মঙ্গলবার, ১৩ ডিসেম্বর, ২০১৬

ভারতের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সতর্কবার্তা

সাবধান! কাগজের ঠোঙায় বিষ, ক্যান্সার থাবা বসাতে পারে

খবরের কাগজের ঠোঙাতেই বিপদ সঙ্কেত

❯❯ নিউজপ্রিন্টে থাকে ক্ষতিকারক রাসায়নিক ডাই-আইসোবিউটাইল থ্যালেট এবং ডাই-এন-বিউটাইল থ্যালেট ❯❯ খবরের কাগজের কালিতে থাকে বেঞ্জিডিন, বেঞ্জাফেনোনস, অ্যানিলিন, এন-ন্যাপথাইল্যামিন, ২-ন্যাপথাইল্যামিন, খনিজ তেল এবং সিসার মতো ভারী ধাতু যা ক্যান্সারের জন্ম দিতে সক্ষম৷❯❯ কালির সঙ্গে মেশানো ফোটো-ইনিশিয়েটর রাসায়নিকও ব্যাপক ক্ষতিকারক


এই সময়, কলকাতা
নিছক ঠোঙা৷ সকলের দৈনন্দিন জীবনেরই অঙ্গ৷ পুরোনো খবরের কাগজের তৈরি আপাত-নিরীহ সেই ঠোঙাতেই এখন বিষের হদিস দেখতে পাচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা৷ আশঙ্কা, চপ-মুড়ি-সিঙাড়া থেকে শুরু করে শুকনো মিষ্টি অথবা রুটির মতো আরও পাঁচটা খাদ্যদ্রব্যের চিরাচরিত মোড়ক হিসেবে ব্যবহূত হয়ে আসা সেই ঠোঙার হাত ধরেই ক্যান্সার থাবা বসাতে পারে শরীরে৷

খবরের কাগজে ব্যবহূত কালির ক্ষতিকারক দিক তুলে ধরার পাশাপাশি সংক্রমণ ছড়ানোর হুঁশিয়ারি-সম্বলিত গুচ্ছ পরামর্শ দিয়ে রীতিমতো ‘অ্যাডভাইজারি’ জারি করেছে ভারতের কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অধীন ওই নিয়ামক সংস্থা৷ এমনকি, খবরের কাগজের ঠোঙা ব্যবহার বন্ধ করতে ভারতের সব রাজ্যের খাদ্যসুরক্ষা কমিশনারকে আশু পদক্ষেপ করার নির্দেশও দেওয়া হয়েছে তাদের তরফে৷ বলা হয়েছে, অবিলম্বে ঠোঙা ব্যবহারের কুপ্রভাব নিয়ে জনসচেতনতা গড়ে তুলতে এবং যথাসম্ভব ঠোঙার ব্যবহার কমানোর উদ্দেশ্যে পদক্ষেপ করতে৷ ফলে জোর ধাক্কা খেতে চলেছে সাধারণ মানুষ৷ কেননা, খাবার থেকে শুরু করে শুকনো মশলা-সহ খাদ্যদ্রব্যের নানা উপকরণের মাধ্যমে দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গী ভাবে জড়িয়ে রয়েছে খবরের কাগজের ঠোঙা৷

খবরের কাগজের কালির মধ্যে  থাকা রং, রঞ্জক পদার্থ যেমন ক্ষতিকর, তেমনই কালির মধ্যে থাকা নানা রকম বাইন্ডার্স, অ্যাডিটিভস ও প্রিজার্ভেটিভস৷ কারণ, এ সবেরই মধ্যে থাকে ক্যান্সারের জন্ম দিতে সক্ষম ভারী ধাতু, খনিজ তেল এবং থ্যালেট জাতীয় চরম ক্ষতিকারক রাসায়নিক৷ 


ভারতের কেন্দ্রীয় সংস্থার অবশ্য বক্তব্য, খবরের কাগজের ঠোঙায় খাবার পরিবেশন খাদ্যসুরক্ষার বিচারে ঘোর বিপজ্জনক৷ এমনকি, সেই ঠোঙায় আনা কাঁচা খাবার স্বাস্থ্যবিধি মেনে রান্না করে ফেলার পরও ঝুঁকি কমে না৷ শুধু তা-ই নয়, ঠোঙার বিপদের বহর বোঝাতে বলা হয়েছে, খবরের কাগজ রাসায়নিক ভাবে ‘রিসাইকেল’ করে তা দিয়ে প্রস্তুত কাগজ ও কার্ডবোর্ডের উপাদানেও রয়ে যায় বিপদ৷ কেননা, খবরের কাগজের কালির মধ্যে থাকা নানা রাসায়নিকের হরেক নেতিবাচক প্রভাব রয়েছে৷ এর মধ্যে থাকা রং, রঞ্জক পদার্থ যেমন ক্ষতিকর, তেমনই কালির মধ্যে থাকা নানা রকম বাইন্ডার্স, অ্যাডিটিভস ও প্রিজার্ভেটিভস৷ কারণ, এ সবেরই মধ্যে থাকে ক্যান্সারের জন্ম দিতে সক্ষম ভারী ধাতু, খনিজ তেল এবং থ্যালেট জাতীয় চরম ক্ষতিকারক রাসায়নিক৷

এফএসএসএআই-এর আরও সতর্কবার্তা, খবরের কাগজের ঠোঙার মাধ্যমে সাধারণ সংক্রমণ ছড়ানোর আশঙ্কাও রয়েছে ষোলো আনা৷ কালি থেকে বদহজমের পাশাপাশি খাদ্যনালীর নানা অসুখও হতে পারে৷ শরীরের নানা অঙ্গে ওই সব রাসায়নিকের বিষক্রিয়াও বিজ্ঞানে প্রমাণিত৷ এবং এমন ঠোঙা ব্যবহারকারীদের মধ্যে শিশু-কিশোর-বয়স্কদের পাশাপাশি সবচেয়ে বেশি ঝুঁকি তাঁদেরই যাঁদের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা অন্যদের তুলনায় কম৷ এঁদের যে কারও যে ক্যান্সারও হতে পারে, তা-ও দ্বিধাহীন ভাষায় জানিয়েছে এফএসএসএআই৷ তারা সতর্ক করে দিয়েছে, শুধু ঠোঙা হিসেবে ব্যবহার নয়, খাবার মুড়ো রাখা কিংবা ভাজা খাবারের তেল শুষে নেওয়ার জন্যও যে ভাবে পুরোনো খবরের কাগজের দেদার ব্যবহার হয় দেশে, তা-ও অত্যন্ত বিপজ্জনক৷ ঠোঙা ব্যবহার কমানোর পক্ষে সওয়াল করলেও চিকিৎসকরা অবশ্য মনে করছেন, অবিলম্বে স্বাস্থ্যের উপর নিউজপ্রিন্ট ও তার কালির প্রভাব নিয়ে গবেষণা প্রয়োজন৷

পশ্চিবঙ্গের ক্যান্সার শল্য চিকিৎসক গৌতম মুখোপাধ্যায় বলেন, ‘সাধারণত রঙের মধ্যে যে সব উপাদান থাকে, সেগুলি থেকে মূত্রথলি ও ফুসফুসের ক্যান্সার এবং ত্বকের নানা অসুখের আশঙ্কা রয়েছে৷ তবে সত্যিই সে ভয় কতটা এবং কোন কালি থেকে কী আশঙ্কা রয়েছে, নির্দিষ্ট ভাবে তার কোনও প্রামাণ্য নথি এখনও অধরা৷ এ নিয়ে গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে৷’

মূত্ররোগ বিশেষজ্ঞ অনুপ কুণ্ডু জানান, কালির মধ্যে থাকা বিভিন্ন ‘কার্সিনোজেনিক’ যৌগ শরীর থেকে ছেঁকে বের করে দেয় কিডনি৷ কিন্তু দীর্ঘক্ষণ সেই সব যৌগ মূত্রথলির সংস্পর্শে থাকায় সেখানে ক্যান্সার হওয়া বিচিত্র নয়৷ ‘কিন্তু নিউজপ্রিন্টের কালির জেরে সত্যিই কতজন ক্যান্সার আক্রান্ত হলেন, তার জন্য সমীক্ষা জরুরি,’ মন্তব্য অনুপের৷

ক্যান্সার বিশেষজ্ঞ শিবাশিস ভট্টাচার্য কিংবা বিভাস বিশ্বাস আবার মনে করেন, আর্থ-সামাজিক কারণেই উন্নত দেশের মতো অনুমোদিত প্যাকিং পেপারের বদলে এ দেশে ঠোঙারই চল যুগযুগান্ত ধরে৷ তাই ঠোঙার ব্যবহার ঠেকাতে সার্বিক অর্থনৈতিক উন্নয়ন অপরিহার্য৷

শনিবার, ১০ ডিসেম্বর, ২০১৬

বিশেষ সাক্ষাৎকারে ভারতের সাবেকমন্ত্রী ও কংগ্রেস নেতা মনি শংকর আয়ার

২০১৪ সালের নির্বাচনে ভারতের পক্ষ থেকে কোনো ধরনের প্রভাব খাটানোর চেষ্টা হয়ে থাকলে তা নিন্দনীয়

মনি শংকর আয়ার ভারতের সাবেক পঞ্চায়েত রাজ মন্ত্রী ও কংগ্রেস নেতা। কূটনীতিক হিসেবে পেশাগত জীবন  শুরু। পরে রাজনীতিতে যোগ  দিয়ে পেট্রোলিয়াম মন্ত্রী হন। গত সপ্তাহে স্থানীয় সরকার  বিষয়ক একাধিক সেমিনারে অংশগ্রহণের জন্য ঢাকায় এলে স্থানীয় সরকার  ও বাংলাদেশ- ভারত সম্পর্ক নিয়ে  প্রথম আলোর কামাল আহমেদ এর সঙ্গে কথা বলেন
 
প্রথম আলো’র সৌজন্যে

প্রথম আলো : আপনি যে বিষয়ের বিশেষজ্ঞ, সেই স্থানীয় সরকার প্রসঙ্গ দিয়েই শুরু করি। ভারতে শক্তিশালী স্থানীয় সরকারব্যবস্থা গড়ে তোলায় সাফল্য এসেছে কীভাবে?

মনি শংকর আয়ার : আপনি যাকে সাফল্য বলছেন, আমি তার সঙ্গে পুরো একমত নই। আমাদের সাফল্য আছে কিন্তু আরও অনেক কিছু করতে হবে। সবচেয়ে বড় সাফল্য হচ্ছে পঞ্চায়েত রাজ। এটি অপরিহার্য ও অপসারণযোগ্য নয়। এবং এই ব্যবস্থা থেকে আর ফিরে আসা সম্ভব নয়। কারণ, এটি সংবিধানের অংশ হয়ে গেছে। ফলে পঞ্চায়েতে আমাদের ৩২ লাখ নির্বাচিত প্রতিনিধি আছেন। আছেন ১৬ লাখ নারী প্রতিনিধি। নমশূদ্র এবং তফসিলি উপজাতির পর্যাপ্ত প্রতিনিধিত্ব আছে। অধিকাংশ রাজ্যেই পশ্চাৎপদ শ্রেণিগুলোর অংশগ্রহণ আছে। সুতরাং, গণতন্ত্রের এই যে সমাহার, ইতিবাচক উদ্যোগ তা আমাদের তৃণমূলে গণতন্ত্র এনেছে। সংবিধানে এটি বাধ্যতামূলক বিধান হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় পঞ্চায়েত রাজের প্রাতিষ্ঠানিক প্রতিষ্ঠা হয়েছে। তবে স্থানীয় সরকারের অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক ক্ষমতায়নের বিষয়টি রাজ্য বিধানসভাগুলোর হাতে রয়ে গেছে। সুতরাং রাজ্যভেদে স্থানীয় সরকারব্যবস্থার কার্যকারিতায় তারতম্য রয়েছে। অবশ্য আনন্দের সঙ্গে এটুকু বলতে পারি যে রাজ্যভেদে স্থানীয় সরকারব্যবস্থার কার্যক্রমে তারতম্য থাকলেও গত ২৫ বছরে সব রাজ্যেই পরিস্থিতির উন্নতি ঘটেছে। বিষয়টি উৎসাহজনক।


শুধু ভারত বা বাংলাদেশ নয়, পুরো দক্ষিণ এশিয়ায় সামাজিক ঐতিহ্য হচ্ছে গণতন্ত্র। কর্তৃত্ববাদিতা আমাদের সঙ্গে মেলে না, গণতন্ত্রই আমাদের জন্য উপযোগী।

প্রথম আলো : এটি কীভাবে সম্ভব হলো? রাজনীতিবিদ, বিশেষ করে এমপিরা তো অন্য কারও কাছে ক্ষমতায় ছাড় বা ভাগ দিতে রাজি হন না?

মনি শংকর আয়ার : দেখুন, এমপিরাই তো এটিকে সংবিধানের অংশ করেছেন। আমি মনে করি না যে এমপিরা কোনোভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। তবে রাজ্য পর্যায়ের রাজনীতিকদের কথা আলাদা। রাজ্য পর্যায়ের বিধায়ক এমএলএরা বিষয়টিকে কিছুটা হুমকি মনে করেন। তাঁদের নিজ নিজ জেলা বা এলাকায় ক্ষমতার পাল্টা কেন্দ্র গড়ে উঠছে বলে তাঁদের মনে হতে পারে। যেসব রাজ্যে স্থানীয় সরকারব্যবস্থা শক্তিশালী হয়েছে, সেসব রাজ্যে উন্নতি হয়েছে। আর যেখানে স্থানীয় সরকারব্যবস্থা দুর্বল সেসব রাজ্য প্রগতির পথে পিছিয়ে পড়েছে।

প্রথম আলো : ভালো করছে এমন দু-একটি রাজ্যের নাম বলবেন? এবং খারাপ করছে যারা?

