বুধবার, ১ মার্চ, ২০১৭

হিন্দুত্ববাদ এবং স্বপ্নলব্ধ ভারতের ইতিহাস

আকবরের বিরুদ্ধে রানা প্রতাপই জয়ী এবং পদ্মিনী এক ঐতিহাসিক চরিত্র: আরএসএসশিক্ষার গোড়াতেইতথ্য’ প্রকৃতবিশ্লেষণের মাধ্যমে ইতিহাসকে না বুঝলে, ধরনের অযুক্তির বিরুদ্ধে লড়াই অসম্ভব৷


অনির্বাণ ভট্টাচার্য

প্রথমেই একটা কথা স্পষ্ট করে নেওয়াটাই ভালো হবে, যে গিয়েছে সে দিন, যখন আগ্রাসী ঘন কালো মেঘের আড়ালে, নিশ্চিত ভাবেই রুপোলি আলোর টুকরো ঝলক অপেক্ষা করছে, এমন বিশ্বাসে ঘর বাঁধত আক্রান্ত বা বিপন্ন মানুষ৷ সে যুগ এখন তামাদি৷ যেমন আক্রান্ত বা বিপন্ন মানুষের তল পাওয়ার আশাও৷ যুগ তো এখনপোস্ট -ট্রুথ’-এর বাঅল্টারনেটিভ ফ্যাক্ট’-এর৷ সত্য -মিথ্যার সরাসরি স্পষ্ট বিভাজনকেও, যা ইহকালে অবান্তর করে তুলছে৷ কোনও রকম যুক্তি সাজানোর ক্ষেত্রে প্রামাণ্যফ্যাক্টবা তথ্যকেও নেহাতই অপশনাল করে তুলেছে৷ বা এই যে বললাম, প্রামাণ্য, তা নিয়েও গুচ্ছ প্রশ্ন তুলে দিচ্ছে৷ বদলে খাড়া করা হচ্ছে, ওই বিকল্প তথ্যের সারি, ‘অল্টারনেটিভ ফ্যাক্ট

রানা প্রতাপ বা শিবাজি, এমনকী লক্ষ্মীবাঈ- কস্মিনকালেঅখণ্ড’ ‘ভারতনামকনেশন ‘-এর জন্যে লড়েননি৷ লড়বেনই বা কী উপায়ে, ‘নেশন’-এর ধারণাটিই তো তখন দানা বাঁধেনি৷ যে কারণে ১৮৫৭- মহাবিদ্রোহও, ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রথম অধ্যায় নয়৷

অবশ্যই, যে কোনও বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে এমনই তথ্যকে নেড়েচেড়ে ছেনে -পরীক্ষা করাটাই দস্ত্তর, কিন্ত্ত যুগের হোতারা, ব্যাপারটিতে বেশ ভিন রকম এক রং লাগিয়েছেন৷ অর্থাত্ প্রথম প্রশ্নই হচ্ছে এখন, সে ঘন কালো মেঘ কি আদৌ ঘন কালো মেঘ? নাকি তা আদতে ভিনমাত্রার কিছু একটা, যা হয়তো দীর্ঘ দিনেরপ্রামাণ্য সত্য ‘- বিকৃতির ফলে বর্তমানে এহেন ঘন কালোর রূপ পেয়েছে ? ফলে সে কালো মেঘ এখন শুধু মাত্র ঘন কালো মেঘ নয়, সাধারণের সমীপে তার চরিত্র -প্রকৃতি নির্ভর করছে, দর্শনের উপর, দৃষ্টিভঙ্গির উপর৷ অর্থাত্, কে কী ভাবে সে ঘন কালো মেঘকে দেখছে, বা বলা অধিক সঙ্গত হবে, কাকে কী ভাবে সে ঘন কালো মেঘ দেখতেশেখানো ‘ (মতান্তরে বাধ্য করা) হচ্ছে, তার উপরই নির্ভর করছেসত্য যেসত্যসন্ধানের এক মাত্র হাতিয়ার ক্ষেত্রে ইতিহাস৷ বা সে ইতিহাসনির্মাণ

ইদানীং বহু চর্চা হচ্ছে, আরএসএস বর্তমান সরকারের মদতপুষ্ট নয়া এই ইতিহাস -দর্শন নিয়েই৷ যে দর্শনে অনায়াসেই হলদিঘাটির যুদ্ধে মহারাণা প্রতাপকে আকবরের বিরুদ্ধে জয়ী ঘোষণা করে দেওয়া হয় বা মহেঞ্জোদারো নর্তকীমূর্তিকে দাপট -সহকারে দেবী পার্বতী রূপে প্রতিষ্ঠা করার প্রয়াস দেখা যায় বা সঞ্জয় লীলা বনশালীপদ্মাবতীছবির শ্যুটিং আটকে দেওয়া হয়, এই অভিযোগে, যেসত্য’- বিকৃতি হচ্ছে৷ এমন প্রবণতা ঘটনাবলীর উদাহরণ অগুনতি৷ লিস্টি দিয়ে লাভই বা কী৷ রানা প্রতাপ যে নিশ্চিত ভাবেই হলদিঘাটিতে পরাজিত হয়েছিলেন, সে সম্পর্কেপ্রামাণ্যতথ্য পাওয়া যায় যেমন আবুল ফজলেরআকবরনামা’-, তেমনই ফজলের বিরোধী বদায়ুনিমুন্তাখাব-উত্-তওয়ারিখ’-এও কিন্তু একইসত্যপাওয়া যায়৷ এমনকী, এই যে মেওয়ারের রানা প্রবল প্রতাপ, তাও কিন্ত্ত এমনই তথ্যের উপর প্রবল ভাবে নির্ভরশীল৷ অ্যাদ্দিন ধরে যে ধারায় বিশ্বাস রাখা হয়েছে, সেগুলিই হঠাত্ ইদানীং আক্রমণের মুখে এবং সে সবসত্য’-কে উল্টেনির্মিতআখ্যা দেওয়া শুরু৷ সমান তালেইপদ্মাবতী ক্ষেত্রে যদি ধরা যায়, একটি গল্পকে, সত্য ইতিহাসের তকমা দেওয়াও তো হচ্ছে অম্লানবদনে৷ মালিক মহম্মদ জায়াসিপদ্মাবতকাব্যেই তো কাল্পনিক উপস্থিতি রাজা রতন সিং -এর এই রানি পদ্মিনীর, যাঁর প্রায় ভিনগ্রহী সৌন্দর্যের টানেই নাকি আলাউদ্দিন খিলজি চিতোর আক্রমণ, আগ্রাসীর হাতে নিজ সম্ভ্রম হারানোর পূর্বেই, যাঁর আত্মাহুতি৷ দুর্ধর্ষ টানটান গল্প, খোদ মালিক জায়াসি- রচনার শেষ লগ্নে লিখেছেন, গোটা ব্যাপারটিই আসলে এক উপমা, যেখানে চিতোর যেন এক শরীর, রাজা হলেন মন, পদ্মিনী প্রজ্ঞার প্রতীক খিলজি, লোভ কামের চিহ্ন৷ কিন্ত্ত বাস্তবে হল কী, না, এক রাজপুত স্ত্রী সম্ভ্রম রক্ষার বীরগাথা হয়ে উঠে এল এই গল্প৷

