ শতাংশ খেয়ে নেয় বিজ্ঞাপন। সেই পরিপ্রেক্ষিতে ব্রিটেন ও ভারতে এই বিজ্ঞাপনের ভাগ ১১ শতাংশ। কাজেই বাংলাদেশের চ্যানেলগুলোকেও আন্তর্জাতিক বাজারে টিকে থাকতে গেলে সাবালক হতেই হবে। কিন্তু শেষ অবধি বাংলাদেশের তথ্য ও সম্প্রচার কতটুকু গুরুত্ব দিয়ে অবিলম্বে এই সমস্যার সমাধান করা হয় সেটাই দেখার বিষয়। না হলে বাংলা সংস্কৃতি যে অবাঙালি সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের শিকার হবে তা বলাই বাহুল্য।

অমিত গোস্বামী: ভারতীয় কবি ও সম্পাদক

শুক্রবার, ১৬ ডিসেম্বর, ২০১৬

তৃণমূলের সঙ্গে সখ্য চায় শেখ হাসিনার সরকার

কলকাতার নেতাজি ইন্ডোর স্টেডিয়ামে বাংলাদেশের বিজয় দিবসের প্রদর্শনীতে মমতা । ডানে শিল্পমন্ত্রী আমির হোসেন আমু

এই সময়, কলকাতা 

ভারত-বাংলাদেশ মৈত্রীর বন্ধন সুদৃঢ় করতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দলের সঙ্গেও সম্পর্ক মজবুত করতে চায় শেখ হাসিনার সরকার৷ তিস্তা জলবণ্টন এবং পশ্চিমবঙ্গের মাটিকে ব্যবহার করে সন্ত্রাসবাদীরা যাতে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে জঙ্গি কার্যকলাপ চালাতে না-পারে, তার জন্য মমতার সঙ্গেও আলাদা ভাবে কথা বলবে আওয়ামি লিগ সরকার৷

বৃহস্পতিবার পূর্বাঞ্চলীয় সেনা সদর দন্তর ফোর্ট উইলিয়ামে বিজয় দিবসের অনুষ্ঠানে যোগ দিতে এসে এ কথা জানান বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জমান খান৷ তবে বিকেলে নেতাজি ইন্ডোর স্টেডিয়ামে বাংলাদেশের বিজয় উৎসবে যোগ দিয়ে মুখ্যমন্ত্রী তিস্তা জলচুক্তির উল্লেখ করেননি৷ ছিটমহল আদানপ্রদান নিয়ে দু’দেশের মধ্যে ভূমিচুক্তির কথা স্মরণ করিয়ে বলেন, ‘এটা বাংলাদেশ সরকারের সাফল্য৷ আবার আমার বাংলার সরকারেরও সাফল্য৷ যার ফলে স্বাধীনতার ৬৬ বছর পরে এখানকার ছিটমহলের বাসিন্দাদের স্বাধীনতা উপহার দিতে পেরেছি৷’

জঙ্গি কার্যকলাপের প্রসঙ্গ উল্লেখ না -করে মমতা শুধু বলেন, ‘এমন কিছু আমরা করতে দেব না বা করব না, যাতে কেউ হস্তক্ষেপ করে আমাদের চিন্তিত করতে পারে বা দুঃশ্চিন্তায় ফেলতে পারে৷ দু’দেশের মধ্যে সুসর্ম্পক ছিল, থাকবে৷ ভৌগোলিক সীমানা যা-ই থাকুক, আমাদের মানবিকতা, ভালোবাসার কোনও সীমানা নেই৷’

বাংলাদেশ হাইকমিশনের এই অনুষ্ঠানে সে দেশের শিল্পমন্ত্রী আমির হোসেন আমু, কলকাতার ডেপুটি হাইকমিশনার জকি আহাদ উপস্থিত ছিলেন৷

কলকাতা সফরের ফাঁকে আসাদুজ্জমান মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করতে পারেন, এমন খবর চাউর হয়েছিল৷ কিন্তু দমদম বিমানবন্দরের উদ্দেশ্যে রওনা দেওয়ার আগে আসাদুজ্জমান জানান, বিজয় দিবসের অনুষ্ঠানে যোগ দিতেই তিনি কলকাতায় এসেছেন৷ মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করার কোনও কর্মসূচি নেই৷

বিজয় দিবস উপলক্ষ্যে পূর্বাঞ্চলীয় সদর দপ্তরে এক বিশেষ অনুষ্ঠানে আসাদুজ্জমান বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধে ভারত যে ভাবে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছিল, তার কথা আমরা ভুলব না৷ আজ বাংলাদেশ একটি অসাম্প্রদায়িক এবং আধুনিক রাষ্ট্র৷ খাদ্যঘাটতি মিটিয়ে আমরা স্বয়ংসম্পূর্ণ হওয়ার দিকে এগোচ্ছি৷ কৃষি, স্বাস্থ্য ও তথ্যপ্রযুক্তি ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অভূতপূর্ব উন্নতি ঘটেছে৷ সেই কাজে ভারত সাহায্য করে চলেছে৷’

বাংলাদেশের আরও এক মুক্তিযোদ্ধা তথা আওয়ামি লিগের সংসদ সদস্য আব্দুল মতিন খসরু বলেন, ‘যখন বিদেশে যাই লোকে জিজ্ঞেস করে, আপনি কোথা থেকে এসেছেন? যখন তাঁদের বলি, আমি বাংলাদেশ থেকে এসেছি, তখন তাঁদের অনেকেই আমাকে ইন্ডিয়ার লোক বলে সম্বোধন করেন৷ বলে, আপনি গান্ধীর দেশের লোক৷’

পাকিস্তানকে কাঠগড়ায় তুলে তিনি বলেন, ‘পঞ্চাশ বছর ভারতের সঙ্গে শত্রুতা কী লাভ হল পাকিস্তানের?’

বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর মেজর জেনারেল মহম্মদ নাজিমুদ্দিন বলেন, ‘পৃথিবীতে খুব কম দেশ আছে, যারা অন্যের জন্য আত্মবলিদান দিয়েছে৷ ভারত সেরকম একটি দেশ৷ ভারতের বর্তমান শাসকরাও বাংলাদেশকে নানা ভাবে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছে৷’