মনি শংকর আয়ার : দেখুন, কেরালা ও কর্ণাটকের কথা সবাই জানে। কিন্তু আমি এর সঙ্গে কয়েকটি রাজ্য যুক্ত করতে চাই। উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য ত্রিপুরা চমৎকার কাজ করছে। সিকিমের অবস্থাও অনেক দিন ধরে ভালো।

এই বাংলাদেশে যখনই সামরিক শাসন এসেছে আপনারা কতটা অশান্ত হয়ে উঠেছেন? আপনারা গণতন্ত্রকে কীভাবে স্বাগত জানিয়েছেন, মনে করে দেখুন। বাংলাদেশ, কিংবা পাকিস্তান, নেপাল কিংবা শ্রীলঙ্কা, আফগানিস্তান কিংবা ভুটান কেউই দীর্ঘদিন কর্তৃত্ববাদ মেনে নেবে না। ভারতও মৌলিকভাবে গণতান্ত্রিক। তারা স্বাধীনতা চায়, উন্নয়নও চায়। স্বাধীনতা চাইলে গণতন্ত্রের কোনো বিকল্প নেই। তা না হলে, নিচের দিকে থাকা মানুষ কখনো লাভবান হবে না। আপনাকে অন্তর্ভুক্তিমূলক শাসনব্যবস্থায় যেতে হবে, সেটাই গণতন্ত্র। সবার জন্য উন্নয়ন বা অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন চাইলে সেটাই পথ।



প্রথম আলো : পশ্চিমবঙ্গের অবস্থানটি কী?

মনি শংকর আয়ার : সেখানে আসছি একটু পরে। মধ্যপ্রদেশও খুব ভালো করছে। কিন্তু সবচেয়ে খারাপ অবস্থায় হচ্ছে উত্তর প্রদেশ, ছত্তিশগড়, ওডিশা। এগুলোর অবস্থা খুবই বাজে। পশ্চিমবঙ্গ ছিল অগ্রপথিক এবং কমিউনিস্টদের এত দীর্ঘকাল ক্ষমতায় থাকার মূল ভিত্তি। কিন্তু তিন দশকেরও বেশি সময় তারা ক্ষমতাসীন থাকাকালে গুন্ডারা এগুলোর দখল নেয়। আর ওই গুন্ডারা এখন তৃণমূল কংগ্রেসের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করেছে। সুতরাং একসময়ে পশ্চিমবঙ্গে পঞ্চায়েত রাজ প্রতিষ্ঠান হিসেবে যতটা ভালো ছিল, সমাজবিরোধীরা তা দখলে নেওয়ায় তা এখন আবার অনেক পিছিয়ে গেছে।

প্রথম আলো : কেন এমন হলো?

মনি শংকর আয়ার : কমিউনিস্টরা ক্ষমতায় এসেছিল শহরের ভোটে। জ্যোতি বসু গ্রামের মানুষের ভোট নিশ্চিত করতে গ্রামাঞ্চলে কার্যকর পঞ্চায়েত রাজ প্রতিষ্ঠায় মনোযোগ দিয়েছিলেন। সময়ের পরিক্রমায় বামপন্থীদের আশ্রয়ে-প্রশ্রয়ে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোতে সমাজবিরোধীরা ঢুকে তাদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে। তৃণমূল কংগ্রেস ক্ষমতায় আসার পর তারাও ওই সব প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে গুন্ডাদের সহায়ক মনে করে দলে নিয়েছে। ফলে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সমাজবিরোধীদের একটা অশুভ আঁতাত প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। অথচ কেরালা ও ত্রিপুরায় দেখুন, যেখানে কমিউনিস্টরা পশ্চিমবঙ্গের চেয়েও বেশি সময় ধরে ক্ষমতায়, সেখানে কিন্তু চমৎকার পঞ্চায়েতব্যবস্থা দাঁড়িয়ে গেছে। আমি এই সাফল্যের জন্য মানিক সরকারকে অভিনন্দন জানাই।

প্রথম আলো : সুতরাং রাজ্য পর্যায়ে হলেও এই ব্যবস্থাটির সাফল্য বা ব্যর্থতা রাজনীতিকদের ওপর নির্ভরশীল?

মনি শংকর আয়ার : অবশ্যই। তবে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলো কতটা শক্তিশালী, তার ওপরও এটা কিছুটা নির্ভরশীল। কেরালা ও কর্ণাটকে স্থানীয় পঞ্চায়েতগুলোর সদস্যরা ইউনিয়ন গড়ে তুলেছেন। সুতরাং তাঁদের ঐক্যবদ্ধ কণ্ঠস্বর অনেক জোরালো। একটি পঞ্চায়েতের কথা হয়তো কেউ না–ও শুনতে পারে। কিন্তু ৫০০ এমপি কিংবা সাড়ে ৪ হাজার এমএলএ ৩২ লাখ পঞ্চায়েত সদস্যের কথা কীভাবে উপেক্ষা করবেন? সুতরাং গণতন্ত্রে স্থানীয় সরকারব্যবস্থা জয়ী হবে। পূর্ণাঙ্গ পঞ্চায়েত রাজ আমি হয়তো আমার জীবদ্দশায় দেখতে পাব না, কিন্তু আমার নাতি-পুতিরা হয়তো সেটা দেখতে পাবে।

প্রথম আলো : সেই পঞ্চায়েত রাজের চেহারা কেমন হওয়ার কথা?

মনি শংকর আয়ার : আমি যে পঞ্চায়েত রাজের স্বপ্ন দেখি তাতে চার-পাঁচটি মৌলিক শর্ত পূরণের বিষয় আছে। এক নম্বরটি প্রতিনিধিত্ব।

প্রথম আলো : সরাসরি ভোটে নির্বাচিত প্রতিনিধিত্ব?

মনি শংকর আয়ার : প্রত্যক্ষ নির্বাচনে নির্বাচিত প্রতিনিধি। আমাদের অবশ্যই ৫০ শতাংশ নারী প্রতিনিধিত্ব থাকতে হবে। তাঁরা জনগোষ্ঠীর অর্ধেক। ভারতে আমাদের মানতে হবে যে নমশূদ্র ও তফসিলি জাতিগোষ্ঠীর সদস্যরা নিপীড়িত। তাঁরা ৫ হাজার বছর ধরে নিপীড়নের শিকার। সুতরাং তাঁদের অবশ্যই একধরনের বিশেষ মর্যাদা দিতে হবে। বিহার, ঝাড়খন্ড, ছত্তিশগড় ও ওডিশার মতো রাজ্যে এ ধরনের উপজাতীয় গোষ্ঠীগুলোর বিপুলসংখ্যায় আধিক্য আছে। পঞ্চায়েতব্যবস্থার সম্প্রসারণে ১৯৯৬ সালে তফসিলি অঞ্চল আইন করা হয়েছে। সেটির পূর্ণ বাস্তবায়ন হতে হবে। প্রথম এবং সবচেয়ে জরুরি কাজ হবে প্রতিনিধিত্ব বাড়ানো, যাতে সমাজের অভিজাত ব্যক্তিরা এই প্রতিষ্ঠানগুলো দখলে নিতে না পারে। দ্বিতীয়ত, গ্রামসভা ও ওয়ার্ডসভার মতো প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী পার্লামেন্টের মতো ভূমিকা নিতে হবে। তাঁরাই নির্বাচিত প্রতিনিধিদের জবাবদিহি নিশ্চিত করেন।

প্রথম আলো : আপনি যুক্তরাষ্ট্রের ব্রাউন ইউনিভার্সিটিতে এক বক্তব্যে ভারত ও চীনের স্থানীয় সরকারব্যবস্থা নিয়ে যে বক্তব্য দিয়েছিলেন তার উপসংহার টেনেছেন এই বলে যে চীনের স্থানীয় সরকারব্যবস্থা হচ্ছে অধিকতর দক্ষ, আর ভারতেরটা হচ্ছে গণতান্ত্রিক। তার মানে কি এই দাঁড়ায় যে গণতন্ত্রে ঘাটতি থাকলেও ব্যবস্থাটি দক্ষ হতে পারে?

মনি শংকর আয়ার : দেখুন, আপনার প্রশ্নের উত্তরে আমি বলব, চীনে একদলীয় ব্যবস্থা চালু আছে। কোনো ধরনের প্রতিবাদ উঠলেই তা সঙ্গে সঙ্গে দমন করা হয়। সুতরাং বেইজিং থেকে যখনই কোনো আদেশ যায় তা প্রায় সঙ্গে সঙ্গে গ্রামাঞ্চলে পৌঁছে যায় এবং বাস্তবায়নের গতিও দেখা যায়। সুতরাং হ্যাঁ, এটি একটি দক্ষ ব্যবস্থা, তবে সম্পূর্ণভাবে অগণতান্ত্রিক ব্যবস্থা। আমার মনে হয়, চীন ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অন্য দেশগুলোতে কনফুসিয়াস সভ্যতার নীতি অনুসৃত হয়, যেটি হলো কর্তৃত্ববাদী এবং ওপর থেকে চাপিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা। কিন্তু শুধু ভারত বা বাংলাদেশ নয়, পুরো দক্ষিণ এশিয়ায় সামাজিক ঐতিহ্য হচ্ছে গণতন্ত্র। কর্তৃত্ববাদিতা আমাদের সঙ্গে মেলে না, গণতন্ত্রই আমাদের জন্য উপযোগী।

প্রথম আলো : আমি আপনাকে বাংলাদেশের দলীয় রাজনীতির বিতর্কে টেনে আনতে চাই না। কিন্তু বেশ কিছুদিন ধরে এখানে একটা আলোচনা হচ্ছে যে গণতন্ত্র নয়, অগ্রাধিকার হওয়া উচিত উন্নয়ন। আপনি কী বলবেন?

মনি শংকর আয়ার : আমি মনে করি, এটি একেবারে বাজে একটা যুক্তি। আমি বাংলাদেশের কথা বলছি না, সাধারণভাবে বলছি, এটা একেবারে বাজে কথা।

প্রথম আলো : বাজে যুক্তিই যদি হবে, তাহলে সিঙ্গাপুরের এত সাফল্য কেন?

মনি শংকর আয়ার : আমরা একটু আলাদা করে যদি দেখি, সিঙ্গাপুর হচ্ছে কনফুসিয়ান ব্যবস্থার (সভ্যতা) অংশ। অথচ এই বাংলাদেশে যখনই সামরিক শাসন এসেছে আপনারা কতটা অশান্ত হয়ে উঠেছেন? আপনারা গণতন্ত্রকে কীভাবে স্বাগত জানিয়েছেন, মনে করে দেখুন। বাংলাদেশ, কিংবা পাকিস্তান, নেপাল কিংবা শ্রীলঙ্কা, আফগানিস্তান কিংবা ভুটান কেউই দীর্ঘদিন কর্তৃত্ববাদ মেনে নেবে না। ভারতও মৌলিকভাবে গণতান্ত্রিক। তারা স্বাধীনতা চায়, উন্নয়নও চায়। স্বাধীনতা চাইলে গণতন্ত্রের কোনো বিকল্প নেই। তা না হলে, নিচের দিকে থাকা মানুষ কখনো লাভবান হবে না। আপনাকে অন্তর্ভুক্তিমূলক শাসনব্যবস্থায় যেতে হবে, সেটাই গণতন্ত্র। সবার জন্য উন্নয়ন বা অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন চাইলে সেটাই পথ।

প্রথম আলো : আপনি একসময় কূটনীতিক ছিলেন বলে আপনার কাছে জানতে চাইব ভারত ও বাংলাদেশের বর্তমান দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে আপনি কীভাবে মূল্যায়ন করবেন?

মনি শংকর আয়ার : সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আমাদের সম্পর্কের অনেক উন্নতি হয়েছে। ছিটমহলগুলোর বিনিময়কাজটি কংগ্রেস সম্পন্ন করতে চেয়েছিল। কিন্তু বাধার কারণে আটকে যায়। এখন মোদি সরকার তা করেছে এবং এটি একটি বড় পদক্ষেপ। তবে অর্থনৈতিক সহযোগিতা গভীরতর করার কাজটি কাঙ্ক্ষিত গতিতে এগোয়নি। ১৯৭২ সালে আমরা সম্মত হয়েছিলাম যে বিশ্ববাজারে আমরা যৌথভাবে পাটের প্রসার ঘটাব। ৪৪ বছর পরে আমি শুনলাম যে এখনো আমাদের অ্যাজেন্ডা হচ্ছে বিশ্বে যৌথভাবে পাটের প্রসার বাড়ানো। কিছু কিছু ক্ষেত্র আছে, যেখানে আমাদের সহযোগিতা বাড়াতে হবে। সম্প্রতি কিছু বিশেষজ্ঞ চীন থেকে বাংলাদেশ দুটি ডুবোজাহাজ কেনায় প্রশ্ন তুলেছেন। আমি মনে করি, বাংলাদেশের প্রয়োজনমতো যেখান থেকে খুশি প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম কেনার অধিকার রয়েছে। কিন্তু ভারতবেষ্টিত বাংলাদেশের কেন ডুবোজাহাজ প্রয়োজন, সেই প্রশ্নটা আমাদের নিজেদেরই করতে হবে। কেন আমরা তাদের আস্থা অর্জনে সফল হইনি, সেটাই আমাদের বুঝতে হবে।

প্রথম আলো : ২০১৩-১৪ সালে আপনি এবং আপনার দল কংগ্রেস ক্ষমতায় ছিল। তখন বাংলাদেশের নির্বাচনটি অংশগ্রহণমূলক না হলেও আপনারা সাংবিধানিক ধারাবাহিকতার কথা বলে তা সমর্থন করেছিলেন। অনেকের মতে এতে ভারতের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আপনি কী জবাব দেবেন?