বার দেখুন, সম্ভ্রম -রক্ষা কার থেকে, না এমন এক জন, যে আগ্রাসী তো বটেই, তার চেয়েও বড়ো কথা, সেবহিরাগত’, অর্থাৎঅপর মনে রাখতে হবে, সবের বহু পূর্বেই কিন্ত্ত জমি তৈরির কাজ শুরু হয়েছে৷ গোলওয়ালকর সেই৪৬ সালেই কুরুক্ষেত্রেগীতা জুনিয়র সেকেন্ডারি স্কুলস্থাপন করে মূল স্রোতেরবিকল্পএক ইতিহাস -দর্শনের সূচনা বেশ রমরমিয়ে চালু করে দিয়েছিলেন৷ মহাত্মা গান্ধীর হত্যার পর আরএসএস -এর উপর নিষেধাজ্ঞা কাটিয়ে, ফের সেপ্রকল্পজোর কদমে আরম্ভ হল, ‘৫২ সালে গোরখপুরেসরস্বতী শিশু মন্দিরপ্রতিষ্ঠা দিয়ে৷ সেই থেকে আরএসএস -এর আপনবিদ্যা ভারতীঅবয়বে সাংঘাতিক রূপে বেড়েছে৷ তা, সেখানে প্রবল ভাবে এইঅপরখাড়া করার আগে নিজ সুরক্ষিত এক পাঁচিল -ঘেরা ঘেটো তৈরি করার প্রক্রিয়া চলেছে৷ প্রমাণ করে ছাড়া হয়েছে যে, সর্বধর্ম সমন্বয় মূলত অলীক এক কল্পনা, এক দল ইতিহাসকারের, এবং এমনকীসত্য ‘- অবমাননা -ও৷ অর্থাৎ, আর্য তত্ত্বকে সুকৌশলেব্যবহার নাত্সি কায়দায়প্রত্নতাত্ত্বিকতথ্যকেও পছন্দসই ছাঁচে ঢেলে, সে জমি কিন্ত্ত স্বাধীনোত্তর পর্বে, বেশ যত্ন-সহকারে তৈরি করা চলছিল, সৌজন্য সাভারকর, গোলওয়ালকর তাঁর অনুগামীরা৷ নানা উপায়ে, প্রতিষ্ঠা করার প্রয়াস হচ্ছিল, হচ্ছেও, যে নিঃসন্দেহে ভারত এক হিন্দু-রাষ্ট্র৷ যে ঠাস বুনোট ক্রমাগত ভেদ করে, তাতে -সুরের মূর্চ্ছনা ছড়ানোই সেঅপরঅর্থাত্ ক্ষেত্রে মুসলমানদের এক মাত্র লক্ষ্য৷ অতএব প্রয়োজন নিজ মান রক্ষা করে, তাদের যথাযথ প্রতিহত করা৷ এবং সে যুদ্ধেই কখনও বীরত্বের নিশান মহারানা প্রতাপ, কখনও শিবাজী, কখনও এমনকী হিন্দু নারী, পদ্মিনী-ও৷ আরএসএস -দর্শনে আবার এই বীরত্ব -প্রদর্শনের (মূলত যাঁরা যুদ্ধ লড়েছিলেন, যেমন ক্ষেত্রে রানা প্রতাপ বা শিবাজি ) লক্ষ্য ছিল কিন্ত্ত এক৷ মাতৃভূমির (সাভারকরের মতে পিতৃভূমি ) স্বাধীনতালাভ, বা স্বাধীনতারক্ষা৷ কাদের থেকে, না, বিদেশি শক্তি, পূর্বে যাদের ম্লেচ্ছ বা যবন অভিহিত করা হয়েছে, বং পরবর্তীতে যারা হিন্দু রাষ্ট্রেরঅখণ্ডএক সোনালি যুগের অবসান ঘটিয়ে ইসলামধর্মের প্রতিষ্ঠা করেছিলপবিত্রভারতে৷ সে প্রতিষ্ঠা যেমন আগ্রাসনের, তা, শক্তিপ্রয়োগে ধর্মান্তরেরও, অভিযোগ এমনই দক্ষিণপন্থীদের৷ অর্থাত্ অবস্থা যা দাঁড়াল, ইতিহাস বইয়ে যাঁদেরই কথা আমরা পড়ি, বিশেষ করে কংগ্রেস স্থাপন হওয়া গান্ধী -যুগ শুরু পূর্বে, যাঁদের আমরা পাই, প্রত্যেকেই স্বাধীনতা সংগ্রামী (আরএসএস -এরঅল্টারনেটিভ ফ্যাক্টতো আবার বলে কংগ্রেস -পর্বও নাকি নেহাতই অপ্রাসঙ্গিক !) রানা প্রতাপ, শিবাজি, ঝাঁসির রানি লক্ষ্মীবাঈ প্রত্যেকেই৷ অতি সূক্ষ্ম ভাবে এখানেই গুলিয়ে দেওয়া হচ্ছে, ইতিহাসচেতনা৷ অর্থাত্ এই যে রানা প্রতাপ লড়ছেন বা ধরা যাক শিবাজি, এমনকী সেপাই বিদ্রোহ -কালে লক্ষ্মীবাঈও, তাঁরা আদতে লড়েছিলেন কীসের জন্য ? আরএসএস -ধর্মী ইতিহাস বলবে দেশ অর্থাত্ ভারতের স্বাধীনতার জন্য৷ অবশ্য শুধু আরএসএস -কে এখানে দোষ দিয়েই বা লাভ কী, স্কুলের প্রায় সমস্ত পাঠ্যপুস্তকেও তো এই ভ্রান্ত ইতিহাসচেতনা৷পেট্রিয়টিজমবা দেশপ্রেম আরন্যাশনালিজমবা জাতীয়তাবাদের মধ্যের তফাতটিই তো খুব যত্নে বা অযত্নে গুলিয়ে দেওয়া হচ্ছে৷ অধিকাংশের কাছে তো এই দুই আসলে অভিন্ন৷ কিন্ত্ত বাস্তব তো এই যে, রানা প্রতাপ বা শিবাজি বা এমনকী লক্ষ্মীবাঈ - কস্মিনকালেঅখণ্ডএকভারতনামকনেশন ‘-এর জন্যে লড়েননি৷ বেচারি লড়বেনই বা কী উপায়ে, ‘নেশন ‘-এর ধারণাটিই তো তখন দানা বাঁধেনি৷ যে কারণে ১৮৫৭ - মহাবিদ্রোহ-, ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রথম অধ্যায় নয়৷ তা মালিকপক্ষ হয়ে ওঠা এক জাতির বিরুদ্ধে গর্জে ওঠা৷ নিশ্চয়ই, সে ক্ষেত্রে এক কেন্দ্রের আগুন ছড়িয়ে পড়েছিল অন্যত্রও, অর্থাত্ তা ছিল স্পষ্টতই এক রকম অভ্যুত্থান, কার বিরুদ্ধে, আমরা জানি, কিন্ত্ত কার জন্যে, তা আমরা জানি না৷ বা আমাদের দীর্ঘ দিনের ইতিহাস -পাঠে শেখানো হয়েছে, তা ছিল নিজ মাটির জন্যে৷ ঠিকই, কিন্ত্ত নিজ মাটি আরভারতনামক নেশন -স্টেট যে এক না - হতে পারে, সে বেলা ?ইতিহাস পড়ানোর ক্ষেত্রে এখানে এক ভয়ানক কাণ্ড ঘটেছে৷ বিদ্রোহীদের ইতিহাসচেতনারপ্রকৃতপর্যালোচনা স্পষ্ট করবে, তা ছিল মূলত তাঁদের কৌম, জাতি ধর্ম-রক্ষার্থে৷ প্রচলিত ধ্যানধারণা, রীতির বিরুদ্ধতা তাঁরা সইতে পারেননি, অতএব রুখে দাঁড়ানো৷ ইংরেজের সমূলে উত্খাত ক্ষেত্রে ভাবনা হলেও, আধুনিক যুগে দেশের স্বাধীনতা বলতে আমরা যা বুঝি, সে লক্ষ্য সেপাইদের ছিল না৷ সময়ে ফিরে গিয়ে একই কথা প্রযোজ্য, রানা প্রতাপ বা শিবাজির ক্ষেত্রেও৷ অর্থাত্ ইংরেজ বা মুঘলদের ঐক্যবদ্ধ এক শত্রু -গোষ্ঠী রূপে বিচার করে তাদের বিরুদ্ধে লড়া মানেই কখনওইভারত’-এর হয়ে লড়া নয়, এবং প্রতাপ বা শিবাজি -, লড়েছিলেন, নিজ অঞ্চলের মুক্তি বা তার সুরক্ষার হেতু৷ভারত ‘-এর জন্যে কখনওই নয়৷ বার সমস্যা হল, স্কুলের পাঠ্যক্রমে, তা সে যে বোর্ডই হোক না, কখনওই বিষয়ে আলোচনা বা বিশ্লেষণধর্মী হয়ে ওঠেনি৷ ইতিহাস যেমনফ্যাক্ট’-এর উপর নির্ভরশীল, তেমন সেফ্যাক্ট ‘-কে বিশ্লেষণ করার উপরও তো নির্ভরশীল, এই মৌলিক ভাবনাটিই তো এখানে অনুপস্থিত৷ ইতিহাসেও তো আজকাল সহজ নম্বর তোলার জন্যেঅবজেক্টিভপ্রশ্নের ছড়াছড়ি ! এখানেই তো আরএসএস -পন্থীদের পোয়াবারো৷ফ্যাক্টবা তথ্যের ভাণ্ডার রূপে জাতীয় আর্কাইভ -এর উপর যে জোর দিতে চেয়েছিলেন যদুনাথ সরকার, তা সে যুগেও যেমন অবহেলিত ছিল, বর্তমান কালেও অবস্থা তথৈবচ৷ এখন চল হয়েছে সেফ্যাক্ট ‘-কেইমুখের কথারূপে ব্যবহার করার৷ এবং কোনও রকম বিশ্লেষণ -ভাবনাও যে হেতু প্রকৃত রূপে আমাদের ডিএনএ থেকেই অনুপস্থিত, ফলে আরএসএস -পন্থীদেরও কোনও এক তথ্য অবলম্বনে বা নতুন এক তথ্যআবিষ্কারকরে, পছন্দসই প্রোপাগ্যান্ডামূলক কর্মসূচির অন্তর্গত করে ফেলা, হাতের মোয়া-সম হয়ে উঠছে৷

অতএব যা হওয়ার হচ্ছে, ‘পোস্টট্রুথ’-এর কালে, বেড়েও চলবে৷ শুধু মাত্র বিপন্ন কাল, বিষণ্ণ সময় ইত্যাদি বলে হবেটা কী, ইতিহাসচেতনা, স্কুলে ইতিহাস পাঠ্যক্রম, ইতিহাস শিক্ষার প্রকারেই যদি না যুদ্ধকালীন তৎপরতায় বদল আনা হয়৷ফ্যাক্ট তারপ্রকৃতবিশ্লেষণ ব্যবহারে ইতিহাসকে না বুঝলে, ‘উল্টোরথ’-কে ঠেকানো অসম্ভব৷ তবে এও খেয়াল রাখা প্রয়োজন, এই ইতিহাস -ভাবনাও যেনঅখণ্ড হিন্দু সোনালি যুগ’-এর ন্যায় ইউনিফর্ম ঠাস এক বস্ত্ত না হয়ে ওঠে৷ মনে রাখা দরকার, ইতিহাস এক নয়, বহু৷ সেপূর্বকালহয়তো অবদমিত কোনও এক গোষ্ঠীর গাথা৷ আত্মস্থ তো করতে হবে সে ধারাও৷ অতএব ঘুরেফিরে আসে ফের সেই বিশ্লেষণের চিন্তা৷ সে সবে মাথা না ঘামিয়ে কোনও কিছুরই মূলস্রোতেঅন্তর্ভুক্তিবানিষেধাজ্ঞা’ (যদিও সে ভিন্ন আর এক রাজনীতি) শ্রেয় নয়৷ অযুক্তির সঙ্গে শিক্ষা বা যুক্তি দিয়ে লড়া, প্রায় কোনও কালেই পেরে উঠত না, ঠিকই, কিন্ত্ত অযুক্তিকেই না চিনলে তো আরও মহাবিপদ, তাই নয় ?  