মনি শংকর আয়ার : এসব অভিযোগ সত্য নয়। বাংলাদেশের নির্বাচন পুরোটাই তাদের অভ্যন্তরীণ ব্যাপার। গণতন্ত্র সেখানে কতটা অংশগ্রহণমূলক হবে তা বাংলাদেশের রাজনৈতিক শক্তিগুলোর ওপরই নির্ভরশীল। সবচেয়ে দুর্ভাগ্যজনক ব্যাপার হলো, বিএনপি নির্বাচনে হারলে দোষ হয় ভারতের। আওয়ামী লীগ বা বিএনপি কে নির্বাচনে সাফল্য পেল সেটা তো বাংলাদেশিদের বিষয়। ভারত খালেদা জিয়া ও শেখ হাসিনা উভয় সরকারের সঙ্গেই ভালো সম্পর্ক বজায় রেখে এসেছে। অন্য প্রতিবেশীদের সঙ্গেও ভারতের এই সমস্যায় পড়তে হয়, তা সেটি নেপাল হোক কিংবা মালদ্বীপ বা শ্রীলঙ্কা। বাংলাদেশের ২০১৪ সালের নির্বাচনে ভারতের পক্ষ থেকে কোনো ধরনের প্রভাব খাটানোর চেষ্টা হয়ে থাকলে তা নিন্দনীয়।

প্রথম আলো : সুন্দরবনের কাছে রামপাল বিদ্যুৎ প্রকল্প ঘিরে বিতর্কের বিষয়টি নিশ্চয়ই আপনার জানা আছে। আপনার কি মনে হয় না এই বিতর্কে ভারতের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হচ্ছে?

মনি শংকর আয়ার : দেখুন, এই প্রকল্পটি বাস্তবায়নের কাজটি ভারত করছে না। বিষয়টি তো বাংলাদেশ সরকারের কাছে তোলা উচিত। যেসব পরিবেশবাদী সুন্দরবনের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন এবং এর বিরোধিতা করছেন, তাঁদের উচিত হবে এ বিষয়ে বাংলাদেশ সরকারের ওপর চাপ দেওয়া।

প্রথম আলো : আমাদের সময় দেওয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।
মনি শংকর আয়ার : আপনাদেরও ধন্যবাদ।

বুধবার, ৭ ডিসেম্বর, ২০১৬

জয়ার বিস্ময়কর জনপ্রিয়তা মৃত্যুতে তাই গগনবিদারী শোক

মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পরেই প্রথমে সম্রাজ্ঞী এবং তার পরে দেবীর ভূমিকায় দেখা যেতে থাকে জয়ললিতাকে, মনে হতে থাকে যেন নতুন অবতারে পুনর্জন্ম হয়েছে তাঁর৷ একনায়কের যা কিছু চরিত্র লক্ষণ, ধীরে ধীরে তার সব ফুটে উঠতে থাকে তাঁর দল ও রাজ্য পরিচালনায়৷ আত্মীয়-স্বজন, বন্ধুবান্ধব সবার কাছ থেকে দূরে সরে গিয়ে তিনি বেছে নেন প্রায় স্বেচ্ছা নির্বাসন৷ দলে কিংবা সরকারে কারও সাধ্য ছিল না তাঁর ইচ্ছার অন্যথা করার, ছোটো বড়ো সকলকেই একেবারে সাষ্টাঙ্গে প্রণাম করে নিজের ভক্তি ও আনুগত্য প্রকাশ করতে হত৷
সুমন চট্টোপাধ্যায়
এই সময়, কলকাতা

আশির দশকের মাঝামাঝি দিল্লিতে আমি রাজ্যসভা কভার করতাম৷ জয়ললিতা তখন সংসদের সেই কক্ষের সদস্য৷ রোজ সকাল এগারোটায় প্রশ্নোত্তর পর্ব শুরু হওয়ার আগে তিনি সভায় নিজের নির্দিষ্ট জায়গাটিতে এসে বসতেন, পড়ুয়া ছাত্রীর মতো সকলের কথা খুব মন দিয়ে শুনতেন, চেঁচামেচি, হৈ হট্টগোলে একেবারেই অংশ নিতেন না৷ দুধে-আলতা গায়ের রঙ, তামিল পর্দার সবচেয়ে সুন্দরী ও জনপ্রিয় নায়িকার কথায়-বার্তায়, চালেচলনে অন্য রকম আভিজাত্য ছিল, দেখেই বোঝা যেত তিনি ভিড়ের মধ্যে স্বতন্ত্র৷ জয়ললিতার বয়স তখন ৩৭-৩৮, সবে সক্রিয় রাজনীতিতে এসেছেন, তামিলনাড়ুর তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী এমজি রামচন্দ্রনের (সংক্ষেপে এমজিআর ) প্রিয় পাত্রী (দুর্জনের ভাষায় ‘রক্ষিতা’) হিসেবেই তাঁর যাবতীয় পরিচয়৷ তবে এই মহিলাই যে এক দিন পুরুষতন্ত্রের সব প্রতিরোধ পায়ে দলে কিংবা তামিলনাড়ু রাজনীতির পরিচিত জাত-পাতের বিন্যাসকে থোড়াই কেয়ার করে দিয়ে চার চারবার সে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী হবেন, সে সময় কেউ তা কল্পনাও করতে পারেননি৷

এমজিআর তাঁর নায়িকাকে রাজ্যসভায় পাঠিয়েছিলেন একটাই কারণে৷ ইংরেজি ভাষার ওপর জয়ললিতার অনায়াস দখল৷ পশ্চিমবঙ্গের মতোই তামিলনাড়ু থেকেও যাঁরা সাংসদ হয়ে দিল্লিতে আসেন, হিন্দি কিংবা ইংরেজি কোনও ভাষাতেই তাঁরা পারতপক্ষে সড়গড় হন না, সংসদের উভয় কক্ষেই তাঁদের তাই বসে থাকতে দেখা যায় মূক ও বধির সমাজের প্রতিনিধি হয়েই৷ কনভেন্ট শিক্ষিতা, বরাবরের মেধাবী ছাত্রী জয়ললিতা জয়রাম ছিলেন সেই নিয়মে উজ্জ্বল ব্যতিক্রম, বিশুদ্ধ ইংরেজিতে পাবলিক স্কুল উচ্চারণে, টানা বক্তৃতা দিয়ে যেতে তাঁর কোনও অসুবিধেই হত না৷ রাজ্যসভায় তাঁর ‘মেইডেন স্পিচ’ শুনতে তাই সভাকক্ষে হাজির ছিলেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী স্বয়ং৷ তখনই শুনেছিলাম স্কুল -শেষের পরীক্ষায় গোটা রাজ্যে তিনি প্রথম হয়ে স্বর্ণপদক পেয়েছিলেন৷ তাঁর ইচ্ছা ছিল লেখাপড়া চালিয়ে যাবেন, আইন পড়বেন এবং এক দিন কোটিপতি আইনজীবী হবেন৷ কিন্তু মায়ের জোরাজুরিতে তাঁর জীবন সম্পূর্ণ অন্য খাতে বয়েছিল, তিনি সিনেমায় নামতে বাধ্য হয়েছিলেন৷ শেষ পর্যন্ত আবার ওই সিনেমার কল্যাণেই তিনি তামিলনাড়ুর সর্বকালের সবচেয়ে জনপ্রিয় ম্যাটিনি আইডল এমজিআর-এর ছত্রচ্ছায়ায় এসে পড়েছিলেন, তাঁর হাত ধরেই চলে এসেছিলেন রাজনীতিতে৷ নিজের ইচ্ছেমতো জীবনটাকে পরিচালিত করতে না পারলেও যখন যেটা করেছেন, সেখানেই সেরার শিরোপা অর্জন না করে ক্ষান্ত হননি৷ কি সিনেমায় কি রাজনীতিতে৷

নব্বইয়ের দশকে অভিনেত্রী সিমি গ্রেওয়ালকে দেওয়া জয়ললিতার সাক্ষাৎকারটি মন দিয়ে শুনলেই বোঝা যায় চারপাশের বাস্তবতা কতটা নির্মম সে সম্পর্কে তিনি ষোলো আনা অবগত ছিলেন৷ জয়ললিতা মনে করতেন, সিনেমা এবং রাজনীতি দুটোই একই রকম খারাপ হলেও একটা সূক্ষ্ম পার্থক্য আছে৷ সিনেমায় মেয়ে হল অনিবার্য পণ্য, সেখানে একটি মেয়ের গ্ল্যামারের বিকল্প কিছু নেই, থাকতে পারে না৷ কিন্তু রাজনীতিতে মেয়েদের সে ভাবে প্রয়োজন নেই পুরুষের, বস্ত্তত মেয়ে না থাকলেই তাদের বেশি সুবিধে৷ কিন্তু আমার মতো মহিলার ক্ষেত্রে সে কাজটা করা অতটা সহজ নয়, কেউ চাইলেই আমাকে দাবিয়ে দিতে পারবে ব্যাপারটা আদৌ তা নয়৷ যদিও অনেকেই আছে যারা ঠিক সেটাই চায়৷


রাজ্যসভায় পারতপক্ষে জয়ললিতা প্রশ্নোত্তর পর্বে অংশ নিতেন না৷ বলতেন কম , যখন বলতে উঠতেন তখন অবধারিত ভাবে বিষয়বস্ত্ত হত নিজের রাজ্য তামিলনাড়ুর কোনও না কোনও সমস্যা৷ আর বক্তৃতার শুরু থেকে শেষ , প্রায় মন্ত্রোচ্চারণের মতো দমকে দমকে উচ্চারিত হত একটি নাম ---এম জি রামচন্দ্রন৷ সেই থেকে মুলায়ম , মায়াবতী হয়ে হালফিলের মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় পর্যন্ত নেতা -নির্ভর আঞ্চলিক দলগুলিতে একই ট্র্যাডিশন সমানে চলে আসছে৷ নেতা বা নেত্রীর নাম ঘনঘন উচ্চারণ তাঁদের করে যেতে হবেই৷ এমনকী প্রয়োজন না থাকলেও৷

১৯৮৭ সালে কেন্দ্রীয় বাজেট পেশ হওয়ার পরে বিতর্কে অংশ নিয়ে জয়ললিতার দীর্ঘ ভাষণটি আবছা ভাবে এখনও মনে আছে৷ তার একটা কারণ, কোনও ভাষণে অত বার বিশুদ্ধ সংস্কৃত উচ্চারণে কৌটিল্য আওড়ে যেতে আমি অন্তত আর কাউকে দেখেছি বলে মনে পড়ে না৷ তাঁর শাসন দীর্ঘায়িত করতে গেলে প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধীকে কী করতে হবে তা বোঝাতে গিয়ে যৎপরোনাস্তি মিষ্টি ভাষায় জয়ললিতা চাণক্যের শরণাপন্ন হয়েছিলেন৷ বলেছিলেন, শাসকের কাজটা হবে বাগানের দক্ষ মালির মতো৷ দক্ষ মালি কে? না যিনি উৎপাটিত গাছ-গাছালির জায়গায় নতুন চারা বসান, ফুলে ফলে ভরে ওঠা গাছের আদর যত্ন করেন, দুর্বল লতাগুলিকে শক্তিশালী হতে সাহায্য করেন, বাড়-বাড়ন্ত গাছের শাখা প্রশাখাগুলি প্রয়োজন মতো নুইয়ে দেন, বেশি শক্তিশালী গাছকে প্রয়োজনে শক্তিহীন করে দেন, ঝোপঝাড়গুলিকে সুন্দর ভাবে বিন্যস্ত করেন, কাঁটাগাছগুলিকে ছেঁটে দেন এবং মাটি থেকে নিজের মতো করে মাথা চাড়া দেওয়া চারাগাছগুলি রক্ষা করেন৷ জয়ললিতার নাতিদীর্ঘ, ঘটনাবহুল রাজনৈতিক জীবনের ওপর চোখ বোলালে বোঝা যায় চাণক্যের পরামর্শ তিনিও বোধ হয় নিজের মতো করে আত্মস্থ করেই চলার চেষ্টা করেছিলেন শেষ দিন পর্যন্ত৷


নব্বইয়ের দশকে অভিনেত্রী সিমি গ্রেওয়ালকে দেওয়া জয়ললিতার সাক্ষাৎকারটি মন দিয়ে শুনলেই বোঝা যায় চারপাশের বাস্তবতা কতটা নির্মম সে সম্পর্কে তিনি ষোলো আনা অবগত ছিলেন৷ জয়ললিতা মনে করতেন, সিনেমা এবং রাজনীতি দুটোই একই রকম খারাপ হলেও একটা সূক্ষ্ম পার্থক্য আছে৷ সিনেমায় মেয়ে হল অনিবার্য পণ্য, সেখানে একটি মেয়ের গ্ল্যামারের বিকল্প কিছু নেই, থাকতে পারে না৷ কিন্তু রাজনীতিতে মেয়েদের সে ভাবে প্রয়োজন নেই পুরুষের, বস্ত্তত মেয়ে না থাকলেই তাদের বেশি সুবিধে৷ কিন্তু আমার মতো মহিলার ক্ষেত্রে সে কাজটা করা অতটা সহজ নয়, কেউ চাইলেই আমাকে দাবিয়ে দিতে পারবে ব্যাপারটা আদৌ তা নয়৷ যদিও অনেকেই আছে যারা ঠিক সেটাই চায়৷

এমজিআর যত দিন বেঁচেছিলেন, নিজস্ব স্বাধীনতা বলতে কিছুই ছিল না জয়ললিতার৷ তাঁকে যাঁরা ঘনিষ্ঠ ভাবে চেনেন তাঁদের অনেকেরই বক্তব্য এমজিআর -এর সংস্পর্শে আসার পরেই জয়ললিতার জীবনে আসে নাটকীয় মোড়, স্বপ্ন-হতাশা, ধান্দাবাজি-ষড়যন্ত্র কিংবা দেবতা-দানবের ঝঞ্ধাবহুল জগতে সেই তাঁর প্রথম প্রবেশ৷ এমজিআর আর তাঁর মধ্যে দূরত্ব তৈরি করে দিতে কম চেষ্টা হয়নি সে সময়, হতাশ জয়ললিতা কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে গিয়ে দলীয় পদ থেকে ইস্তফাও দিতে চেয়েছিলেন৷ এমজিআর কেবল যে তাঁর অভিভাবক ছিলেন তাই নয়, পার্থিব সব অর্থেই তিনি জয়ললিতাকে পদানত রাখার ও নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করতেন৷ জয়ললিতা কী পোশাক পরবেন, কাদের সঙ্গে মেলামেশা করবেন, কতটা করবেন আর কতটা সঞ্চয় করবেন তাও নির্ধারিত হত এমজিআরের নির্দেশেই৷ কিন্তু বেশ কিছুকাল রোগভোগের পরে এ হেন এমজিআর যখন শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করলেন, জয়ললিতাকে তিনি নিজের উত্তরসূরি মনোনীত করে যাননি৷ অনেক লাঞ্ছনা, বিরোধিতা, বিদ্বেষ, ষড়যন্ত্রের মোকাবিলা করে প্রথমে তিনি দলের নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে নিয়েছিলেন, তার পরে হয়েছিলেন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী৷ হয়তো সে জন্যই জয়ললিতা গর্ব করে বলতে পারতেন, ‘এশিয়ার বাকি মহিলা নেত্রীদের মতো পারিবারিক প্রেক্ষাপট আমার ছিল না৷ আমি নিজেই নিজেকে তৈরি করেছি, কেউ সোনার থালায় সাজিয়ে আমাকে কিছুই তুলে দেয়নি৷’ সে জন্যই কি পুরাচ্চি থালাইভি নিজের উত্তরসূরি হিসেবে কারও নাম ঘোষণা করে গেলেন না?

এমজিআর-এর মৃত্যুর পরে তাঁর পরিবারের হাতে জয়ললিতাকে যে লাঞ্ছনা ভোগ করতে হয়েছিল চেন্নাইতে উপস্থিত থেকে আমি তা চাক্ষুষ করেছিলাম৷ মৃত্যুর খবর পেয়ে নিজের পোয়েস গার্ডেনের বাড়ি থেকে জয়ললিতা প্রথমে ছুটে গিয়েছিলেন প্রয়াত নেতার বাড়িতে৷ সেখানে তাঁর মুখের সামনে দরজা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল, কুকুর-ছাগলের মতো দূর দূর করে তাড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল তাঁকে৷ বাড়ি থেকে এমজিআর-এর মরদেহ রাজাজি সেন্টারে নিয়ে আসা হবে শুনে তিনি সবার আগে সেখানে পৌঁছে গিয়েছিলেন৷ নেতার মাথার পাশে ঠায় ছলছল চোখে দাঁড়িয়ে দিয়েছিলেন একুশটি ঘণ্টা৷ তার পর শেষ যাত্রায় শকট যখন বের হল তারও ওপর জয়ললিতা সওয়ার হতে চেয়েছিলেন৷ কিন্তু তাঁর চুলের মুঠি ধরে, লাথি মেরে তাঁকে সেখান থেকে নামিয়ে দেওয়া হয়৷ শেষ যাত্রায় বের হওয়ার আগে ঠিক একই স্থানে একই ভাবে রাখা ছিল জয়ললিতার নশ্বর দেহও, শেষ মুহূর্তেও তিনি জানান দিয়ে গেলেন আসলে কে ছিলেন এমজিআর-এর প্রকৃত উত্তরসূরি
তখনও জয়ললিতা লোহার পর্দার আড়ালে নিজেকে সরিয়ে নেননি, তখনও তাঁর পোয়েস গার্ডেনের বাংলোয় অবাধ যাতায়াত ছিল সাংবাদিকদের৷ এমজিআর-এর মৃত্যুর পরে আড়াআড়ি ভাবে ভেঙে যাওয়া এআইএডিএমকে শেষ পর্যন্ত ঐক্যবদ্ধ হয়েছিল জয়ললিতার নেতৃত্বেই৷ এমজিআর পত্নী জানকী অল্প কিছু দিনের জন্য রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী হলেও রাজ্য অথবা দল পরিচালনার গুরুভার বহন করার যোগ্যতা তাঁর একেবারেই ছিল না৷ জয়ললিতা অনায়াসে সেই শূন্যতা পূরণ করতে পেরেছিলেন কেননা তৃণমূল স্তরের দলীয় নেতা ও কর্মীদের কাছে তিনিই ছিলেন অধিকতর গ্রহণযোগ্য৷

মিডিয়ার সঙ্গেও তাঁর ছিল প্রায় অহি-নকুল সম্পর্ক৷ মিডিয়ার ওপর নির্ভর করে জয়ললিতা যেমন কোনও দিন রাজনীতি করতে চাননি তেমনি মিডিয়ায় সঙ্গত সমালোচনাও ছিল তাঁর বিলকুল না পসন্দ৷ যতজন সাংবাদিকের বিরুদ্ধে তিনি মানহানির মামলা রুজু করেছিলেন সেটাও অবশ্যই সর্বভারতীয় রেকর্ড৷

মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পরেই ধীরে ধীরে প্রথমে সম্রাজ্ঞী এবং তার পরে দেবীর ভূমিকায় দেখা যেতে থাকে জয়ললিতাকে, মনে হতে থাকে যেন নতুন অবতারে পুনর্জন্ম হয়েছে তাঁর৷ একনায়কের যা কিছু চরিত্র লক্ষণ, ধীরে ধীরে তার সব কয়টি ফুটে উঠতে থাকে তাঁর দল ও রাজ্য পরিচালনায়৷ আত্মীয়-স্বজন, বন্ধুবান্ধব সবার কাছ থেকে দূরে সরে গিয়ে তিনি বেছে নেন প্রায় স্বেচ্ছা নির্বাসনের জীবন, হাতে গোনা সামান্য কয়েকজন ছাড়া যেখানে ঊঁকি দেওয়ার সাধ্যও ছিল না আর কারও৷ দলে কিংবা সরকারে কারও সাধ্য ছিল না তাঁর ইচ্ছার অন্যথা করার, ছোটো বড়ো সকলকেই একেবারে সাষ্টাঙ্গে প্রণাম করে নিজের ভক্তি ও আনুগত্য প্রকাশ করতে হত৷ মিডিয়ার সঙ্গেও তাঁর ছিল প্রায় অহি-নকুল সম্পর্ক৷ মিডিয়ার ওপর নির্ভর করে জয়ললিতা যেমন কোনও দিন রাজনীতি করতে চাননি তেমনি মিডিয়ায় সঙ্গত সমালোচনাও ছিল তাঁর বিলকুল না পসন্দ৷ যতজন সাংবাদিকের বিরুদ্ধে তিনি মানহানির মামলা রুজু করেছিলেন সেটাও অবশ্যই সর্বভারতীয় রেকর্ড৷

কিন্তু আম-জনতার কাছে? তিনি ছিলেন বেনেভোলেন্ট ডেসপট, গরিবের এক ও অদ্বিতীয় আম্মা৷ দাতব্যের রাজনীতির জন্য এমনিতেই পরিচয় আছে তামিলনাড়ুর৷ তবু এ কথা অনস্বীকার্য গরিব ও প্রান্তিক মানুষের কল্যাণে তিনি নিত্য নতুন যত রকম প্রকল্পের আমদানি করেছিলেন তার সমতুল্য কোনও নজির ভারতে নেই৷ মিড-ডে মিল, আম্মা ক্যানটিন, আম্মা সাইকেল , বিয়েতে সোনা এবং মঙ্গলসূত্র, শিশু আলয় এ সব তো ছিলই, এ বার ভোটে জেতার আগে আরও চমকপ্রদ সব দাতব্যের প্রতিশ্রীতি দিয়েছিলেন আম্মা৷ যেমন কৃষকের ঋণ মকুব করা, দশম ও দ্বাদশ শ্রেণির ছাত্র-ছাত্রীদের বিনে পয়সায় ল্যাপটপ, সব রেশন কার্ডের মালিককে বিনে পয়সায় মোবাইল ফোন, এবং শিক্ষার জন্য ঋণে সরকারি ভর্তুকি৷ কিন্তু জয়ললিতার বিশেষ কৃতিত্ব হল এই রকম লাগামছাড়া দাতব্য করতে গিয়ে রাজ্যটাকে তিনি দেউলিয়া করে দেননি৷ সত্যি কথা বলতে কি কাণ্ডজ্ঞানহীন পপুলিজম, প্রশাসকের একনায়কতন্ত্র এবং বেপরোয়া দুর্নীতি সত্ত্বেও আর্থিক অগ্রগতির রাস্তায় তামিলনাড়ু অবিচল থাকতে পেরেছে৷ দেশের মধ্যে এই রাজ্যের অর্থনীতি দ্বিতীয় বৃহত্তম, মাথা পিছু আয়ের প্রশ্নে এক নম্বরে৷ হিউম্যান ডেভলপমেন্টের যাবতীয় সূচক জাতীয় গড়ের অনেক ওপরে৷ দেশের মধ্যে সবচেয়ে কম ফার্টিলিটি রেট এ রাজ্যে, ইনফ্যান্ট মর্টালিটি রেট এবং মেটারনাল মর্টালিটি রেটে দ্বিতীয়, মহিলা ও শিশুদের বিরুদ্ধে হিংসার ঘটনাও এখানে সবচেয়ে কম৷ দেশের মধ্যে সবচেয়ে বেশি শিল্প কারখানা আছে তামিলনাড়ুতে , মহারাষ্ট্র কিংবা গুজরাটের চেয়েও বেশি৷ স্বাভাবিক ভাবেই গুজরাট কিংবা মহারাষ্ট্রের চেয়েও অনেক বেশি লোকের কর্মসংস্থান হয়েছে এই সব কারখানায়৷

তাই বলে কি তামিলনাড়ু ঋণ নেয়নি বা নেয় না? অবশ্যই নেয় এবং গত পাঁচ বছরে তা প্রায় বিরানব্বই শতাংশ বেড়েছে৷ কিন্তু রাজ্যের আর্থিক বৃদ্ধি ও অগ্রগতির কারণে সেই বিপুল ঋণের বোঝা এ রাজ্য সহ্য করতে পেরেছে৷ পূর্বতন সরকারের ঋণ মকুব করে দেওয়ার জন্য জয়ললিতাকে তাই দরবার করতে হয়নি দিল্লির কাছে৷ শাসন ক্ষমতায় থেকে রাজ্যের প্রায় সব শ্রেণির মানুষের মুখে হাসি ফোটাতে পেরেছিলেন বলেই জয়ললিতার এমন বিস্ময়কর জনপ্রিয়তা, তাঁর মৃত্যুতে এমন গগনবিদারী শোক৷

মঙ্গলবার, ৬ ডিসেম্বর, ২০১৬

সর্বজয়া জয়রাম জয়ললিতাএক নিঃসঙ্গ নারী

জয়রাম জয়ললিতা (১৯৪৮-২০১৬)

যার হাত ধরে রাজনীতির পথ পাড়ি দেন, তাঁর মৃত্যুশয্যায় জুটেছে চরম লাঞ্ছনা৷ শেষযাত্রাতেও বড়ই নিঃসঙ্গ বন্ধু-পরিজনহীন জয়ললিতা৷অনন্ত রহস্যের আড়ালে জয়ললিতা জয়ারাম আসলে এক নিঃসঙ্গ নারী৷