বৃহস্পতিবার, ২৩ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭

টাকা না দিলে মৃতদেহ আটক, রোগী-পরিজনকে ঘটি-বাটি বেচতে বাধ্য করা

মমতার চোখে পশ্চিমবঙ্গের বেসরকারি হাসপাতালচিত্র

দৈনিক এই সময়, কলকাতা 

চিকিৎসায় অবহেলা৷ কথায় কথায় বিল বাড়ানো৷ প্যাকেজ ছাড়িয়ে অতিরিক্ত টাকা দাবি৷ টাকা না-মেটালে জবরদস্তি দেহ আটকে রাখা৷ মানসিক চাপ বাড়িয়ে রোগীর পরিজনকে ঘটি-বাটি বেচতে বাধ্য করা৷

বেসরকারি হাসপাতাল সম্পর্কে এ সব অভিযোগ হরবখত করে আমজনতা৷ এ বার সেই সব কথাই শোনা গেল স্বয়ং মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মুখেও৷ প্রকাশ্যে৷

বুধবার দুপুরে কলকাতা ও সংলগ্ন এলাকার বেসরকারি হাসপাতাল কর্তাদের নিয়ে টাউন হলে আয়োজিত মুখ্যমন্ত্রীর বৈঠকে তিনি সিলমোহর দিলেন সাধারণ মানুষের তোলা প্রায় সব ক’টি অভিযোগেই৷ শুধু জনতার বক্তব্য এ দিন মুখ্যমন্ত্রীর গলাতেই উঠে আসেনি, যে ভাবে তিনি ধমকালেন বিভিন্ন বেসরকারি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে, তাতেও আমজনতার ক্ষোভের ছাপ স্পষ্ট৷ হাসপাতাল-নার্সিংহোমগুলির উপর সরকারি নিয়ন্ত্রণ বাড়াতে তিনি অচিরেই হেলথ রেগুলেটরি কমিশন গঠনের উদ্দেশ্যে আইন তৈরি এবং ক্লিনিক্যাল এস্ট্যাব্লিশমেন্ট আইন সংশোধনের কথাও ঘোষণা করেন৷ এ দিন বিকেলেও বেসরকারি হাসপাতালগুলির প্রসঙ্গে নবান্নে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ‘সবাই তো ভুক্তভোগী ! আমি নিজে পুরোটা রিভিউ করব৷’

সবচেয়ে বেশি অভিযোগ অ্যাপোলোর বিরুদ্ধেই৷ বাংলাদেশ সরকারের তরফেও বেশি বিলের অভিযোগ এসেছে অ্যাপোলোর বিরুদ্ধে৷

তার আগে দুপুরবেলা অবশ্য টাউন হলেই মুখ্যমন্ত্রী কার্যত চাবকান কর্পোরেট কর্তাদের৷ ঠিক যে ঢঙে তিনি জেলায় জেলায় প্রশাসনিক বৈঠক করেন, সেই একই কায়দায় কর্পোরেট হাসপাতাল কর্তাদেরও মুখ্যমন্ত্রী ক্লাস নেন একেবারে ‘দিদিমণি’র মেজাজেই৷ ফারাক একটাই৷ প্রশাসনিক বৈঠক হয় রুদ্ধদ্বার কক্ষে৷ আর হাসপাতাল-নার্সিংহোম কর্তাদের তিনি ধমক দিলেন সাংবাদিকদের উপস্থিতিতে, একেবারে টিভি চ্যানেলের ‘লাইভ’ সম্প্রচারকে সাক্ষী রেখে৷ রীতিমতো তথ্যপ্রমাণ পেশ করে, ধরে ধরে তিনি এক-একটি বেসরকারি হাসপাতালের বিরুদ্ধে আমজনতার ক্ষোভ নিয়ে সওয়াল করলেন বৈঠকে৷ আর অধিকাংশ ক্ষেত্রেই কার্যত মুখ বুজে সে-সব অভিযোগ মেনে নিয়ে নিজেদের শোধরানোর অঙ্গীকারকরলেন কর্পোরেট কর্তারা৷ বৈঠকের শুরুতেই মুখ্যমন্ত্রী বুঝিয়ে দেন, আর পাঁচটা বৈঠকের পুনরাবৃত্তি এ দিন হতেযাচ্ছে না৷ জানিয়ে দেন , সরকার বসে নেই৷

বেসরকারি হাসপাতালদের কাজকর্ম নিয়ে‘হোমওয়ার্ক’ সরকার অনেক আগেই শুরুকরেছেন৷ মুখ্যমন্ত্রীর কথায়, ‘অনেক দিনধরেই ভাবছিলাম , বসব৷ অবহেলা, দেহআটকে রাখা, অতিরিক্ত বিল নিয়ে ভূরি ভূরিঅভিযোগ আসছিলই৷ এমনকি, বাংলাদেশথেকেও অভিযোগ পাচ্ছিলাম৷ তাই সাভেশুরু করেছিলাম আগেই৷ ৯৪২টায় সাভেকরিয়ে ৭০টাকে শো -কজ করা হয়েছে, ৩৩টার লাইসেন্স বাতিল করা হয়েছে৷ যেসব অভিযোগ উঠেছিল, বিধানসভার করাএই সার্ভেতে সেগুলির সব ক’টিই প্রমাণিত৷ ভাবতে পারেন, আমাদের এক এমপি-র বিলহয়েছে ৩৫ লাখ টাকা ! সব জানি, মুখখোলাবেন না৷ হাসপাতালের নাম বলতে আমাকে বাধ্য করবেন না, প্লিজ৷’ নিজেরঅভিজ্ঞতার কথা বলতে গিয়ে তিনি জানান, একটি বেসরকারি হাসপাতালে তাঁর নিজেরই এমআরআই রিপোর্টে এমন একটি অঙ্গের উল্লেখ ছিল, যা বহু দিন আগেই বাদ চলে গিয়েছে৷ মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্যে ‘কর্পোরেট’ জালিয়াতির ইঙ্গিত ছিল স্পষ্ট৷

এ দিনের বৈঠকে নাম ধরে ধরে হাসপাতাল কর্তাদের জবাবদিহি চান মুখ্যমন্ত্রী৷ বলেন, সবচেয়ে বেশি অভিযোগ অ্যাপোলোর বিরুদ্ধেই৷ বাংলাদেশ সরকারের তরফেও বেশি বিলের অভিযোগ এসেছে অ্যাপোলোর বিরুদ্ধে৷ রেয়াত করেননি বেলভিউ ক্লিনিকের মতো হাসপাতালকেও যেখানে তিনি নিজে তো বটেই, তাঁর সাংসদ ভাইপো অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় থেকে শুরু করে তৃণমূলের নেতা -মন্ত্রী -বিধায়ক -সাংসদরা বরাবর ভর্তি হয়ে থাকেন৷ রুবি জেনারেল, মেডিকা , কেপিসি -দের সম্পর্কে সরাসরি আক্রমণাত্মক মন্তব্য করে কলকাতার মোট ১৯টি নামি বেসরকারি হাসপাতালকেও তিনি বক্তব্য পেশ করতে বলেন এ দিনের বৈঠকে৷ সব হাসপাতালকে ই-প্রেসক্রিপশন চালুর নির্দেশ দেন তিনি৷ টাকার জিগির তুলে ইমার্জেন্সি থেকে কোনও মতেই যে কোনও রোগীকে ফেরানো যাবে না, জীবনদায়ী প্রাথমিক চিকিত্সাটুকু যে দিতেই হবে, সেই মর্মেও মুখ্যমন্ত্রী সাফ নির্দেশ দেন কর্পোরেট হাসাপাতাল কর্তাদের৷ স্বাস্থ্যসাথীর তালিকায় কিছু হাসপাতাল নাম লেখানোর আগ্রহ না -দেখানোয় মুখ্যমন্ত্রী হুঁশিয়ারি দেন , ‘আমাকেও তা হলে আপনাদের লাইসেন্স নিয়ে ভাবতে হবে৷’

আমরি এবং সিএমআরআইয়ের কোনও প্রতিনিধি কেন সাম্প্রতিক স্বাস্থ্যসাথীর বৈঠকে স্বাস্থ্যভবনে আসেননি , তারও কৈফিয়ত চান মুখ্যমন্ত্রী৷ পরিষেবা ও বিলের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতার অভাব , সমন্বয়হীনতা , ছলে -বলে -কৌশলে বিল বাড়িয়ে দেখানো , হাসপাতাল থেকেই তাদের নির্ধারিত রেটে ডায়গনস্টিক পরীক্ষা করানো ও ওষুধ কিনতে রোগী -পরিজনকে বাধ্য করা , দরকারের সময়ে কেস সামারি দিতে না -চাওয়া , বিল না -মেটালে দেহ আটকে রাখা , নোটবন্দির সময়েও চেক পেমেন্ট নিতে না -চাওয়া , প্যাকেজে এক রকম বলে অন্য রকম বিল করা , এমনকী মুখ্যমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিল নিয়েও সমস্যা তৈরি কেন করা হচ্ছে লাগাতার , সে সবের যুক্তিগ্রাহ্য ব্যাখ্যা দিতে বলেন কলকাতা ও লাগোয়া শহরতলির ৩৬টি বেসরকারি হাসপাতালের কর্তাদের কাছ থেকে৷ প্রতিটি ক্ষেত্রেই দাপুটে মুখ্যমন্ত্রীর সামনে কর্পোরেট কর্তাদের জবাব দিতে দেখা গিয়েছে হেডমাস্টারের সামনে ক্লাসে দোষ ধরা পড়ে যাওয়া ছাত্রদের ঢঙে৷ গোড়া থেকেই মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্যে স্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল , তিনি প্রস্ত্ততি নিয়েই এসেছেন৷ বেসরকারি হাসপাতালগুলির উদ্দেশে তিনি বলেন , ‘আপনারা তো যা -তা করে চলেছেন৷ ২০ % ইনকাম করুন না৷ তা বলে ১০০ % করবেন ! তা হলে তো জহ্লাদের কারখানা হয়ে যায়৷ বিজ্ঞাপনে বলবেন হার্ট সার্জারির প্যাকেজ দেড় লাখ টাকা আর তার পর পেশেন্ট খারাপ হয়ে গিয়েছে বলে আইসিইউ -তে ঢুকিয়ে সাড়ে চার লাখ টাকা বিল করবেন ! ক্রিটিক্যাল কেয়ার ইউনিটের নামে পেশেন্টকে তো আরও ক্রিটিক্যাল করে দেবেন দেখছি৷ এটা কি কল -কারখানা নাকি ? এটা কোনও সিস্টেম হল?’ তিনি জানান, এ সবই তাঁর নয়, সাধারণ মানুষের অভিযোগ৷ বৈঠকে মুখ্যসচিব বাসুদেব বন্দ্যোপাধ্যায়-সহ পদস্থ আমলারা উপস্থিত ছিলেন৷ তিনি বিভিন্ন বেসরকারি হাসপাতালের সঙ্গে সরকারের চুক্তির প্রসঙ্গ তোলেন৷

স্বাস্থ্যসচিব রাজেন্দ্র শুক্লা জানান , কোনও হাসপাতালই চুক্তির তোয়াক্কা করে না৷ স্বরাষ্ট্রসচিব মলয় দে সরাসরি অ্যাপোলো কর্তৃপক্ষকে প্রশ্ন করেন, ১০ % ইন্ডোর বেড এবং ২০ % আউটডোর পরিষেবা যে গরিবদের জন্য দেওয়ার কথা, তা কি তারা দেয় ? জবাবে অ্যাপোলোর কর্তা জানান , নিয়ম অনুযায়ী যাঁদের বার্ষিক আয় ছ’ হাজার টাকার কম, তাঁদের বিনামূল্যে পরিষেবা দেওয়া হয়৷ চমকে উঠে মুখ্যমন্ত্রী তখন বলে ওঠেন, ‘এটা হয় নাকি? ভিখিরির বার্ষিক আয়ও তো ছ’হাজার টাকার বেশি৷ মান্ধাতা আমলের চুক্তি আর নিয়মকানুনের সুযোগ এ ভাবে আপনারা নেন !’