এই সময়, কলকাতা

ক্রিকেট মাঠে দূরবীন নিয়ে যেত মেয়েটা৷ মনসুর আলি খান পতৌদিকে দূর থেকে দেখতে৷ ঝকঝকে সুন্দরী মেয়েটা ছোট থেকেই ভালোবাসত সাজগোজ করতে৷ কিন্তু তাকে মেকআপ বা লিপস্টিক নিয়ে নাড়াচাড়া করতে দেখলেই ধমক দিতেন মা৷ পড়াশোনায় তুখোড় মেয়েটা দশম শ্রেণির পরীক্ষায় সারা রাজ্যে প্রথম হয়েছিল৷ কিন্তু তার পর কলেজে ভর্তি করার বদলে সেই মা-ই তাকে সাজিয়ে গুজিয়ে ক্যামেরার সামনে এনে দাঁড় করিয়ে দিলেন৷ ভালোবেসে বিশ্বাস করেছেন যে পুরুষকে, তারাই পিঠে ছুরি বসিয়েছে হাসতে হাসতে৷ যে মানুষটির হাত ধরে রাজনীতির অচেনা পথ পাড়ি দিতে শুরু করেন, তাঁর মৃত্যুশয্যায় জুটেছে চরম লাঞ্ছনা৷ কখনও প্রতিপক্ষকে বেকুব বানিয়ে সাফল্যের শীর্ষে পৌঁছেছেন, পর মুহূর্তেই আছড়ে পড়েছেন মাটিতে৷ সিল্কের শাড়ি, বুলেটপ্রুফ পঞ্চো আর অনন্ত রহস্যের আড়ালে জয়ললিতা জয়ারাম আসলে এক নিঃসঙ্গ নারী৷ বিপুল খ্যাতি, অগণিত ভক্ত, নিরন্তর স্ত্ততি আর সাফল্যের মিনারে বসেও আজীবন যাঁকে তাড়া করে বেড়িয়েছে তীব্র একাকিত্ব ও অতৃন্তি৷

‘আম্মা’র মৃত্যুতে শোকাভিভূত তামিল নারীরা
 ১৯৪৮ সালে তত্কালীন মাইসোর রাজ্যের মান্ড্য জেলায় এক তামিল আয়েঙ্গার ব্রাহ্মণ পরিবারে জন্ম জয়ললিতার৷ তাঁর ঠাকুর্দা ছিলেন মহীশূর রাজপরিবারের চিকিৎসক৷ আর তাঁর দাদু ছিলেন হিন্দুস্তান অ্যারোনটিক্যালসের ইঞ্জিনিয়ার৷ জয়ার বাবা জয়রাম ছিলেন ধনী আইনজীবী৷ কিন্তু বিপুল পৈতৃক সম্পত্তির অধিকাংশই উড়িয়ে দিয়ে তিনি যখন মারা যান জয়ার তখন বয়স মাত্র দুই৷ ছেলে জয়কুমার ও মেয়ে জয়ললিতাকে নিয়ে মা বেদবল্লী এসে ওঠেন বাপের বাড়ি৷ পাঁচের দশকেই বেদবল্লী ছেলেমেয়েকে নিয়ে চলে আসেন মাদ্রাজ৷ সে সময় দক্ষিণী সিনেমার পীঠস্থানে অভিনেত্রী হিসেবে নিজের জায়গাও করে নেন বেদবল্লী৷ পর্দায় তাঁর নাম হয় সন্ধ্যা৷ মেয়ে জয়ার অবশ্য গ্ল্যামার দুনিয়ার চেয়েও আগ্রহ বেশি ছিল পড়াশোনায়৷ তাঁর ইচ্ছা ছিল লেখাপড়া শেষ করে ‘কোটিপতি আইনজীবী’ হওয়ার৷ বাবার অবিমৃষ্যকারিতায় যে সামাজিক অবস্থান তাঁকে খোয়াতে হয়েছিল শৈশবে, আজীবন তা পুনরুদ্ধার করার চেষ্টা চালিয়েছেন জয়া৷ দশম শ্রেণির পরীক্ষায় সারা রাজ্যের মধ্যে প্রথম হওয়ায় রাজ্য সরকারের স্বর্ণপদক জিতে নেন তিনি৷ স্কলারশিপ নিয়ে স্টেলা মরিস কলেজে ভর্তি হওয়ার ঠিক মুখেই ফের ধাক্কা খান জয়া৷ পরিবারের আর্থিক দুরবস্থা সামাল দিতে মা তাঁকে জোর করেই নিয়ে যান পরিচালক সি ভি শ্রীধরের ছবির সেটে৷ ১৬ বছরের কিশোরী জয়াকে সে দিন রং মেখে, খোলামেলা পোশাকে দাঁড়াতে হয় ক্যামেরার সামনে৷ তাঁর কেরিয়ারের প্রথম ছবি বড়পর্দায় দেখতে পাননি জয়া৷ কারণ প্রান্তবয়স্কদের সেই ছবিতে প্রবেশাধিকার ছিল না সেদিনের কিশোরী জয়ার৷ রুপোলি পর্দার চোখ ধাঁধানো নায়িকা জয়া ওই প্রথম ছবির গ্লানি ভুলতে পারেননি কখনও৷ঝলমলে গ্ল্যামার, নাচ-গানের প্রতিভা আর তীক্ষ্ণ বুদ্ধির দৌলতে দক্ষিণী সিনেমার তারকা হয়ে উঠতে সময় লাগেনি জয়ার৷

১৯৬৫ থেকে ’৭৩-এর মধ্যে দক্ষিণের সুপারস্টার এম জি রামচন্দ্রনের সঙ্গে ২৮টি ছবিতে অভিনয় করেন জয়া৷ পশ্চিম বাংলার উত্তম-সুচিত্রা জুটির মতোই জনপ্রিয় হয়ে ওঠে জয়া-এমজিআরের যুগলবন্দি৷ কিন্তু পর্দার সাফল্যেই থমকে যায়নি জয়া ও এমজিআরের যাত্রা৷ ১৯৭৭ সালে দেশজোড়া কংগ্রেস বিরোধী হাওয়ায় ভর করে তামিলনাড়ুর মুখ্যমন্ত্রী হন এমজিআর৷ তাঁর সঙ্গেই রাজনীতির অচেনা পথে হাঁটা শুরু হয় জয়ার৷ ১৯৮৩ সালে এমজিআর তাঁকে নিজের জনসংযোগ সচিবের দায়িত্ব দেন৷ কুশলী এমজিআর পরের বছরই রাজ্যসভার সাংসদ হিসেবে দিল্লিতে পাঠান জয়াকে৷ ইংরেজিতে সাবলীল জয়াই হয়ে ওঠেন রাজধানীতে এমজিআরের মুখ৷ কিন্তু সুন্দরী জয়াকে দায়িত্ব দিয়েও পুরোপুরি নিশ্চিন্ত হতে পারেননি এমজিআর৷ ২৪ ঘণ্টা সতর্ক পাহারায় রাখা শুরু হয় জয়াকে৷ সেই সূত্রেই জয়ার জীবনে আসেন শশিকলা৷ তামিলনাড়ুর এক সচিবের স্ত্রী শশিকলার ভিডিয়ো পার্লারের উপরই দায়িত্ব ছিল জয়ার গতিবিধি ক্যামেরাবন্দি করার৷ কিন্তু নিঃসন্তান শশিকলা ও অবিবাহিতা জয়ললিতার বন্ধুত্ব গড়ে উঠতে বেশি দেরি হয়নি৷

১৯৮৭ সালের ডিসেম্বরে মারা যান এমজিআর৷ ভোরবেলা খবরটা পেয়েই রামাভরম গার্ডেনে এমজিআরের বাসভবনে ছুটে যান ৩৮ বছরের জয়া৷ কিন্তু নিরাপত্তারক্ষী তাঁকে বাড়িতে ঢুকতে দেননি৷ মাদ্রাজের রাজাজি হলে প্রয়াত মুখ্যমন্ত্রীর দেহ রাখা থাকবে খবর পেয়ে তিনি আগেই ছোটেন সেখানে৷ এমজিআরের স্ত্রী জানকী, তাঁর ভাইপো দীপনের বাধা টপকে সোজা পৌঁছে যান এমজিআরের মাথার কাছে৷ টানা ২১ ঘণ্টা সেখানেই দাঁড়িয়েছিলেন জয়া৷ কালো শাড়ি, বড় কালো টিপ পরা জয়ার সেই শোকাচ্ছন্ন রূপ আজও ঝাপসা করে দেয় বহু মানুষের চোখ৷ জয়াকে শিয়র থেকে সরাতে না পেরে তাঁকে টানা চিমটি কেটে, তাঁর পা মাড়িয়ে ক্ষতবিক্ষত করে দেয় জানকীর অনুগত মহিলার দল৷ কিন্তু এর পরও লাঞ্ছনা বাকি ছিল তামিলনাড়ুর ভাবী মুখ্যমন্ত্রীর৷ সেনাবাহিনীর কামানবাহী গাড়িতে এমজিআরের দেহ তোলার সময় তাতে উঠতে যান জয়াও৷ কিন্তু লক্ষ লক্ষ মানুষের সামনে তাঁকে চুলের মুঠি ধরে সেখান থেকে ধাক্কা মেরে ফেলে দেন দীপন৷ সে দিনের ওই অপমানের ক্ষত আজীবন সযত্নে বহন করেছেন আম্মা৷ পরবর্তী সময় ক্ষমতার শিখরে পৌঁছে তিনি যখন নিজের গোটা মন্ত্রিসভাকে আক্ষরিক অর্থেই ‘পদানত’ করেছেন, তার মধ্যেও হয়তো লুকিয়ে ছিল সে দিনের ওই অপমানের প্রতিশোধ৷ এমজিআরের মৃত্যুর পর রাজনৈতিক অভিভাবকহীন জয়ার গায়ে লেগে যায় ‘রক্ষিতা’র তকমা৷ স্ত্রীর পরিচয় নিয়ে জানকীর সদর্প আস্ফালন অবশ্য দীর্ঘস্থায়ী হয়নি৷ অচিরেই এমজিআরের রাজনৈতিক উত্তরাধিকার অর্জন করে নেন জয়া৷ প্রবলভাবে পুরুষতান্ত্রিক দক্ষিণের রাজনীতিতে জয়ললিতার উত্থান কখনওই মসৃণ ছিল না৷ তাঁর রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ করুণানিধিকে একাধিক বার পাশার চালে বাজিমাত করেছেন তিনি৷ পাল্টা প্রতিশোধের মাসুলও দিয়েছেন৷ তাঁর বিপুল বিত্ত, বৈভব দেখে চোখ টাটিয়েছে অনেকের৷ তাঁর ও তাঁর ঘনিষ্ঠ সঙ্গীদের বিরুদ্ধে ওঠা দুর্নীতির অভিযোগ কালিমালিপ্ত করেছে জয়ার ভাবমূর্তিকে৷ বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে মুখ্যমন্ত্রী পদে জয়ী হওয়ার পরই দুর্নীতির দায় মাথায় নিয়ে জেল খেটেছেন৷ দাক্ষিণাত্যের ওপারে বসেও দিল্লির রাজনীতিতেও অনায়াস ছড়ি ঘুরিয়েছেন তিনি৷ তাঁর প্রসাদভিক্ষায় পোয়েস গার্ডেনের বাড়িতে ধরনা দিতে হয়েছে একাধিক প্রধানমন্ত্রীকে৷ রাজীব গান্ধী থেকে নরেন্দ্র মোদী --- তাঁর করুণার প্রত্যাশী হতে হয়েছে অনেক রথী মহারথীকেই৷

সাধারণ মানুষের চোখে তিনি নিজেকে এক অপ্রাপণীয়, হেঁয়ালির ঘোমটায় মুড়ে রেখেছেন৷ পুরুষ সহকর্মী, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে চাবুকের ডগায় বশ করেছেন৷ তবু নিজেকে বরাবর এক বঞ্চিতা নারী হিসেবেই তুলে ধরার সচেতন প্রয়াস চালিয়ে গিয়েছেন জয়ললিতা৷ তার পিছনে আছে বহু পুরুষের প্রবঞ্চনার তীক্ষ্ণ যন্ত্রণা৷ নিজের বাবা, প্রথম প্রেমিক, রাজনৈতিক দীক্ষাগুরু, রাজনৈতিক প্রতিস্পর্ধীরা তাঁকে কোনওদিনই তাঁর প্রাপ্য সম্মান দেননি৷ কেউ ভয় পেয়েছেন, কেউ তাঁকে সামনে রেখে নিজের ঘুুঁটি সাজিয়েছেন৷ কিন্ত্ত পোয়েস গার্ডেনের বাংলোয়, সোনাদানা-সিল্কের শাড়ির স্তুপে বসে থাকা বিপুল ক্ষমতাধর মহিলাটি কাঙাল ছিলেন হয়তো ভালোবাসার, সম্মানের৷ এমজিআরের শেষযাত্রায় ধাক্কা মেরে মাটিতে ফেলে দেওয়ার পর তাঁকে নিগ্রহ করেছিল বহু অপরিচিত হাত৷ সারা জীবন নিজের নিরাপত্তা নিয়ে বাড়াবাড়ির মধ্যে হয়তো আম্মা মুছে ফেলতে চেয়েছেন সে দিনের সেই গ্লানিকে৷ আজ তাঁর শেষযাত্রাতেও সামিল লক্ষ লক্ষ মানুষ৷ চোখের জলে বুক ভাসাচ্ছেন অসংখ্য অনুরাগী৷ কিন্তু শেষযাত্রাতেও বড়ই নিঃসঙ্গ বন্ধু-পরিজনহীন জয়ারাম জয়ললিতা৷

শনিবার, ৩ ডিসেম্বর, ২০১৬

২০০০ রূপির জাল নোট ছেপে আটক

মোদী প্রশংসিত তরুণ ইঞ্জিনিয়ার অভিনব ভার্মার অন্ধকার পথে হাঁটা


সংবাদ সংস্থা

‘ওয়াকিং স্টিক’ ছাড়াই অন্ধরা যাতে হাঁটতে পারেন, সেই ‘লাইভ ব্রেইলি’ পদ্ধতি উদ্ভাবন করেছিলেন তরুণ ভারতীয় ইঞ্জিনিয়ার অভিনব ভার্মা। ভারতের রাষ্ট্রীয় খেতাব আর প্রধানমন্ত্রী মোদির প্রশংসা পাওয়া তরুণ ইঞ্জিনিয়ারই যে অন্ধকার পথে হাঁটা শুরু করেছিলেন কিছু দিন আগে, এ বার সেটাই ফাঁস হয়ে গেল! শেষমেশ ধরা পড়লেন নিজের অফিসেই জাল ভারতীয় নোট ছাপানোর অভিযোগে! তাঁর কাছ থেকে উদ্ধার করা হল নগদ ৪২ লক্ষ টাকা। আর তার পুরোটাই ২০০০ টাকার জাল নোটের বান্ডিল। অবিকল নতুন ২০০০ টাকার নোটের মতোই!

ভারতীয় পঞ্জাবের মোহালিতে বৃহস্পতিবার প্রধানমন্ত্রীর প্রশংসা পাওয়া তরুণ ওই খেতাবধারী তরুণ ইঞ্জিনিয়ার অভিনব ভার্মা সহ তিন জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। ধৃতদের মধ্যে রয়েছেন অভিনবের সম্পর্কিত বোন বিশাখা ভার্মা ও লুধিয়ানার এক প্রোমোটার সুমন নাগপাল। অভিযোগ, ৩০ শতাংশ কমিশনের বিনিময়ে আমজনতার কাছ থেকে পুরনো ৫০০ আর ১০০০ টাকার নোট নিয়ে ধৃত তিন জনই সাধারণ মানুষকে তাঁদের ছাপানো নতুন ২০০০ টাকার জাল নোট ধরিয়ে দিচ্ছিলেন।

মোহালি শহরের পুলিশের এসপি পারমিন্দার সিংহ বলেছেন, ‘‘জাল ২০০০ টাকার নোটের বান্ডিলের মোট ৪২ লক্ষ টাকা বুধবার রাতে একটা নতুন লাক্সারি অডি এসইউভি গাড়ি থেকে উদ্ধার করা হয়েছে। গাড়িটিতে ‘ভিভিআইপি’দের গাড়িতে ব্যবহৃত আলো লাগানো ছিল।’’ তবে ওই চক্রের আরও দু’জনকে পুলিশ এখনও ধরতে পারেনি।

ধৃত তরুণ ইঞ্জিনিয়ার অভিনব ভার্মা গত বছরই তাঁর বিশেষ উদ্ভাবনের জন্য ‘মেক ইন ইন্ডিয়া’ খেতাব পেয়েছিলেন। প্রযুক্তিতে তাঁর বিশেষ উদ্ভাবনের জন্য গত বছরের ভারতীয় বিজ্ঞান কংগ্রেসে অভিনবের ভূয়সী প্রশংসা করেছিলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। অভিনবের প্রযুক্তি ১৫টি দেশে বিক্রি করা হয়েছে।

পুলিশ জানাচ্ছে, ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের কৃতী ছাত্র ২১ বছরের অভিনব চণ্ডীগড়ে তাঁর অফিসেই নতুন ২০০০ টাকার জাল নোট ছাপাচ্ছিলেন। তাঁর সঙ্গী ছিলেন এমবিএ পাশ করা তাঁর এক সম্পর্কিত বোন বিশাখা (২৩)। আর তাঁদের সঙ্গী লুধিয়ানার প্রোমোটারের কাজ ছিল লোকজন জুটিয়ে আনা।

বৃহস্পতিবার, ১ ডিসেম্বর, ২০১৬

সাতের দশকে আরএসএস প্রকাশিত বইতে টিপু দেশভক্ত, তাদের চোখেই তিনি এখন হিন্দুবিদ্বেষী

রাষ্ট্র তো আছেই, ইতিহাসবিদের কী দরকার?

নিজেদের সুবিধার্থে ব্রিটিশ শাসকরা যেভাবে ইতিহাস লিখেছে, সেই একই মডেল অনুসরণ করছে হিন্দুত্ববাদীরা৷ সেখানে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যই প্রধান, তথ্য গৌণ৷

 

 অনির্বাণ ভট্টাচার্য


আমাদের এ ভূখণ্ডে ইতিহাসকে সাম্প্রদায়িক দৃষ্টিকোণ থেকে বোঝার বা দেখার যে প্রক্রিয়া, অভ্যেস, তার উত্স সন্ধানে বেরোই যদি, তবে গিয়ে থামব সেই ঔপনিবেশিক যুগে৷ অধীনস্থের সে অতীত -আখ্যান, যখন সেই প্রভুরা বা তাদেরই নিযুক্ত ইতিহাসবিদরা লিখতে শুরু করলেন, তখন তা দেখা হল, স্পষ্টতই ধর্মের দৃষ্টিকোণ দিয়ে৷ তাতে অনায়াসেই সেঁধিয়ে গেল এমনকী সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক মতাদর্শ, ঘটনাবলীও৷ অর্থাত্ সে সবও, অতঃপর ওই ধর্মের আতসকাচ দিয়ে দেখা হতে থাকল৷ জেমস মিল -এর সে কালের ইতিহাসকে হিন্দু, মুসলমান পর্বে ভাগ, এহেন প্রবণতারই জলজ্যান্ত উদাহরণ৷ ইতিহাসের এই স্তর -ভাগ, নিশ্চিত ভাবেই বিভেদকামী, কারণ তা না হলে তো, ব্রিটিশ শাসনকালও মান্যতা পায় না৷ এমত ইতিহাসদর্শনের উদ্দেশ্য জানা সত্ত্বেও, আমরা দেখেছি পরবর্তী সময়ের বহু ইতিহাসবিদ, ওই পর্বভিত্তিক ভাবনাতেই মগ্ন থেকেছেন৷ স্কুল, কলেজের পাঠ্যক্রমও দিনের পর দিন সেই মর্মে চালিত হয়ে এসেছে৷ ফলত, অসংখ্য প্রজন্মের ভাবনাজগতও সে ছাঁচে নির্মিত হয়েছে৷

টিপুকে কখনওই নিজ রাজ্যে মন্দির ভাঙতে দেখা যাচ্ছে না৷ মারাঠাদের হাতে শৃঙ্গেরি মঠের ধ্বংসের খবর পাওয়া মাত্র, টিপু কিন্তু তত্ক্ষণাৎ পুনর্নির্মাণের সমস্ত দায়ভার নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন৷


সিনেমার মতো দৃশ্যান্তরের ফলে যদি এ বার আমরা ইতিহাসকে গোঁড়া হিন্দু দৃষ্টিকোণ দিয়েই দেখতে চাই, তবে দেখব, ব্রিটিশদের ওই ধর্মের নিরিখে যাবতীয় কর্মকাণ্ডের বিচার, এক্কেবারে অন্য মাত্রা পেয়ে যাচ্ছে এ ক্ষেত্রে৷ ঔপনিবেশিক ইতিহাসলিখনের স্ট্রাকচারে যবন বা ইসমালপন্থীদের অরাজকতা ও অত্যাচারের খোলামেলা, যথেচ্ছ বিবরণ, ‘হিন্দু’দের হাতে পড়ে বেশ সুকৌশলেই হয়ে যাচ্ছে ‘বহিরাগত’ বনাম আদি নিবাসীর সংঘাত৷ রামজন্মভূমি নিয়ে দীর্ঘ দিনের যে রাজনীতি, তা-ই তো চোখে আঙুল দিয়ে এই প্রবণতা ব্যক্ত করে৷ যে রাজনীতি, সে প্রকার ইতিহাসদর্শনের মাধ্যমে সাধারণের মনে এক বিশেষ চেতনা জাগাতে সক্ষম হয়৷ সেই চেতনা ধর্ম বা সেই ধর্মের প্রতি অন্ধবিশ্বাসকে, প্রকৃত যুক্তির উপরে স্থান দেয়৷ এবং অতিযত্নে এক রকম শত্রুকেও চিহ্নিত করে, যারা বহিরাগত, ফলে আদি নিবাসীদের ধর্মে আঘাত করতে ব্রতী৷

এখানে স্মর্তব্য, সাম্প্রদায়িক ইতিহাসদর্শনের সঙ্গেই কিন্ত্ত এখানে এক ক্ষেত্রে বিচরণ করছে পুনরুত্থানবাদও৷ উনিশ শতকের দ্বিতীয় ভাগে, বঙ্কিমচন্দ্র, বিবেকানন্দ বা দয়ানন্দ সরস্বতী যখন হিন্দু ধর্মের অনন্ত ঘুম ভাঙিয়ে তাকে ফের চাগিয়ে তুলতে ব্রতী, তখন সে প্রকল্পের মূলমন্ত্র কিন্ত্ত কখনওই অন্য ধর্মের বিরুদ্ধে জেহাদ ছিল না৷ ক্রিটিক তাঁরা নির্ঘাত্ করেছিলেন, অন্য ধর্মের, বিশেষত দয়ানন্দ সরস্বতী, কিন্ত্ত তাঁর কর্মের বিশদে আলোচনা দেখাবে, অন্য ধর্মের প্রতি তাঁর অশেষ ঘৃণা সত্য নয়৷ তাঁরা চেয়েছিলেন, নিজ ও অন্য ধর্মের তুলনামূলক আলোচনার মাধ্যমে, নিজ ধর্ম, এ ক্ষেত্রে হিন্দু ধর্মের অন্তঃস্থলের উপলব্ধি৷ এবং প্রকৃত অর্থে, তার পুনরুত্থান৷ কিন্ত্ত ঠিক এই চিত্রকল্পে, বা বলা ভালো সঙ্ঘ পরিবার নির্দেশিত কর্মকাণ্ডে, যখন সেই অন্য ধর্ম হয়ে যায় ‘অপর’, তখন? তখন পুনরুত্থান এক অন্য অর্থ পায়, মাত্রা পায়, এবং সে ‘অপর’, যে আবার ‘বহিরাগত ’-ও, সে ‘আদি নিবাসী ’ হিন্দু-আকাশে দুর্ধর্ষ দুশমন হয়ে উদয় হয়৷

হিন্দুরা অবশ্য কোন জাদুবলে, নির্দ্বিধায় এ ভূখণ্ডের আদি নিবাসীরূপে ভূষিত হল, কেই বা সে সম্মান তাদের তুলে দিল, সে প্রসঙ্গ অবশ্য বর্তমান আবহে অর্থহীন৷ নিজেদের পাক্কা আর্য-বংশধর রূপে কল্পনা করা সঙ্ঘিদের যদি কেউ গিয়ে শোনায়, অ্যানথ্রোপোলজিকাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়ার এক তথ্য, যা অনুযায়ী এ দেশে, ৪৬৩৫ প্রকার সম্প্রদায়ের অস্তিত্ব রয়েছে, যাদের শারীরিক গঠন, বেশভূষা, ধর্মীয় উপাসনার পন্থা, ভাষা, নিয়মরীতি ইত্যাদি সবই ভিন্ন, এবং এর মধ্যে অধিকাংশ সম্প্রদায়েরই বংশধারা মিশ্র৷ কিন্ত্ত এই প্লুরালিটিকে মান্যতা দিলে তো সঙ্ঘ পরিবারের এই হিন্দু রাষ্ট্র গড়ে তোলার গোটা প্রকল্পই মার খেয়ে যায়৷ অতএব চলে, ‘ঘর ওয়াপসি ’ বা বহিরাগতের শুদ্ধিকরণ৷