বেলভিউয়ের তরফে মুখ্যমন্ত্রীকে অনুরোধ করা হয়, তাদের হাসপাতাল থেকে নার্সরা যে হারে সরকারি চাকরিতে চলে যাচ্ছেন, তা আটকাতে যেন সরকার বিধিনিষেধ চালু করে৷ মুখ্যমন্ত্রী অবশ্য ভত্র্‌সনার সুরেই বলে ওঠেন, ‘আপনারা তো প্রচুর আয় করেন৷ তা হলে নার্সদের বেতন বাড়ান না কেন? বেশি বেতন মেলে বলেই তো নার্সরা সরকারি চাকরিতে চলে আসে৷ তা ছাড়া কে কোথায় চাকরি করবে তা আইন দিয়ে আটকানো যায় না৷ সেই বিকল্পটা বাছা মানুষের অধিকারের মধ্যে পড়ে৷’


মঙ্গলবার, ৭ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭

‘ডের স্পিগেল ’-এর প্রচ্ছদে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের এই কার্টুন নিয়ে সরগরম সোশ্যাল মিডিয়া

‘ঘাতক’ ট্রাম্পের এক হাতে রক্তমাখা ছুরি, অন্য হাতে ‘স্ট্যাচু অফ লিবার্টি’র কাটামুন্ডু

 বার্তা সংস্থা

এক হাতে রক্তমাখা ছুরি, অন্য হাতে স্ট্যাচু অফ লিবার্টির কাটামুন্ডু, যা থেকে টপটপ করে ঝরছে রক্ত৷ নীচে লেখা ‘আমেরিকা ফার্স্ট’৷

জার্মানির জনপ্রিয় সাপ্তাহিক ম্যাগাজিন ‘ডের স্পিগেল ’-এর প্রচ্ছদে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের এই কার্টুন নিয়ে সরগরম সোশ্যাল মিডিয়া৷ জার্মান চ্যান্সেলার আঙ্গেলা মার্কেল শরণার্থীদের জন্য যে ‘উন্মুক্ত দ্বার নীতি ’ নিয়েছিলেন , তার চড়ান্ত সমালোচনা করেছিলেন ট্রাম্প৷ কিন্ত্ত সে কারণে ট্রাম্পকে এমন ঘাতক হিসেবে তুলে ধরা মানতে পারছেন না অনেকেই৷ আর তাই জার্মানিতেই উঠেছে সমালোচনার ঝড়৷


‘ডের স্পিগেল ’-এর প্রচ্ছদে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের এই কার্টুন
ইউরোপীয় পার্লামেন্টের জার্মান ভাইস -প্রেসিডেন্ট এই কার্টুনকে ‘নিম্নরুচি ’র পরিচায়ক বলে মনে করেন৷ এ দিকে যে শিল্পী এই ম্যাগাজিনের কভার পেজ ডিজাইন করেছেন, সেই এডেল রডরিগুয়েজের জন্ম কিউবায়৷ ১৯৮০ সালে রাজনৈতিক শরণার্থী হিসেবে আমেরিকায় আসেন তিনি৷ তাঁর কথায়, ‘এটা গণতন্ত্র, পবিত্র প্রতীকের মুণ্ডচ্ছেদ৷’ 

ম্যাগাজিনের সম্পাদকের কথায়, ‘ডের স্পিগেল কাউকে উস্কানি দিতে চায় না৷ আমরা শুধু বোঝাতে চেয়েছিলাম, এটা গণতন্ত্র, স্বাধীনতা, সংবাদপত্রের, বিচারবিভাগের স্বাধীনতার প্রশ্ন৷ এই সবগুলোই এখন বিলুন্তপ্রায়৷ আমরা গণতন্ত্রের পক্ষে রয়েছি৷’ কিন্তু জার্মানিরই একাধিক সংবাদপত্র এই কার্টুনের বিরুদ্ধে সরব হয়েছে৷ জার্মান ট্যাবলয়েড ‘বিল্ড’ মনে করে, এই কার্টুনের মাধ্যমে মার্কিন প্রেসিডেন্টকে আদতে আইএস ঘাতক জিহাদি জনের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে৷ সেই সঙ্গেই তারা জানিয়েছে, এর আগেও ‘ডের স্পিগেল’-এর আমেরিকার বিরোধী মানসিকতা প্রকাশিত হয়েছে৷ সংবাদপত্র ‘ডাই ওয়েল্ট’-এর মতে, এ ধরনের প্রচ্ছদ সাংবাদিকতারই ক্ষতি করে৷ এমনিতেই লোকের ধারণা, মূলধারার সংবাদমাধ্যম পক্ষপাতমূলক রিপোর্টিং করে৷ এ ধরনের প্রচ্ছদ সেই ধারণাকে আরও বদ্ধমূল করে দেয়৷ হোয়াইট হাউস অবশ্য আগেই অভিযোগ করেছে, একাধিক ‘উদারমনস্ক সংবাদমাধ্যম’ ট্রাম্পের কৃতিত্বকে খাটো করতে ভুলভাল রির্পোটিং করছে৷ এ দিন বার্লিনের আমেরিকা দূতাবাসের তরফে অবশ্য কোনও প্রতিক্রিয়া মেলেনি৷

রবিবার, ৫ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭

সংসদীয় ব্যবস্থার একান্ত অনুরাগী সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত

সৈকত রুশদী


পরিণত, সত্তরোর্ধ বয়সে চলে গেলেন রাজনীতিক সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত। যেকোন স্তরের মানুষের সাথে সহজভাবে মিশে যাওয়ার ক্ষমতা ছিল তাঁর সহজাত। এই গুণটির কারণে তিনি অসংখ্য মানুষকে আপন করে নিতে পেরেছিলেন। এমনকী প্রতিপক্ষ রাজনৈতিক দলের নেতা ও কর্মীদের সাথেও তাঁর স্বাভাবিক কথা-বার্তার সম্পর্ক কখন ছিন্ন হয়েছে বলে আমার জানা নেই।  আর সাংবাদিকদের সাথে তাঁর সম্পর্ক ছিল ঈর্ষণীয় রকমের ঘনিষ্ঠ।
১৯৭১ সালে স্বাধীনতা যুদ্ধে প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণ ছাড়াও যে তিনটি কারণে সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের নাম বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে, বিশেষ করে সংসদীয় রাজনীতির ইতিহাসে, স্থায়ী হয়ে থাকবে, তার দু'টি ইতিবাচক।  আর একটি নেতিবাচক।
প্রথমত: তিনি ছিলেন বাংলাদেশের সংবিধান প্রণয়নকারী সংসদের অন্যতম সদস্য।  ১৯৭০ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের বিজয়ের জোয়ারের মধ্যে তিনি মস্কোপন্থী দল হিসেবে পরিচিত ন্যাপ (মোজাফফর)-এর প্রার্থী হিসেবে পূর্ব পাকিস্তানের প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। ঐবছর পাকিস্তানের সাধারণ নির্বাচনে পূর্ব পাকিস্তান অংশের জাতীয় পরিষদের নির্বাচিত সদস্য এবং পূর্ব পাকিস্তানের প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচিত সদস্যদের মধ্যে যাঁরা জীবিত ছিলেন ও স্বাধীন বাংলাদেশের পক্ষ অবলম্বন করেছিলেন, তাঁদের নিয়ে বাংলাদেশ গণপরিষদ (Constituent Assembly of Bangladesh) গঠন করা হয়।  সেই গণপরিষদের একজন বিরোধী দলীয় সদস্য হিসেবে তিনি ১৯৭২ সালের ৪ নভেম্বর বাংলাদেশের নতুন সংবিধান পাশের পক্ষে ভোট দেন এবং সংবিধানের কপিতে স্বাক্ষর করেন।  এক ঐতিহাসিক দায়িত্ব পালন করেন তিনি।
দ্বিতীয়ত: ১৯৭০ সাল থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশে যে কয়টি সংসদীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে এবং যে কয়টিতে তিনি প্রার্থী হিসেবে অংশ নিয়েছেন, একটি বাদে তার সব ক'টিতেই তিনি বিজয়ী হয়ে মোট আটবার (১৯৭০, ১৯৭৯, ১৯৮৬, ১৯৯১, জুন ১৯৯৬, ২০০১, ২০০৮ ও ২০১৪) জনপ্রতিনিধি হিসেবে জাতীয় সংসদে আইন প্রণয়নে কার্যকর ভূমিকা রেখেছেন। তাঁর চেয়ে বেশিবার সংসদ সদস্য হওয়ার রেকর্ড বাংলাদেশে আর কারও নেই। সুনামগঞ্জ জেলার দিরাই উপজেলার সন্তান সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত প্রতিনিধিত্বশীল গণতন্ত্র এবং সংসদীয় পদ্ধতির সরকার ব্যবস্থার একান্ত অনুরাগী ছিলেন। বর্তমান দশম জাতীয় সংসদের সদস্য সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত ক্ষমতাসীন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য ছিলেন।
তৃতীয়ত: আওয়ামী লীগের তৃতীয় সরকারে রেল মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে ২০১২ সালে তাঁর বাসভবনে আসার সময়ে তাঁর একান্ত সহকারী গাড়িতে নগদ ৭০ লাখ টাকাসহ বিডিআর সদর দফতরে ধরা পড়লে তাঁর বিরুদ্ধে বাংলাদেশ রেলওয়ের কর্মী নিয়োগে দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে।  বিরোধী দলের দাবি এবং জনমতের চাপে তিনি মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগ করলেও প্রধানমন্ত্রী তাঁকে দফতর বিহীন মন্ত্রী হিসেবে রেখে দেন। এই ঘটনার অল্প কিছুদিন আগে বাংলাদেশ রেলওয়ে থেকে দুর্নীতির 'কাল বিড়াল' তাড়াতে হবে ঘোষণা দিয়ে তিনি আলোচিত হয়েছিলেন। আর দুর্নীতির অভিযোগ ওঠার পর গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তাঁকেই 'কাল বিড়াল' নামে অভিহিত করা হয়।  আমৃত্যু সেই কলংকের বোঝা বয়ে চলতে হয় তাঁকে।
রাষ্ট্রপতি হোসেইন মোহাম্মদ এরশাদের সামরিক শাসনের অধীনে নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত তৃতীয় জাতীয় সংসদের (১৯৮৬-১৯৮৮) সংবাদ সংগ্রহের দায়িত্ব পালনের সময় কোন একদিন আওয়ামী লীগের এই সাংসদের সাথে আমার পরিচয় জাতীয় সংসদ ভবনের লবিতে।  সম্ভবত: মেহেরপুর-১-এর আওয়ামী লীগ দলীয় সংসদ সদস্য মোহাম্মদ সহিউদ্দীন-এর সাথে লবিতে আলাপের এক পর্যায়ে তিনি কাছে আসলে নিজের সাংবাদিক পরিচয় দিয়ে আমি তাঁর সাথে আলাপ করি।  তখন আমি দৈনিক খবর-এর প্রতিবেদক।  নিরহংকারী, সৎ ও জনদরদী সহিউদ্দীন ছিলেন আমার ফুপুর স্বামী। তিনি আমার আত্মীয়তার পরিচয় দেননি।  তবুও আমার মতো একজন তরুণ সাংবাদিকের সাথে সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের নিরহংকারী আচরণ আমাকে তাঁর সাথে যোগাযোগ রাখতে উৎসাহ দিয়েছিল।  সংসদ অধিবেশন চলার সময়ে এবং অন্য সময়েও সংবাদের জন্য তাঁর সাথে যোগাযোগ রেখেছি।
সেসময়ে প্রস্তাবিত কোন বিল নিয়ে ব্যাখ্যা ও আলোচনার জন্য দৈনিক ইত্তেফাক-এর জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক শফিকুর রহমান (বর্তমানে জাতীয় প্রেস ক্লাবের সভাপতি), জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক স্বপন দাশগুপ্ত (তখন কোন পত্রিকায় ছিলেন আজ আর মনে নেই) ও আরও দু'একজনের সাথে আমি মাঝে মাঝে সেনগুপ্তের সাথে আলাপ করতে যেতাম। তিনি প্রাঞ্জল বাংলায় সহজবোধ্য সব ব্যাখ্যা দিতেন অত্যন্ত আন্তরিকতার সাথে। চুলচেরা বিশ্লেষণ করতেন নির্মোহ ভঙ্গীতে।  কোন দলীয় দৃষ্টিকোণ ছাড়াই।  দেশের ও বিদেশের বিভিন্ন আইনের প্রেক্ষাপটের ভিত্তিতে।  তাঁর এই ব্যাখ্যা ছিল সংসদীয় রীতি-নীতি এবং আইনের ভাল-মন্দ দু'টি দিকই বিশ্লেষণ শেখায় আগ্রহী তরুণ সাংবাদিক হিসেবে আমার জন্য অত্যন্ত মূল্যবান।  আমি বাংলাদেশ টাইমস-এ (১৯৮৭) যোগ দেওয়ার পরও তাঁর সাথে আমার যোগাযোগ  অব্যাহত থাকে।  পরবর্তীকালে আমি বাংলাদেশে কানাডিয়ান, অস্ট্রেলিয়ান ও সবশেষে ব্রিটিশ হাই কমিশনে সব মিলিয়ে ১১ বছর রাজনৈতিক বিশ্লেষক হিসেবে কাজের সময়েও কোন আইন বা অধ্যাদেশ নিয়ে আলাপ-আলোচনার জন্য যখনই যোগাযোগ করেছি, তিনি সাথে সাথেই সময় দিয়েছেন। কথা বলেছেন দীর্ঘ সময় ধরে। দেখেছি সংসদীয় রাজনীতির প্রতি তাঁর অপরিসীম অনুরাগ ও প্রচেষ্টা।
জনগণের অংশগ্রহণমূলক প্রতিনিধিত্বশীল গণতন্ত্র সমুজ্জ্বল রাখা এবং সংসদীয় পদ্ধতির সরকার ব্যবস্থা চালু রাখার লক্ষ্যে আজীবন কাজ করে গেছেন তিনি।  মুক্তিযোদ্ধা ছাড়াও অন্তত: এই একটি কারণে তিনি শ্রদ্ধার পাত্র হয়ে থাকবেন, তাঁর অপর সকল দোষগুণ ছাপিয়ে।
ভাল ও মন্দ মিলিয়েই মানুষ। আজ তাঁর জীবনাবসান হয়েছে।  তাঁর বিদেহী আত্মার চিরশান্তি কামনা করছি।

টরন্টো,  ৪ ফেব্রুয়ারী ২০১৭

সৈকত রুশদী: কানাডা প্রবাসী সাংবাদিক

বৃহস্পতিবার, ২৬ জানুয়ারি, ২০১৭

বন্ধুত্বের খতিয়ানে বেসুরো সেই তিস্তা বৃত্তান্ত

জগন্নাথ চট্টোপাধ্যায়

আনন্দবাজার পত্রিকা, কলকাতা ২৬ জানুয়ারি, ২০১৭,

বিদ্যুৎ, রাস্তা, রেল-বন্দর, এলপিজি টার্মিনাল, বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে চটের বস্তা— দানের তালিকা খর্ব নয়। কিন্তু তাতেও মন ভার গ্রহীতার। জল চাই তার জল— তিস্তার জল।

গত ২৩-২৪ জানুয়ারি দিল্লিতে ভারত-বাংলাদেশ বহুমাত্রিক সহযোগিতা নিয়ে আলোচনার মূল নির্যাস এটাই। বিদেশ মন্ত্রক, পেট্রলিয়াম মন্ত্রক এবং কলকাতার ইনস্টিটিউট অব সোশ্যাল অ্যান্ড কালচারাল স্টাডিজ (আইএসসিএস)-এর উদ্যোগে এই আলোচনা সভায় ছিলেন দু’দেশের চার মন্ত্রী। আলোচনায় অংশ নেন দু’দেশের বেশ কয়েক জন কূটনীতিকও। কিন্তু গত সাত বছরে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের সর্বোচ্চ অবস্থানে থেকেও কোথাও যেন তাল কেটে যাচ্ছিল। এর কারণ অবশ্যই তিস্তা চুক্তি বাস্তবায়নে অপারগতা।

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী একেএম মোজাম্মেল হক জানান, একাত্তরে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে যে ১,৬৮৬ জন ভারতীয় সেনা প্রাণ দিয়েছিলেন, তাঁদের পরিবারকে পাঁচ লক্ষ টাকা আর মানপত্র দিচ্ছে শেখ হাসিনা সরকার। তাঁর কথায়, ‘‘ভারত না-থাকলে আজ আমরা দেশই পেতাম না।’’ কিন্তু প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নয়াদিল্লি সফর পর পর দু’বার বাতিল হওয়াটা মোটেই শুভ সংকেত নয়। কেন স্থগিত হচ্ছে সফর? মোজাম্মেল সাহেবের কথায়, ‘‘বড় কারণ অবশ্যই তিস্তার পানি পাওয়া নিয়ে অনিশ্চয়তা। ভারতকে এ বার একটু  তৎপর হতে হবে।’’

ঢাকার সঙ্গে সম্পর্ক চাঙ্গা রাখতে ভারতের তৎপরতার কথা আলোচনার শুরুতেই জানিয়েছিলেন বিদেশ মন্ত্রকের যুগ্মসচিব শ্রীপ্রিয়া রঙ্গনাথন। তিনি বলেন, ‘‘২০১৫ সালে ৭.৫৩ লক্ষ বাংলাদেশিকে ভিসা দেওয়া হয়েছিল, ২০১৬ সালে তা বেড়ে হয়েছে ৯.৬ লক্ষ। এতেই স্পষ্ট আদানপ্রদান আজ কতটা নিবিড়।’’ কেন্দ্রীয় বস্ত্র মন্ত্রী স্মৃতি ইরানির কথায়,‘‘সংস্কৃতি তো এক। জামদানি দু’দেশেই তৈরি হয়। জামদানির সূত্রেও তো বাঁধা পড়তে পারে দু’দেশ।’’ সেই সূত্রেই এসেছে চট্টগ্রাম বন্দরে এলপিজি টার্মিনাল, রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্র, গ্যাস পাইপলাইন তৈরির বিষয়ও। পেট্রলিয়াম মন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান বলেন ভারত-রাশিয়া গ্যাস পাইপলাইন তৈরি হলে তা মায়ানমার-বাংলাদেশের মধ্যে দিয়েও আনা হতে পারে। সে ক্ষেত্রে গ্যাস তো পাবেই, ট্রানজিট দিয়ে বহু রাজস্ব আদায় করতে পারবে বাংলাদেশ।

কিন্তু গ্যাসের সঙ্গে সঙ্গে তিস্তার জলের দাবি থেকেও সরছেন না বাংলাদেশের প্রতিনিধিরা। বাংলাদেশের হাই-কমিশনার সৈয়দ মুয়াজ্জেম আলির আক্ষেপ, ‘‘আমরা তো প্রস্তুত। কিন্তু ভারতকে তো নিজেদের অভ্যন্তরীন সমস্যা মেটাতে হবে। সেই সমস্যা যাতে দ্রুত মেটে তার দিকে আমরা তাকিয়ে আছি।’’

তিস্তার প্রসঙ্গই অবশ্য তোলেননি বিদেশ প্রতিমন্ত্রী এম জে আকবর। তাঁর সাফ কথা, ‘‘আজ না-হোক কাল ঢাকা-দিল্লির বন্ধুত্বের সব সমস্যা মিটে যাবে। সব সমস্যা একেবারে মিটে গেলে তো মন্ত্রী-কূটনীতিকদের চাকরিই থাকবে না!’’

মঙ্গলবার, ২৪ জানুয়ারি, ২০১৭

কোরআনে হাত রেখে শপথ নিলে পশ্চিমা মিডিয়া মুসলিম মৌলবাদী আখ্যা দিত!