হিন্দুত্ব ভাবধারায়, আদি নিবাসীদের পরিসর অশুদ্ধ করা ছাড়াও, এই বহিরাগতরা, যে আরও একটি কাজ প্রবল ভাবে করে দিয়েছে, তা হল, রাজনৈতিক ক্ষেত্রে তুমুল অশান্তি খাড়া করা৷ বিনায়ক দামোদর সাভারকরের ইতিহাস পড়লে যেমন স্পষ্ট হবে, যে ভারতের ইতিহাস আদতে, বারংবার বিদেশি আক্রমণ ও তার বিরুদ্ধে কঠোর হিন্দু প্রতিরোধেরই মহা -আখ্যান৷ তিনি কিছু পরাক্রমী রাজা বাছাই করে নেন, যাঁরা এই ‘হিন্দু রাষ্ট্র ’কে টিকিয়ে রাখতে, বহিরাগতদের বিরুদ্ধে প্রাণ লড়িয়ে দিয়েছিলেন, শত্রুপক্ষকে সফল ভাবে প্রতিহতও করেছিলেন৷ সাভরকর, চন্দ্রগুন্ত ও পুষ্যমিত্র সুঙ্গ-এর কথা লেখেন, যখন গ্রিক আক্রমণ সামলানো গিয়েছিল, সাভারকর আরও তুলে ধরেন, বিক্রমাদিত্য ও যশোধর্মা -র কথাও, যাঁরা শক ও হূণদের হারিয়ে, সেই ‘হিন্দু রাষ্ট্র ’-এর মান রক্ষা করেছিলেন৷ এখানে অবশ্য ভাবার, এই যে বিক্রমাদিত্যের কথা তিনি বলছেন, তিনি আসলে কে? দ্বিতীয় চন্দ্রগুন্ত কি ? সাভারকর কিন্ত্ত তা স্পষ্ট করছেন না৷ ‘প্রকৃত’ ইতিহাসের পাঠ বোঝাবে, যে দোর্দণ্ডপ্রতাপ বিক্রমাদিত্য কিন্ত্ত বহু কালের এক কিংবদন্তি৷ বিশেষ কোনও ব্যক্তি কি আদৌ, প্রবল সংশয় রয়েছে৷ খোদ দ্বিতীয় চন্দ্রগুন্ত -ও নিজ কীর্তির মান্যতাস্বরূপ নিজ নামের সঙ্গে বিক্রমাদিত্য জুড়ে নিয়েছিলেন৷ তো সাভারকর প্রথমত কী করলেন ? কিংবদন্তিকে বা উপকথাকেও ‘প্রকৃত’ ইতিহাসের মান্যতা দিলেন৷ ইতিহাসের এমন এক অর্থও করলেন, যা কল্পিত, বিভ্রান্তিকরও৷ দ্বিতীয়ত, তিনি বললেন, এমন সব রাজারাজড়াই নাকি ছিলেন, দেশভক্তির প্রতিভূ৷ এখানে বিচার্য, সাভারকর কোন দেশের কথা বলছেন ? ভারত? কিন্ত্ত সে কালে তো ‘দেশ’ নামক আধুনিক ধারণা, দূর অস্ত৷ অর্থাত্, নির্দিষ্ট একটি গণ্ডির ভূখণ্ডকে দেশ বলে ভাবার কোনও কারণও নেই৷ ফলে, কারই বা সে ‘দেশ’, কেই বা সেখানে ‘বহিরাগত’, তাও কি বিচার্য নয় ? তবুও, নানা ক্ষেত্রে এই ‘দেশ’-এর কল্যাণার্থেই যে ভাবে উপরে উল্লিখিত পরাক্রমী জন, তা ছাড়া রাজারাজ চোল বা কৃষ্ণদেব রায় বা হেমু বিক্রমাদিত্যের মতো রাজাদেরও প্রকৃত দেশভক্ত বানিয়ে ফেলা হয়েছে, হচ্ছেও, তার ভিত্তি নিয়েই প্রশ্ন জাগে৷ এবং এক রাজনীতিও এখানে স্পষ্ট হয়৷ গৈরিকীকরণের এ প্রকল্প নির্দিষ্ট এক ‘নেশন বিল্ডিং’য়ের নীলনকশা৷ যে কারণে, রাজারাজ চোল বা কৃষ্ণদেব রায়রা ‘অসংখ্য ’ যুদ্ধ জেতেন, অথচ বিজিতদের পরিচয় পাওয়া যায় না৷ কিন্ত্ত যেই সে রাজা অন্য ধর্মের হন, যেমন ধরা যাক টিপু সুলতান, তখনই এক -এক করে চিহ্নিত হতে থাকে, পরাজিত জনেরা৷ মুহূর্তেই সেই নিপীড়িত, পরাজিতদের সঙ্গে হিন্দুত্ববাদীরা, এক অমোঘ সম্পর্ক স্থাপন করে৷ এক রকম ইতিহাসকে নিশ্চিত ভাবেই অন্য দৃষ্টিকোণ দিয়ে যাচাই করা হয়৷

টিপু’র ক্ষেত্রেই যেমন দেখলে দেখব, হিন্দুত্ববাদীরা, ইদানীং খুব সরব, তাঁর মন্দির ভাঙার ঘটনা নিয়ে৷ নিঃসন্দেহে তিনি তা করেছিলেন, ইতিহাস সাক্ষী, কিন্ত্ত তিনি মন্দির রক্ষাও যে করেছিলেন, ধ্বংস হয়ে যাওয়া মন্দিরের সাহায্যের এক রাশ অনুদানও দিয়েছিলেন, (মালাবার আক্রমণ উদাহরণস্বরূপ দ্রষ্টব্য ) সে সবেরও তো সাক্ষী ইতিহাস৷ কিন্ত্ত সে ইতিহাস তো ‘হিন্দু’ ইতিহাস নয়, অতএব৷ তা ছাড়া, টিপুকে কখনওই নিজ রাজ্যে মন্দির ভাঙতে দেখা যাচ্ছে না৷ এক না যদি, তা কোনও বিদ্রোহের শাস্তিরূপে হয়৷ এমনকী, মারাঠাদের হাতে শৃঙ্গেরি মঠের ধ্বংসের খবর পাওয়া মাত্র, টিপু কিন্ত্ত তত্ক্ষণাত্ পুনর্নির্মাণের সমস্ত দায়ভার নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন৷ তা অবশ্য হিন্দুত্বের পরিধি -বহির্ভূত৷ এখানে খেয়াল করা সমীচীন হবে, অওরঙ্গজেব -ও কিন্ত্ত ফরমান জারি করে বেনারসের ব্রাহ্মণদের বিশেষ সুরক্ষার ব্যবস্থা করেছিলেন৷ খানিক পিছনে ফিরে দেখব বাবর -ও তাঁর এক ফতেহ্নামা -য় কাফির রূপে বেশ কিছু ইসলামপন্থীরও নাম রেখেছিলেন বা বিজয়নগরের রাজারাও ‘হিন্দু রায় সুরত্রাণ ’ উপাধি নিয়েছিলেন, অর্থাত্ হিন্দু রাজাদের মধ্যে সুলতান৷ আসলে, সমস্যা এখানে যেমন, ইচ্ছাকৃত ভাবেই এক অন্য ‘ইতিহাসসৃষ্টি ’র প্রয়াসের, তেমনই প্রাক-আধুনিক সমাজকে না বোঝাটাও কিন্ত্ত মহাসমস্যার৷ গণ্ডগোল সেখানে ইতিহাসশিক্ষার, কিন্ত্ত সে প্রসঙ্গ ভিন্ন, আপাতত থাক৷ সে কালকে যদি আমরা শুধুই প্রচলিত ধর্মের দৃষ্টিকোণ দিয়েই দেখি, বড়ো গলদ হবে৷ হচ্ছেও৷ মন্দির ধ্বংসেরই যদি প্রসঙ্গে আসে, তবে মনে করা উচিত, চোল, চালুক্য, পল্লব বা পাল রাজারাও কিন্ত্ত এই ‘দোষে ’ দোষী৷ বুঝতে হবে, অধিকাংশ এমন কাণ্ডই, অর্থনৈতিক কারণে৷ সুকৌশলে সে সব ‘বাস্তব’ ঔপনিবেশিক প্রকল্পে পড়ে, এক রকম ভাবে দর্শিত হয়েছে, এবং হিন্দুত্ববাদীরাও, নিপুণ ভাবেই, সেই অদৃশ্য সুতো খুঁজেপেতে, এ বার নিজ ছাঁচে বেঁধে নিয়েছেন৷ তাই এক দিকে, ‘বাবর কে সন্তান’ রূপে এক দল চিহ্নিত হচ্ছে, অন্য দিকে, নিজ প্রকল্পের সফল রূপায়ণ হেতু, হিন্দুত্ববাদীরা একে একে খাড়া করছে, হেমু’র মতো পরাক্রমী ‘হিন্দু রাষ্ট্র ’ কায়েমে সচেষ্ট রাজাদের, আবার বিস্মৃতির আড়াল থেকে ফিরিয়ে আনছে দীনদয়াল উপাধ্যায় বা নানাজি দেশমুখের মতো সঙ্ঘ -মনস্ক চরিত্রদেরও৷ কেক-এর উপর উজ্জ্বল চেরি ’র ন্যায় এমনকী কংগ্রেসের লৌহকপাটে ছিদ্র করে তুলে আনছে, সর্দার প্যাটেলের মতো নেতাকেও৷ সার্জিকাল স্ট্রাইক তো এরেই কয় কত্তা! আর যে টিপু গত শতাব্দীর সাতের দশকে, আরএসএস প্রকাশিত ‘ভারত ভারতী’ সিরিজে দেশভক্ত রূপে ভূষিত হয়েছিলেন, তিনিই ২০১৮ সালে বিধানসভা ভোটের আগে, হঠাৎই তাদের চোখেই ‘ব্যাড মুসলিম’৷

অতীতের অর্থোদ্ধারে আর পেশাদার ও দক্ষ ইতিহাসবিদের কী প্রয়োজন? সরকারই তো আছে৷ ঠিক সেই ব্রিটিশ যুগের মতো, তারাও নিজ স্বার্থরক্ষার হেতু, ইতিহাসনির্মাণ করে নেবে, প্রয়োজনে তার বিকৃতিও, হীরকরাজের সেই মস্তিষ্কপ্রক্ষালন যন্ত্রের মতোই, স্কুল-কলেজের ইতিহাসপুস্তক, ছবি, নাটক, প্যামফ্লেট, অডিও, ভিডিয়ো ইত্যাদিকে ব্যবহার করে, সাধারণের চেতনায় ঢুকিয়ে দেবে, ‘শ্রী রাম জন্মভূমি কা রক্ত্ রঞ্জিত্ ইতিহাস’৷

যাতে নাকি হিন্দু ও মুসলমানদের মধ্যে মোট ৭৭ খানি যুদ্ধে, ১৭৪০০০ হিন্দু প্রাণ দিয়েছিলেন৷ কবে, কোথায়, সাক্ষী কই, প্রমাণ কী ইত্যাদি প্রশ্ন নির্ঘাত্ অবান্তর ও ভিন্ন এক কিস্সা৷


মঙ্গলবার, ২৯ নভেম্বর, ২০১৬

কিউবার সমাজতন্ত্র তার নিজের মতো

কিউবার কমিউনিস্ট পার্টির ২০১৬ সালের কংগ্রেসে ফিদেল কাস্ত্রো

 অঞ্জন চক্রবর্তী

ফিদেল কাস্ত্রো সম্পর্কে অনেক কথা গত ক’দিনে নতুন করে বলা হয়েছে। তাঁর জীবন অত্যন্ত ঘটনাবহুল এবং রোমাঞ্চকর। বস্তুত, পঞ্চাশটা রহস্যরোমাঞ্চ ছবি একসঙ্গে করলেও ফিদেল কাস্ত্রোর জীবনটাকে পুরোপুরি ধরা যাবে না। তাই সে দিকে না গিয়ে বরং কিউবায় এবং বিশ্বে তাঁর গুরুত্বটা বোঝার চেষ্টা করা যাক।
 

সার্বভৌমত্ব, বিপ্লব ও সমাজতন্ত্র

ফিদেলের চিন্তা ও কাজের কেন্দ্রে যদি কিছু থেকে থাকে, তা হল জাতীয় সার্বভৌমত্ব। তিনি যে এক সময় সমাজতন্ত্রের পথ নিয়েছিলেন, সেটাও বুঝতে হবে বাতিস্তার বিরুদ্ধে কিউবার সার্বভৌমত্ব অর্জনের সংগ্রামের প্রেক্ষিতেই। বাতিস্তা ছিলেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের হাতের পুতুল। ১৯৫৯ সালে কাস্ত্রোর নেতৃত্বে কিউবার বিপ্লব সেই পুতুল-সরকারকে উৎখাত করে, তার লোকজন মায়ামিতে পালিয়ে গিয়ে প্রধান বিরোধী ঘাঁটি তৈরি করে। বিপ্লবের আগে কিউবার রাজনীতি ও সরকারি নীতি ছিল আমেরিকার নিয়ন্ত্রণে, জমির মালিক ছিল ভূস্বামীরা ও মার্কিন কোম্পানিগুলি, নানা পণ্য হয় আমেরিকা থেকে আমদানি হত অথবা কিউবায় আমেরিকান কোম্পানি তৈরি করত, দারিদ্রের মাত্রা ছিল অস্বাভাবিক বেশি, নিরক্ষরতা ও অস্বাস্থ্য ছিল ব্যাপক, জাতি-বৈষম্য, বিশেষ করে আফ্রিকা থেকে আসা ক্রীতদাসদের বংশধরদের নিপীড়ন একটা প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেয়েছিল, যে কোনও প্রতিবাদ ছিল নিষিদ্ধ, যে কোনও বিরোধিতা কঠোর ভাবে দমন করা হত।

ফিদেল কাস্ত্রো তাঁর লড়াই শুরু করেছিলেন, কমিউনিস্ট নয়, বাম জাতীয়তাবাদী হিসেবে। স্বভাবতই তিনি মনে করতেন, জনসাধারণের সার্বভৌমত্ব হল প্রথম কথা, তাকে বাদ দিয়ে নতুন কিউবা নির্মাণ অসম্ভব। এই আদর্শই মার্কিন আধিপত্যের বিরুদ্ধে আজ অবধি কিউবার আপসহীন অবস্থানের মূলে। কিউবা যে আন্তর্জাতিক সংহতিকে বরাবর গুরুত্ব দিয়েছে, তারও ভিত্তিতে ছিল বিভিন্ন দেশের স্বাধীনতার প্রতি সম্মান।