সৈয়দ আবুল মকসুদ

যুক্তরাষ্ট্রসহ অনেক দেশে ট্রাম্পের বিরুদ্ধে উত্তাল বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হয়শুক্রবার রাতে যুক্তরাষ্ট্রের ৪৫তম প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অভিষেক অনুষ্ঠানটি টেলিভিশনের পর্দায় দেখলাম। খুবই সুন্দর অনুষ্ঠান। খরচ হয়েছে ২০ কোটি ডলার। এর আগের কয়েকজন প্রেসিডেন্টের যেমন বড় বুশ, বিল ক্লিনটন, ছোট বুশ ও বারাক ওবামার ক্ষমতা গ্রহণের অনুষ্ঠানও দেখেছি, তবে তত মনোযোগ দিয়ে নয়, যতটা মনোযোগ দিয়ে দেখেছি মিস্টার ট্রাম্পের অভিষেক।
খ্রিষ্টধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যে অনুষ্ঠানটি সম্পন্ন হওয়ায় আরও ভালো লাগল। খ্রিষ্টধর্মাবলম্বী অধ্যুষিত দেশ বলেই নয়, খ্রিষ্টানপ্রধান দেশ দুনিয়ায় আরও আছে, কিন্তু আমেরিকার জনগণের গড ও যিশুখ্রিষ্টে অবিচল আস্থা। তাদের ভাষায়: ‘ইন গড উই ট্রাস্ট’। পৃথিবীর অনেক দেশের মতো সাংঘাতিক সেক্যুলার-কাম-রাষ্ট্রধর্মের দেশ তাদের নয়। পৃথিবীর অধিকাংশ মানুষের মতো ধর্ম তাদের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। তাই অভিষেকের আগে ট্রাম্প সাহেব ও তাঁর রানি মেলানিয়া গির্জায় গিয়ে প্রার্থনা করেছেন। (অভিষেকের পরে অবশ্য তিনটি বল ড্যান্স কনসার্টের আয়োজন ছিল, তাতে দম্পতিরা নেচেছেন এবং মি. ট্রাম্প রূপসী মেলানিয়াকে দীর্ঘস্থায়ী চুম্বনে তাঁর প্রগাঢ় ভালোবাসার প্রকাশ ঘটিয়েছেন।) হোয়াইট হাউসে গিয়ে তাঁরা বিদায়ী প্রেসিডেন্ট ও ফার্স্ট লেডির সঙ্গে চা বা কফি খেয়েছেন। ইসায়ী ধর্মের বিভিন্ন শাখা ক্যাথলিক, লুথারিয়ান, প্রটেস্ট্যান্ট গির্জার ধর্মযাজকেরা ও র্যাবাই (ইহুদি-ধর্মযাজক) এলেন এবং তাঁরা তাঁদের বাণী পাঠ করলেন। তাঁদের বাণীতে বারবার গড (ঈশ্বর) এবং যিশুখ্রিষ্টের নাম উচ্চারিত হলো। তারপর নতুন প্রেসিডেন্টকে প্রধান বিচারপতি শপথবাক্য পাঠ করান। তাঁর এক হাত উত্তোলিত, আরেক হাত পবিত্র বাইবেলের ওপর রাখা। একটি ট্রেতে সে বাইবেল ধরে ছিলেন মিসেস মেলানিয়া।


কোনো মুসলমানপ্রধান দেশের সরকার বা রাষ্ট্রপ্রধানের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠান।  দেশের জাতীয় মসজিদে গিয়ে দুই রাকাত নফল নামাজ আদায় করলেন। তারপর গেলেন শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে।  কোরআনের ওপর হাত রেখে সর্বশক্তিমান আল্লাহর (গড) নামে শপথ নিলেন। ওই দেশ ও ওই রাষ্ট্রপতি/প্রধানমন্ত্রীকে নির্ঘাৎ মুসলিম মৌলবাদী বলে আখ্যায়িত করত পশ্চিমের বস্তুনিষ্ঠ মিডিয়া।

যদিও যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানে সরকারি পদ গ্রহণের জন্য কোনো ধর্মপালনের বিধান নেই, তবু অধিকাংশ প্রেসিডেন্ট গির্জায় যান। তা তিনি সেখানে গিয়ে কায়মনোবাক্যে প্রার্থনা করুন বা না করুন। বারাক হোসেন ওবামাও গিয়েছেন।
কল্পনা করুন, পৃথিবীর মানুষের যে মনস্তত্ত্ব, তাতে কোনো উন্নয়নশীল দেশের, বিশেষ করে কোনো মুসলমানপ্রধান দেশের সরকার বা রাষ্ট্রপ্রধানের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠান। প্রেসিডেন্ট বা প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হয়ে শপথ নেবেন। তার আগে তিনি দেশের জাতীয় মসজিদে গিয়ে দুই রাকাত নফল নামাজ আদায় করলেন। তারপর গেলেন শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে। সুন্নি, শিয়া বা অন্য কোনো মাজহাবের ইমামরা এলেন এবং তাঁরা তাঁদের আশীর্বাণী পাঠ করলেন। সব শেষে কোরআনের ওপর হাত রেখে সর্বশক্তিমান আল্লাহর (গড) নামে শপথ নিলেন। ওই দেশ ও ওই রাষ্ট্রপতি/প্রধানমন্ত্রীকে নির্ঘাৎ মুসলিম মৌলবাদী বলে আখ্যায়িত করত পশ্চিমের বস্তুনিষ্ঠ মিডিয়া।
গণতন্ত্র ইউরোপের কোনো কোনো দেশে ছিল রাজতন্ত্রের সঙ্গে মিলেমিশে, কিন্তু গত প্রায় আড়াই শ বছর যাবৎ যুক্তরাষ্ট্রের গণতন্ত্র বিশ্বব্যাপী প্রশংসিত হয়েছে। সেই গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে সে দেশের প্রতিষ্ঠাতারা স্মরণীয় ভূমিকা পালন করেছেন। এবং তাঁদের সঙ্গে মার্কিন দার্শনিক ও চিন্তাবিদদের ভূমিকাও বিরাট। জর্জ ওয়াশিংটন, টমাস জেফারসন, জেমস ম্যাডিসন, আব্রাহাম লিংকন, থিওডোর রুজভেল্ট, ফ্রাঙ্কলিন রুজভেল্ট, ডি ডি আইজেনহাওয়ার, জন এফ কেনেডি প্রমুখ আমেরিকার উন্নতিতে ও গণতন্ত্র
প্রতিষ্ঠায় অবিস্মরণীয় ভূমিকা রেখেছেন। তাঁদের সঙ্গে চার্লস পিয়ার্স, উইলিয়াম জেমস, যোশিয়া রয়েস, জর্জ সান্তায়ানা, জন ডিউই, আলফ্রেড হোয়াইটহেড প্রমুখ দার্শনিক ও ভাবুকেরা জাতির একটি দার্শনিক ভিত্তি তৈরি করে দিয়ে গেছেন। আমেরিকাকে পৃথিবীতে এক নম্বর বানাতে কোনো ধনকুবেরের চেয়ে তাঁদের এবং বিজ্ঞানী-শিক্ষাবিদদের ভূমিকাই প্রধান। পুঁজিবাদী সমাজে ধনকুবেরদের একটা ভূমিকা তো থাকেই।

বাইবেলে হাত রেখে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নিচ্ছেন বারাক হোসেইন ওবামা
শুধু আমেরিকার নয়, যেকোনো দেশের রাষ্ট্রপ্রধানের অভিষেক অনুষ্ঠান অবশ্যই আনন্দের বিষয়। কিন্তু ট্রাম্প যখন দায়িত্ব বুঝে নেন তখন তাঁর দেশে এবং পৃথিবীর অনেক দেশে তাঁর বিরুদ্ধে উত্তাল বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হয়। বাংলাদেশ ছাড়া পৃথিবীর অন্তত ৬০টি দেশে নারীসমাজ রাজপথে নেমেছে বিচিত্র প্ল্যাকার্ড বহন করে এবং স্লোগান দিতে দিতে। যাঁর আশীর্বাদ আবশ্যক, সেই মাননীয় রোমান ক্যাথলিক পোপ পর্যন্ত আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন: দুনিয়া কি একুশ শতকের হিটলারকে দেখতে যাচ্ছে?
নির্বাচনী প্রচারণার সময় থেকেই মি. ট্রাম্পের কথাবার্তা ও অঙ্গভঙ্গি জাতি-ধর্ম-বর্ণনির্বিশেষে বিশ্বব্যাপী বহু মানুষের অন্তরের গভীরতম স্থানে আঘাত করেছে। শতাধিক বছর ধরে পৃথিবীর শুভবুদ্ধিসম্পন্ন নারী ও পুরুষ নারীর অধিকার ও মর্যাদার জন্য আন্দোলন-সংগ্রাম করেছেন শত শত বছরের পুরুষতান্ত্রিকতার প্রাধান্য কমাতে। সেই নারী জাতিকেও তিনি অসম্মান করেছেন। মার্টিন লুথার কিং জুলিয়ারের ছিল একটা ড্রিম—স্বপ্ন। সেই স্বপ্ন বিদায়ী প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার মাধ্যমে আংশিক পূরণ হয়েছে। মি. ট্রাম্প বাকি অংশ নস্যাৎ করে দিলেন। তাঁর ১৫ সদস্যের মন্ত্রিপরিষদে মাত্র একজন কৃষ্ণাঙ্গ, লাতিন বংশোদ্ভূত কারও স্থান হয়নি।
নির্বাচনের আগে মি. ট্রাম্প ইঙ্গিত দিয়েছেন ভারত ও হিন্দুদের তিনি ভালোবাসেন। কিন্তু নির্বাচিত হয়ে টেলিফোনে কথা বলেছেন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফ ও তাইওয়ানের সরকারপ্রধানের সঙ্গে। চীনের চেয়ে তাইওয়ান তাঁর কাছে গুরুত্বপূর্ণ হওয়ার অর্থ চীনের নেতাদের বোঝার ক্ষমতা যথেষ্ট।
হিন্দুপ্রধান ভারত একটি বহু জাতি ও বহু ধর্মাবলম্বীর বাসভূমি। ভারত একটি মহান সভ্যতা। ভারতের ইতিহাস-ঐতিহ্য আমেরিকার ইতিহাস-ঐতিহ্যের চেয়ে হাজার গুণ পুরোনো। সেখানে হিন্দুধর্মাবলম্বীরা সংখ্যাগরিষ্ঠ এবং হিন্দুদেরই প্রাধান্য। কিন্তু সাংবিধানিকভাবে এখনো ভারত একটি ‘ধর্মনিরপেক্ষ গণতন্ত্র’। সেখানে রাষ্ট্রপতি থেকে রাষ্ট্রের যেকোনো পদে অহিন্দুদের নিযুক্তিতে কোনো বাধা নেই। কিন্তু মি. ট্রাম্প হতে চান শুধু ভারতের হিন্দুদের বন্ধু—ভারতের বৌদ্ধদের নয়, পার্সিদের নয়, আহমদিয়াদের নয়, শিখদের নয়, বাহাইদের নয় এবং শুধু ভারতের কেন, কোনো মুসলমানের তো নয়ই। তাঁর এই উক্তি পৃথিবীর ইতিহাসে কোনো রাষ্ট্রনায়কের সবচেয়ে সাম্প্রদায়িক উচ্চারণ।
আগামীকাল যদি চীনের প্রেসিডেন্ট বলেন, আমি শুধু বাংলাদেশের মুসলমানদের বড় বন্ধু। চীনের ব্যবসা-বাণিজ্য বাংলাদেশের মুসলমানরাই বেশি পাবেন। রাশিয়ার পুতিন যদি বলেন, আমরা বাংলাদেশের মুসলমানদের বন্ধু, তা হবে বাংলাদেশের সমগ্র জনগোষ্ঠীর প্রতি অপমান। কারণ, তা বাংলাদেশের হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিষ্টানদের প্রতি চরম অবজ্ঞার শামিল।
ট্রাম্প সাহেব খুবই বুদ্ধিমান। তিনি রাশিয়ার প্রশংসা করে বৌদ্ধপ্রধান চীনকে চাপে রাখতে চান, মুসলমানদের নিন্দা করে হিন্দুপ্রধান ভারতকে প্রীত করতে চান। তিনি তাঁর উদ্বোধনী ভাষণে ইসলামি জঙ্গিদের নির্মূল করার অঙ্গীকার করেছেন। পৃথিবীর পনেরো আনা মুসলমানও চায় ইসলামি জঙ্গিরা নির্মূল হোক, আইএস ও আল-কায়েদা নির্মূল হোক। কিন্তু তাদের নির্মূল করার ষোলো আনা দায় বিধাতা তাঁকেই দিয়েছেন, তা বিশ্বাসযোগ্য নয়।
মুসলমানদের একটি ক্ষুদ্র গোষ্ঠী মধ্যপ্রাচ্যে কী কারণে টেররিস্ট হয়েছে, তা ট্রাম্প সাহেবের চেয়ে ভালো আর কেউ জানে না। তিনি পৃথিবীর যাবতীয় বিষয় বাদ দিয়ে চাইছেন ইসরায়েলে তাঁর দেশের দূতাবাস তেল আবিব থেকে সরিয়ে জেরুজালেমে নেবেন। জেরুজালেম মুসলমানদের পবিত্র স্থান। সেখানে কি ব্রিটেন, ফ্রান্স, জার্মানি, ভারত, চীনের দূতাবাস আছে? এই দূতাবাস সরানোর ঘোষণার কী অর্থ, তা তাঁর অবশ্যই জানা আছে।
সারা দুনিয়ার মানুষের কপালে যা ঘটবে, আমাদেরও তা–ই হবে। তাই বেশি ভাবার কিছু নেই। মনে হয়, হালকা থেকে মাঝারি ধরনের জঙ্গিবাদ আমাদের সরকারের জন্য সুবিধাজনক। পশ্চিমা দুনিয়া তা-ই চায়। প্রধানমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী যতই বলছেন বাংলাদেশে আইএস বা আল-কায়েদা নেই; সাধারণ মানুষেরও তা-ই ধারণা, কিন্তু আমেরিকা বলতে চাইছে, তারা আকছার আছে। এর মধ্যে কিছুদিন আগে ভারতের প্রভাবশালী দৈনিক দ্য হিন্দুকে তথ্যমন্ত্রী জানান, বাংলাদেশে ৮ হাজার আল-কায়েদা জঙ্গি আছে। ৮ হাজার বা ৮০০ খুব বেশি সংখ্যা, যদি বাংলাদেশে দুই-এক শ আল-কায়েদার জঙ্গি থাকত, তাহলে জনগণ ও সরকার অবশ্যই টের পেত।
বাংলাদেশ তার তৈরি পোশাকসহ পণ্যের শুল্কমুক্ত সুবিধা বা জিএসপি নিয়ে এমনিতেই মুশকিলে আছে। দর-কষাকষির ক্ষমতা আমাদের ব্যবসায়ী নেতা ও আমলাদের পর্যাপ্ত নেই। ট্রাম্প প্রশাসন যে দয়াপরবশ হয়ে বাংলাদেশকে জিএসপি সুবিধা দেবে, সে আশা দুরাশা। অথচ আমাদের রপ্তানি পণ্যের জন্য তা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তার ওপর যদি আল-কায়েদা বা আইএস নিয়ে আসামির কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হয়, তাহলে বিপদের আশঙ্কা।
আমেরিকা শুধু ফার্স্ট নয়, যদি ফার্স্টতরও হয়, তাতে আমাদের ঈর্ষার কারণ নেই। কারণ, আমরা তার প্রতিদ্বন্দ্বী হতে পারব না। আমাদের রোল নম্বর দুই নয়, তিন অঙ্কের ঘরে। সম্পদে, সামরিক অস্ত্রে, জ্ঞানে যে জাতি বড়, তাকেই মানুষ বড় বলে। ওসবের অগ্রগতিতেই বড় বা এক নম্বর হওয়া যায়।
কোনো জাতির সমৃদ্ধি ও সভ্যতা চিরকাল এক রকম থাকে না। একটি সময় তা চূড়া স্পর্শ করে। তারপর শুরু তার পতনের। পতন শুরু হওয়ার পরও ২০, ৫০ বছর এক রকম থাকে, ভেতরে-ভেতরে ক্ষয় হয়ে গেলেও। তবে শাসকদের কারও না কারও হাতে পতনের আনুষ্ঠানিক সূচনা হয়। রোমান সাম্রাজ্যের পতন ঘটেছে। তুরস্কের ওসমানীয় সাম্রাজ্যের পতন ঘটেছে। ভারতবর্ষে মোগল সাম্রাজ্যের পতন ঘটেছে, যার শুরু আওরঙ্গজেব থেকে। একসময় ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের সূর্য অস্ত যেত না। উদার ও দূরদৃষ্টিসম্পন্ন শাসক ছাড়া কোনো হঠকারী সংকীর্ণচেতা শাসক কোনো জাতিকে উচ্চতায় নিয়ে যেতে পারে না, ধ্বংসের সূচনা করতে পারে মাত্র।
আমাদের প্রাচ্যের, বিশেষ করে ভারতবর্ষের নীতি সবার সঙ্গে ঐক্য ও সম্প্রীতি। আমরা মানুষে মানুষে অবিশ্বাস, ঘৃণা, বিদ্বেষ, ষড়যন্ত্র, ভীতি প্রদর্শন অপছন্দ করি। আমেরিকায় ট্রাম্প সাহেব ছাড়া আরও মানুষ আছেন। তাঁদের শুভবুদ্ধি আছে বলে জানি। যুক্তরাষ্ট্রের সাংবিধানিক ও গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোও শক্তিশালী। রাজনীতিকদের অনেকের দেশপ্রেম ও কাণ্ডজ্ঞান অসামান্য। মার্কিন কংগ্রেসের অনেক সদস্য তাই ট্রাম্পের অভিষেকে যোগ দেননি। সেখানকার পোশাক ডিজাইনারদের প্রায় কেউই মিসেস ট্রাম্পের পোশাকের নকশা করতে সম্মত হননি। তাই আশা করি কোনো ব্যক্তিবিশেষ পৃথিবীকে অস্থিতিশীল করতে পারবেন না।

সৈয়দ আবুল মকসুদ: লেখক ও গবেষক।

প্রথম আলো’র সৌজন্যে

শুক্রবার, ৬ জানুয়ারি, ২০১৭

৫ জানুয়ারির ভুল, ভুল থেকে শিক্ষা

একটি নির্বাচনকালীন গ্রহণযোগ্য সরকার গঠন করতে হবে। এসব কাজে সরকারকে বিরোধীদল কর্তৃক সর্বতোভাবে সহায়তা করতে হবে। আমার মতে, এসবই ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের শিক্ষা আমাদের জন্য।

আসিফ নজরুল


৫ জানুয়ারির নির্বাচন নিয়ে একতরফা মূল্যায়ন হলে তা দেশের গণতন্ত্র ও সুশাসনের জন্য আরও অমঙ্গলজনক হবে। কারণ, এই নির্বাচন সরকারের গণপ্রতিনিধিত্বমূলক চরিত্র সম্পর্কে প্রশ্নই শুধু জন্ম দেয়নি, দেশের নির্বাচনব্যবস্থা সম্পর্কেও মানুষের মনে প্রবল অবিশ্বাস ও অনাস্থার সৃষ্টি করেছে। এর সঠিক বিশ্লেষণ হলেই কেবল আমরা ভবিষ্যতের করণীয় সম্পর্কে ধারণা পেতে পারি।