কিউবার বিপ্লবের পরে আমেরিকা দেখে, তার প্রভাব খর্ব হচ্ছে। কাস্ত্রোর সরকারকে উৎখাত করতে উঠেপড়ে লাগে তারা, এক সময় ছোট্ট প্রতিবেশী দেশটির উপরে নির্মম অবরোধ জারি করে। সিআইএ-র উদ্যোগে বহু বার কাস্ত্রোকে হত্যার চেষ্টা হয়। ফিদেল তাঁর স্বভাবসিদ্ধ কৌতুকে বলেছিলেন, ‘আততায়ীর আক্রমণ থেকে বেঁচে যাওয়াটা যদি অলিম্পিকের খেলা হিসেবে স্বীকৃত হত, তবে আমি স্বর্ণপদক পেতাম।’  কিউবার উপর অবরোধ ও (১৯৬১ সালে মার্কিন ব্যবস্থাপনায়) আক্রমণের আসল নিশানা ছিল তার সার্বভৌমত্ব। এই প্রেক্ষিতেই ফিদেল একমাত্র কার্যকর বিকল্প হিসেবে সমাজতন্ত্রের পথ বেছে নিলেন, সোভিয়েত ইউনিয়নের হাত ধরলেন, যদিও সেই সমাজতন্ত্রের চরিত্র নির্ধারণ করলেন কিউবার নিজস্ব পরিস্থিতি অনুযায়ী।

একদলীয় শাসন এবং বিরোধী কণ্ঠস্বর দমনের কারণে কাস্ত্রো সমালোচিত হয়েছেন। তাঁর বক্তব্য ছিল, বিপ্লবের ভিতটা অক্ষত রাখার জন্য এই রাজনৈতিক ব্যবস্থার প্রয়োজন ছিল, যে ভিতের উপর গড়ে উঠেছিল সার্বভৌমত্ব, জাতি-বৈষম্যের সম্পূর্ণ অবসান, ভূমি সংস্কার, সর্বজনীন স্বাস্থ্য ও শিক্ষা, দারিদ্র দূরীকরণ, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির উন্নতি, খেলাধুলার প্রসার এবং শিল্পায়ন। ঠিক হোক বা ভুল হোক, কিউবার কমিউনিস্ট পার্টি (১৯৬৫ সালে যার জন্ম) মনে করে, এই নিয়ন্ত্রিত রাজনৈতিক কাঠামো ছাড়া এক কোটি দশ লক্ষ মানুষের ছোট্ট দেশটির পক্ষে সার্বভৌমত্ব এবং অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নতি সাধন করা ও ধরে রাখা সম্ভব নয়।

ধনতন্ত্রের মতোই সমাজতন্ত্রও অনেক ধরনের হতে পারে। কিউবার সমাজতন্ত্রও তার নিজের মতো। তার কাঠামোটা উপর থেকে বা বাইরে থেকে চাপিয়ে দেওয়া হয়নি, তা নিজের অন্দর থেকে বিবর্তিত হয়েছে, এখনও হচ্ছে। এবং এই কারণেই ফিদেল ও তাঁর কিউবা ভয়ঙ্কর আর্থিক অবরোধ এবং সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন সামলে এগারো জন মার্কিন প্রেসিডেন্টকে পার করেছে। কিউবার সমাজতন্ত্রের সাফল্যের মূলে আছে তার জনসাধারণের অন্তর্নিহিত শক্তি।

আন্তর্জাতিকতা ও সংহতি

দৃশ্য ১: ২০১৩ সালে পশ্চিম আফ্রিকায় ফিরে এল ইবোলা। মহামারীতে এগারো হাজারের বেশি প্রাণ গেল। চার দিকে প্রবল আশঙ্কা— বৃহত্তর দুনিয়ায় এই কালান্তক রোগ ছড়িয়ে পড়বে। পশ্চিম দুনিয়ার আতঙ্কিত দেশগুলি আন্তর্জাতিক সহযোগিতার আবেদন জানাল, নিজেরা অবশ্য বিশেষ কিছু করল না। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ৩০০০ সৈন্য পাঠাল, যদিও ঠিক কী কারণে বোঝা গেল না। এক কোটি দশ লক্ষ মানুষের দেশ কিউবা তৈরি করল হেনরি রিভ ব্রিগেড, মহামারীতে আক্রান্ত দেশগুলিতে পাঠিয়ে দিল ৪৬১ জন ডাক্তার ও নার্সকে, বিপদের মুখে দাঁড়িয়ে ইবোলার মোকাবিলায় নামলেন তাঁরা, অসংখ্য প্রাণ বাঁচালেন, অন্য দেশে রোগ ছড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা আটকাতে তৎপর হলেন। ডব্লিউএইচও তো বটেই, এমনকী চিরশত্রু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রও ইবোলার মোকাবিলায় কিউবার এই ভূমিকার প্রশংসা করল। হেনরি রিভ ব্রিগেডকে নোবেল শান্তি পুরস্কারের জন্য মনোনয়ন দেওয়া হল। পুরস্কার অবশ্য তারা পেল না— কেন, সেটা বলাই বাহুল্য।

বিপ্লব-উত্তর কিউবার স্বাস্থ্য পরিষেবা ও শিক্ষা ব্যবস্থা সুপ্রসিদ্ধ, যার রূপকার ছিলেন এর্নেস্তো চে গেভারা। তার অনন্যতা এই যে, নিজের জ্ঞান, মানবসম্পদ ও প্রতিষ্ঠানগুলিকে বাকি পৃথিবীতে ছড়িয়ে দিতে কিউবা সব সময় আগ্রহী ও তৎপর। এখানেই তার আন্তর্জাতিকতা। এর মূলে ক্ষমতার ছক নেই, আছে এই বিশ্বাস যে, স্বাস্থ্য ও শিক্ষায় গোটা দুনিয়ার প্রত্যেক মানুষের নৈতিক অধিকার আছে। এ কালের পৃথিবীতে আর কোনও দেশ আন্তর্জাতিক সংহতির এই মৌলিক আদর্শে স্থিত থেকে বিভিন্ন উপলক্ষে এমন নিয়মিত ভাবে তার প্রমাণ দিয়েছে বলে আমার জানা নেই। কিউবা বাকি পৃথিবীকে কী দিয়েছে, সেটাই আন্তর্জাতিক পরিসরে তার অস্বাভাবিক প্রভাবের পিছনে একটা বড় ভূমিকা নিয়েছে। জাগতিক ভূমিকার চেয়েও এখানে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হল নৈতিক প্রভাব।

দৃশ্য ২: লাতিন আমেরিকা, আফ্রিকা ও এশিয়ার বিভিন্ন দেশে পশ্চিমী উপনিবেশ এবং মার্কিন মদতে কায়েম হওয়া স্বৈরাচারী জমানার বিরুদ্ধে সংগ্রামে বড় ভূমিকা নিয়েছে কিউবা। আফ্রিকার দৃষ্টান্ত নেওয়া যাক। স্যঁ জেকবস-এর ভাষায়, ‘আফ্রিকা যদি একটা দেশ হয়, তবে ফিদেল কাস্ত্রো আমাদের এক জন জাতীয় নায়ক।’ পশ্চিমী দেশগুলির (বা অধুনা চিনের) মতো মূল্যবান খনিজ সম্পদ দখলের জন্য কিউবা এই দেশগুলিতে হস্তক্ষেপ করেনি, ঔপনিবেশিক তথা স্বৈরাচারী শাসকের বিরুদ্ধে সংগ্রামে বিদ্রোহীদের প্রশিক্ষণ দিয়েছে, তাদের শিক্ষা ও স্বাস্থ্য পরিষেবার ব্যবস্থা গড়ে তুলতে সাহায্য করেছে। রবেন আইল্যান্ড-এর কারাগার থেকে নেলসন ম্যান্ডেলা লিখেছিলেন, ‘এই প্রথম অন্য এক মহাদেশ থেকে একটি রাষ্ট্র এসেছে আফ্রিকা থেকে কিছু নিয়ে যেতে নয়, আফ্রিকানদের স্বাধীনতা অর্জনে সহায় হতে।’ কঙ্গো, গিনি বিসাউ ও কেপ ভের্দে, অ্যাঙ্গোলা বা মোজাম্বিকের স্বাধীনতা সংগ্রামে কিউবার ভূমিকা সুপরিচিত। ১৯৭৬ ও ১৯৮৮ সালে সদ্য-স্বাধীন অ্যাঙ্গোলায় কেবল বিদ্রোহী জঙ্গি নয়, সিআইএ এবং দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবিদ্বেষী শাসকদের অর্থ ও অস্ত্রে পুষ্ট শ্বেতাঙ্গ ভাড়াটে সৈন্যদের আক্রমণ থেকে নবীন রাষ্ট্রকে রক্ষা করতে সে দেশের নায়কদের আবেদনে সাড়া দিয়ে ফিদেল সেনা পাঠিয়েছিলেন। হাজার হাজার কিউবান সৈনিক সেই সংঘর্ষে প্রাণ হারান। অ্যাঙ্গোলায় বিদ্রোহীরা হার মানে। ১৯৮৮ সালে শ্বেতাঙ্গ দক্ষিণ আফ্রিকার সেনাও পরাজিত হয়। এর ফলেই সে দেশের বর্ণবিদ্বেষী জমানার অবসান ত্বরান্বিত হয়। অন্য দিকে জন্ম নেয় স্বাধীন নামিবিয়া।

১৯৯১ সালে দক্ষিণ আফ্রিকায় পালাবদলের পরে নেলসন ম্যান্ডেলা তাঁর প্রথম বিদেশ সফরে কিউবায় যান এবং ফিদেলকে বলেন, ‘অনেক দেশের মানুষ সম্প্রতি আমাদের দেশে গেছেন। কিউবা আমাদের বন্ধু, সে আমাদের দেশের মানুষকে, বিশেষত চিকিৎসকদের প্রশিক্ষণ দিয়েছে, নানা ভাবে আমাদের সংগ্রাম জারি রাখতে সাহায্য করেছে। অথচ আপনি আমাদের দেশে যাননি। কবে আসবেন?’ মনে রাখতে হবে, আমেরিকা, ইংল্যান্ড সহ তথাকথিত মুক্ত দুনিয়ার বহু দেশই দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবৈষম্যবাদী সরকারকে প্রায় শেষ পর্ব অবধি সমর্থন করেছে। সেই দেশে এবং আফ্রিকার সমগ্র দক্ষিণাঞ্চলে মহালুণ্ঠনে লিপ্ত ছিল তাদের অনেকেই। পশ্চিম দুনিয়া এবং মূলধারার সংবাদমাধ্যম ফিদেল ও তাঁর কিউবার যে সমালোচনা করে এসেছে, সে বিষয়ে ম্যান্ডেলা মন্তব্য করেছিলেন, ‘গত চল্লিশ বছর ধরে যারা বর্ণবৈষম্যবাদী শাসনকে সমর্থন করে এসেছে, এখন তারাই আমাদের কিউবা নিয়ে উপদেশ দিচ্ছে। আমাদের সবচেয়ে কঠিন সময়ে যারা আমাদের কোনও সাহায্য করেনি, আত্মমর্যাদা থাকলে কারও পক্ষে কখনও তাদের উপদেশ শোনা সম্ভব নয়।’

রোমান্টিক রাজনীতি

ফিদেল কাস্ত্রো ছিলেন এক ভঙ্গুর মানুষ। তিনি ভুল করতেন, নিঃসংকোচে সেই ভুল স্বীকারও করতেন। কিন্তু আমাদের দেশের কমিউনিস্ট পার্টির অনেকে যেমন ভালবাসা ও যৌনতা নিয়ে সর্বদা সন্ত্রস্ত থাকেন, তেমন কোনও শুচিবাই তাঁর ছিল না। তাঁর এই মানবিক স্বভাবের কথা জানত বলেই সিআইএ এক বার ফিদেলের প্রাক্তন প্রেমিকা মারিতা লরেন্সকে তাঁর কাছে পাঠিয়েছিল পানীয়তে বিষ মিশিয়ে তাঁকে খুন করতে। ফিদেল সেই ষড়যন্ত্র ধরে ফেলেছিলেন। বাকিটা মারিতার মুখে শোনা যাক। ‘‘আমি ধরেই নিয়েছিলাম ও আমাকে গুলি করবে। কিন্তু আমার হাতে বন্দুকটা তুলে দিয়ে ও বলল, ‘তুমি আমাকে মারতে এসেছ?’ তার পর সিগারে একটা টান দিয়ে ও চোখ বন্ধ করল। ও নিজেকে এতটা দুর্বল করে তুলল, কারণ ও জানত, আমি কাজটা পারব না। ও আমাকে তখনও ভালবাসে, আমিও ওকে।’’ বুলেটটা বের করে নিয়ে লরেন্স ফিদেলের বুকে আশ্রয় নিলেন। ফিদেল কাস্ত্রোর জীবনে বিপ্লবী রাজনীতি আর ভালবাসা হাতে হাত মিলিয়ে চলত।

"আমার বয়েস নব্বইয়ের কাছাকাছি হল। সকলের মতোই আমিও অচিরে বিদায় নেব। কিন্তু আমরা যদি সমবেদনা ও আত্মমর্যাদার সঙ্গে কাজ করি, তা হলে মানুষের প্রয়োজনীয় বস্তুগত ও সাংস্কৃতিক সম্পদ সৃষ্টি করতে পারব। কিউবার কমিউনিস্টদের ধারণাগুলি সেটাই প্রমাণ করে।"

অঞ্জন চক্রবর্তী: কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতির শিক্ষক