২.
৫ জানুয়ারির নির্বাচন নিয়ে বাংলাদেশে দুটি প্রধান দৃষ্টিকোণ রয়েছে। একটি দৃষ্টিকোণ তুমুল সমালোচনামূলক। এই দৃষ্টিকোণ থেকে বলা হয় যে ৫ জানুয়ারির নির্বাচন বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে খারাপ ও অপ্রতিনিধিত্বশীল নির্বাচনের একটি। এই নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটার ভোট দেওয়ার সুযোগ পাননি, সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনে প্রার্থীকে কোনো ভোটই চাইতে হয়নি, সংখ্যাগরিষ্ঠ দল এতে অংশ নেয়নি, এমনকি যে কয়টি আসনে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে, সেখানেও সুষ্ঠুভাবে নির্বাচন হয়নি। বলা হয় যে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিল করার মাধ্যমে এবং পরে প্রধানমন্ত্রী পদে শেখ হাসিনাকে বাদ দিয়ে নির্বাচনকালীন সরকার গঠনের প্রস্তাব না মেনে নিয়ে আওয়ামী লীগ এই পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছিল। অনেকে এ-ও মনে করেন যে নির্বাচন-পূর্ববর্তী সময়ের জনমত জরিপ, স্থানীয় সরকার নির্বাচনগুলোর ফলাফল এবং বাংলাদেশের চিরন্তন রাজনৈতিক সংস্কৃতি (ক্ষমতাসীন দলের পরাজয়) অনুসারে ৫ জানুয়ারি একটি নিরপেক্ষ নির্বাচন হলে এতে ফলাফল সম্পূর্ণ অন্য রকম হতে পারত।
৫ জানুয়ারির নির্বাচনের অন্য পক্ষের লোকজনের প্রায় কেউই এই নির্বাচনের গুণগত মান নিয়ে তেমন কোনো উচ্চবাচ্য করেন না, বলেন না যে এটি একটি ভালো নির্বাচন ছিল। তবে তাঁদের মতে, এই নির্বাচন মন্দ দিকের পুরো দায়দায়িত্ব বিএনপির। তঁাদের দৃষ্টিকোণ থেকে বলা হয় যে এই নির্বাচনে সবার অংশগ্রহণ অবাধ করার জন্য ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ বিএনপির সঙ্গে আন্তরিকতাপূর্ণ আলোচনা করেছিল, তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী নির্বাচনকালীন সরকারে অংশ নেওয়ার জন্য বিএনপিকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন, এমনকি নির্বাচনের সময় অতি গুরুত্বপূর্ণ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বিএনপিকে দেওয়ার প্রস্তাবও করেছিলেন। বলা হয় যে বিএনপি সরকারের আন্তরিকতায় সাড়া না দিয়ে সহিংস আন্দোলনের মাধ্যমে এই নির্বাচন বয়কটের ঘোষণা দিয়েছিল বলেই নির্বাচন এমন একতরফাভাবে অনুষ্ঠিত হয়েছিল।

৩.
এই দুই বয়ানের কোনোটি কি পুরোপুরি অসত্য? আমাদের সমস্যা হচ্ছে আমরা মনে করি, একটি বয়ান সত্যি হলে অন্যটি পুরোপুরি মিথ্যা। কিন্তু আমাদের এখন সময় এসেছে উপলব্ধি করার যে উপরিউক্ত দুই বয়ানই সত্যি, অন্তত অনেকাংশে সত্যি। এই নির্বাচনে অংশ না নেওয়াও ভুল হয়েছিল, এই নির্বাচন একতরফাভাবে অনুষ্ঠিত করাও ভুল হয়েছিল।
এসব ভুল মোচনের সুযোগ তখন ছিল। সংবিধানের ১০৬ অনুচ্ছেদ মোতাবেক সুপ্রিম কোর্টের পরামর্শ নিয়ে নির্বাচনটি পিছিয়ে দিয়ে সবার অংশগ্রহণের শেষ একটি চেষ্টা করার সুযোগ ছিল। এমন প্রস্তাব তখন নাগরিক সমাজের একটি বড় অংশের পক্ষ থেকে নির্বাচনের কিছুদিন আগে করাও হয়েছিল।
এটি সম্ভব না হলে ৫ জানুয়ারি নির্বাচনের সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা পালন করে অল্প সময়ের মধ্যে আরেকটি নির্বাচনের ঘোষণা দেওয়া সম্ভব ছিল। প্রধানমন্ত্রী নিজে এমন সম্ভাবনার কথা বলেছিলেন। ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের পর আওয়ামী লীগ সে রকম কিছু করার কোনো উদ্যোগ নেয়নি, সে রকম উদ্যোগ নিতে আওয়ামী লীগকে প্রভাবিত করার নিয়মতান্ত্রিক রাজনীতিও বিএনপি করতে পারেনি। বরং ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের বর্ষপূর্তিতে জনসভা করার সুযোগ না পাওয়ার পর বিএনপি ও তার সঙ্গীরা অধৈর্য হয়ে যে সহিংস আন্দোলন শুরু করে তা মধ্যবর্তী নির্বাচনের দায় থেকে আওয়ামী লীগকে অনেকাংশে অবমুক্ত করে দেয়।
৫ জানুয়ারি এবং এর পরের ঘটনাপ্রবাহে তাই সবার ভুল ছিল। কারও বেশি কারও কম। ভুল পরিমাপের চেয়ে জরুরি বিষয় হচ্ছে এটি উপলব্ধি করা যে ৫ জানুয়ারিকেন্দ্রিক ভুলের মাশুল দিচ্ছে কোনো না কোনোভাবে সবাই। এর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের মানুষ ভোটাধিকারের অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়েছে, দেশে নির্বাচনব্যবস্থার প্রতি আস্থা মারাত্মকভাবে বিনষ্ট হয়েছে,
জনমতের গুরুত্বের প্রতি সরকারের অবজ্ঞা বৃদ্ধি পেয়েছে, শক্তিশালী বিরোধী দলের অভাবে ক্ষমতার ভারসাম্য নষ্ট হয়েছে, নাগরিক সমাজ বিভক্ত হয়েছে, গণমাধ্যমের ওপর সরকারের খবরদারি বেড়েছে, আওয়ামী লীগ ও বিএনপি উভয়ের প্রতি রুষ্ট মানুষের সংখ্যা বেড়েছে, বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে বহু অন্যায্য আবদার মেনে নিতে হয়েছে, সুস্থ রাজনীতির অভাবে জঙ্গিবাদ মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। সবচেয়ে যা ভয়াবহ এর মধ্য দিয়ে মানুষের গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষার পরিবেশ মারাত্মকভাবে বিনষ্ট হয়েছে।

৪.
৫ জানুয়ারি থেকে তাহলে কী শিখব আমরা? শুধু দোষারোপ করা? নাকি এগোনোর পথটাও খোঁজা? আমার মতে দ্বিতীয়টি। কারণ, ইতিহাসচর্চা মানে বর্তমান থেকে অতীতের পানে ক্রুদ্ধভাবে চেয়ে দেখা নয়। প্রখ্যাত আমেরিকান ইতিহাসবিদ উইলিয়াম অ্যাপলম্যানের মতে, ইতিহাসচর্চার বরং উদ্দেশ্য হওয়া উচিত অতীতে ফিরে গিয়ে আগের ধারণা ও দৃষ্টিকোণগুলোর সীমাবদ্ধতা উপলব্ধি করা এবং এভাবে বর্তমানের করণীয় সম্পর্কে আরও গভীর ও যৌক্তিক সিদ্ধান্তে আসা।
আমার মতে, এটি করতে হলে আমাদের অন্তত এটি বুঝতে হবে ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের মধ্যে আর যা-ই হোক কোনো গৌরব নেই। এই নির্বাচন কাউকে বিজয়ী করেনি। এমন নির্বাচন আর কখনো না হতে দেওয়ার মধ্যেই আমাদের কল্যাণ নিহিত।
আমাদের কল্যাণ নিহিত সুষ্ঠু নির্বাচনের মধ্যে। আমরা সর্বশেষ নারায়ণগঞ্জ নির্বাচনেই দেখেছি সুষ্ঠু নির্বাচন মানুষকে কতটা আশাবাদী করে তোলে। নারায়ণগঞ্জে আইভীর জয়ে আওয়ামী লীগ বিজয়ী হয়েছে, আবার ওয়ার্ড কমিশনার নির্বাচনে অংশ নিয়ে ১২টিতে জিতে বিএনপিও জয়ী হয়েছে।
নারায়ণগঞ্জ নির্বাচন আবারও প্রমাণ করেছে সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন সরকারের সদিচ্ছা। এই সদিচ্ছা আমরা আগেও স্থানীয় নির্বাচনে সরকারের মধ্যে দেখেছি (যেমন ২০১৩ সালের গাজীপুর নির্বাচন), নির্বাচন কমিশন তাই তখনো নিরপেক্ষভাবে কাজ করতে পেরেছিল। কিন্তু একই কমিশন আবার সরকারের চাপে পড়ে ২০১৪ সালের জাতীয় নির্বাচনে বহু প্রশ্নবিদ্ধ পদক্ষেপ নিয়ে সমালোচিত হয়েছিল (যেমন সময় পার হওয়ার পর আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থীদের মনোনয়ন প্রত্যাহারের আবেদন গ্রহণ করা, অন্যদিকে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে জাতীয় পার্টির প্রার্থীরা মনোনয়ন প্রত্যাহার করার পরও তাঁদের প্রার্থিতা বহাল রাখা ইত্যাদি)।
নির্বাচন কমিশনের এই ভূমিকা যতই নজিরবিহীন হোক, তা অস্বাভাবিক ছিল না। কারণ, বাস্তবতা এটিই যে বাংলাদেশের স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে কখনো কোনো জাতীয় নির্বাচনে নির্বাচন কমিশন দলীয় সরকারগুলো ইচ্ছার বাইরে গিয়ে কাজ করতে পারেনি।
হয়তো এই বাস্তবতা থেকেই আওয়ামী লীগ নেত্রী ২০১৩ সালে একটি নির্বাচনকালীন সরকারের প্রস্তাব দিয়েছিলেন। তাঁর এই দৃষ্টিভঙ্গি হয়তো তখনকার সমস্যা সমাধানের জন্য যথেষ্ট বা পর্যাপ্ত ছিল না, কিন্তু তা অবজ্ঞা করার মতোও ছিল না। আমি মনে করি, বর্তমান বাস্তবতায় এই প্রস্তাব ধরে এগোলেই আমরা ৫ জানুয়ারির মতো একটি ভুলে ভরা অতীত থেকে সামনের দিকে এগোতে পারি।
আমাদের অবশ্যই ভবিষ্যতে একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন কমিশন গঠন এবং নির্বাচনী আইনের প্রয়োজনীয় সংস্কার করতে হবে। কিন্তু এসবের পাশাপাশি আমাদের গ্রহণযোগ্য একটি নির্বাচনকালীন সরকারও গঠন করতে হবে। এসব কাজে সরকারকে বিরোধী দল কর্তৃক সর্বতোভাবে সহায়তা করতে হবে। আমার মতে, এসবই ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের শিক্ষা আমাদের জন্য।

আসিফ নজরুল: অধ্যাপক, আইন বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

প্রথম আলো’র সৌজন্যে